Showing posts with label কবি মাসুদ খান. Show all posts
Showing posts with label কবি মাসুদ খান. Show all posts

Wednesday, February 20, 2019

ফেইসবুকে বিবিধ বিষয়ে কবি মাসুদ খানের কিছু পোষ্ট







ডেইজি সামোরা-র একগুচ্ছ কবিতা--

[ডেইজি সামোরা: জন্ম ১৯৫০, মানাগুয়া, নিকারাগুয়া। সমকালীন মধ্য-আমেরিকান কাব্যক্ষেত্রের গুরুত্বপূর্ণ বুজুর্গদের মধ্যে ডেইজি সামোরা অন্যতম। তাঁর কবিতায় ধ্বনিত হয় এক আপসহীন কণ্ঠস্বর। দৈনন্দিন জীবনের নানা খুঁটিনাটি পুঙ্খে-পুঙ্খে উঠে আসে তাঁর কবিতায়। রাজনীতি থেকে শুরু করে মানবাধিকার, বিপ্লব থেকে শুরু করে নানা নারীবাদী ইস্যু, ইতিহাস থেকে শুরু করে শিল্পসাহিত্য, সংস্কৃতি-- এক বিস্তৃত প্রেক্ষাপটের ভেতর দিয়ে প্রদক্ষিণ করে তাঁর কবিতা। স্প্যানিশ ভাষায় রচিত বহুলপঠিত বেশ কয়েকটি কাব্যগ্রন্থের জননী তিনি। এ ছাড়াও আছে ইংরেজি ভাষায় লেখা বেশ কিছু বই। নারী-অধিকার বিষয়ে সোচ্চার এই কবি সম্পাদনা করেছেন নিকারাগুয়ান নারী কবিদের কাব্যসংকলন। বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছিল সংকলনখানা। দেশে দেশে ছড়িয়ে পড়েছে তাঁর কবিতা। ভূষিত হয়েছেন নানা সম্মাননা ও পুরস্কারে। ১৯৭০-এর দশকে, সোমোজার একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে চলতে থাকা দীর্ঘদিনের সংগ্রাম যখন ছড়িয়ে পড়ে তীব্র ও বিস্তৃত হয়ে, তখন ডেইজি জড়িয়ে পড়েন, রীতিমতো নিমজ্জিত হয়ে যান, বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে। ১৯৭৩-এ যোগ দেন ন্যাশনাল সান্দিনিস্তা লিবারেশন ফ্রন্ট বা এনএসএলএফ-এ। বস্তুত তিনি ছিলেন এনএসএলএফ-এর একজন সক্রিয় যোদ্ধা। সান্দিনিস্তা গেরিলাদের গোপন প্রচারমাধ্যম রেডিও সানদিনো-র ভয়েস ও প্রোগ্রাম ডিরেক্টর হিসাবে কাজ করেন ১৯৭৯-এ, সান্দিনিস্তাদের সেই চূড়ান্ত ধাক্কা ও অভ্যুত্থানের আগুনঝরা দিনগুলিতে। বিপ্লব চলাকালীন বিভিন্ন সময়ে তিনি নির্বাসিত জীবনযাপন করেছেন হন্ডুরাস, পানামা ও কোস্টারিকায়। ১৯৭৯-এর জুলাইয়ে বিজয়লাভের পর সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের উপমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হয় কবি সামোরাকে। এর্নেস্তো কার্দেনাল তখন ওই মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী। তাঁরা দুজনে বেশ কিছুকাল কাজ করেছেন একসাথে।]

//কনিষ্ঠতম সন্তানের কাছে মিনতি//

[তোমাতে করেছি আমি প্রাণের সঞ্চার

তোমাপ্রতি এ-আমার 
নিয়তিবাধিত এক নিদারুণ উপহার
ক্ষমা করে দিয়ো তুমি, সন্তান আমার
--*রুবেন দারিয়ো]

এমন যাতনা নিয়ে করি আমি প্রতীক্ষা তোমার 

যে-যাতনা শুধু বেড়ে যায় দিনে দিনে,
এইরূপ ঊষরতা নিয়ে করি প্রতীক্ষা তোমার 
যা আমার সুখশান্তি করেছে বরবাদ,
বলদের মতো বাঁধা আমি আস্টেপৃষ্ঠে জলযন্ত্রের চাকার সাথে তার-- 
এই কথা জানার যে বিষণ্ণতা, তা-ই নিয়ে করি হে তোমারই ইন্তেজার।

সাহস করি না আর তোমাকে যে শোনাব কূজন,

বোলাতে বোলাতে হাত আমার এ-গর্ভবর্তুলে: যা-কিনা তোমারই ভুবন।
এই যে মৃত্যুবাসনা, এই বক্ষে কেবলই আমার 
জারি রাখে সে-এক অকথ্য অত্যাচার--
মাফ করে দিয়ো তাকে।

আমাকে তুমি দাও সেই দম, সেই শ্বাস, যা তোমাকে

ঠেলে দেবে জীবনের দিকে
বয়ে নিয়ে যাবে দূরে আমার এ-জাহাজডুবো হৃদয়টিকে।

(*রুবেন দারিয়ো-কে বিবেচনা করা হয় নিকারাগুয়ার শ্রেষ্ঠ কবি হিসাবে। আধুনিকতাবাদী ঘরানার অন্যতম উদ্গাতা ছিলেন তিনি। তাঁর কাজ ও লেখালিখি নিবিড় ও গভীরভাবে ইয়াংকি-বিরোধী।)

//একান্ত অনুগত গৃহিনী//

মধুচন্দ্রিমাতেই খতম সবকিছু-- 

কমলাফুলের ফুটে-ওঠা, প্রেমপত্রাবলি,
শিশুতোষ কান্নাকাটি-- সব, সবকিছু।

এইবার হামাগুড়ি দাও তোমার মালিকের পায়ের তলায়,

প্রথমেই তার যে হারেম আছে, সেটার ভেতর,
সেইখানে, তারই মর্জিমাফিক গৃহীতা হবে তুমি, হবে পরিত্যক্তা।

সন্তানের মা তুমি, অথচ সেই সন্তান ধারণ করে আছে

তোমার সে-মনিবের নাম,
ডায়পারের ভারে ন্যুব্জ কাপড়-শুকানো দড়ির পাশে দাঁড়িয়ে 
নিজের নসিব নিয়ে তোমার ওই অস্ফুট বিলাপ,
হৃদয়কে চিপড়ানো, নিংড়ানো...
যতক্ষণ-না তার শোধন হয় তোয়ালে ও বেডশিটে।

শুকনা রুটির দিকে বাড়ানো, অপমানে নোয়ানো একটি হাত

চিৎকার-চেঁচামেচি আর অপমানে-অপমানে ধ্যাতা-ধরা কোণঠাসা এক অবলা গৃহিণী
মাইগ্রেন, শিরাফোলা আর বহুমূত্রে-ভোগা এক চিরবিলাপিনী ছায়ামূর্তি।

শোকেস-সামগ্রীরূপে রাখা একটি তরুণী

যে-কিনা বিবাহ করেছিল তার প্রথম প্রেমিক,
যে-কিনা বুড়িয়ে গেল শুনতে শুনতে জীবনের দূরবর্তী সংগীত 
তার যে কথিত ‘স্ত্রী-মর্যাদা’, সেই জায়গায় ঠায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে।


//বিলাপ//

আর যদি নাই দেখতে পারি কখনো তোমায়

তাহলে কীসের জন্যে এই চক্ষুদ্বয়?
কেনই-বা এই হাত, সোহাগ বোলায় খাঁ-খাঁ শূন্যতায়, তীব্র ফাঁকাময়তায়?

কেনই-বা জীবন?

//সূর্যকিরণ//

কী যে ঈর্ষা করি! 

আহা, ঘুম না ভাঙিয়ে তোমার
বসেছে কাঁধের ’পরে এসে ওই রবির কিরণ!

সোনালি আলোর ছোঁয়ায় তার

জ্বলজ্বল করছে ত্বকেরা তোমার 
আজ সকালের এই স্যাঁতসেঁতে ছায়ার ভেতর।


//আমি ফের আমি হই আরো একবার//

আমি আর আমার বাচ্চারা যখনই ঢুকি তার বাড়ির ভেতর

আমি ফের আমি হই আরো একবার, 
আহা ফিরে পাই নিজেকে আবার।

রকিং চেয়ারে বসে থেকে 

বুঝে যান এসেছি আমরা, আলতো করে মাথাটা তোলেন।
তেমন আর হয় না আলাপ, যেমনটা হতো আগে।
প্রস্তুত হচ্ছেন তিনি প্রস্থানের জন্যে।

কিন্তু আমি তো আসি তার কোলে মাথাটা ডোবাতে,

বসে থাকতে তার পায়ের নিকট।
নিয়ত বিরাজ করি আমি তার ধ্যানে, ভাবনায়
আমার সে হারিয়ে-আসা বেহেশতখানায়
যেইখানে এই মুখটি আমার হয়ে যায় অন্য এক মুখ,
যেই মুখ ভাসে শুধু তারই চেতনায়
ক্ষণে-ক্ষণে উদ্ধার-করা একটি চেহারা
চির-ঝাপসানো, নীল নিষ্প্রভ ওই চোখের মণিতে,
অন্ধ আঁখিতারায়, যেখানে
খুব হেফাজত করে তুলে রাখেন এ মুখখানি আমার।


//প্রাণী ও তার পোষমনিব//

উদ্যানের প্রাণীর মতো, আমি দেখেছি তাদের...

--এর্নেস্তো মেহলা সানচেজ
রেলিঙে দাঁড়িয়ে দেখি—

একজন লোক, প্রাণীদের পোষ মানায়, পানি দিচ্ছে বাগানে এখন
(চেহারা লুকানো তার ছায়ার আড়ালে)
যথেষ্ট নিরীহ লাগে তাকে: যেন এক গোবেচারা, 
ব্যস্ত শুধু নেহাত মামুলি কিছু কাজে, 
ব্যস্ত কিছু বিবর্ণ গোলাপ আর রুপালি গুল্মের দেখভালে।

পাতাদের একঝলক শিহরন

এই মর্মে জানান দিয়ে যায়, যে, হাওয়া বইছে হঠাৎ
আর পরিপৃক্ত ওই উঠান থেকে উঠে এসে হাওয়া ছুঁয়ে যাচ্ছে আমায়, 
ঢুকে যাচ্ছে ভেতরে আমার,
ঝাপটে ভিজিয়ে দিয়ে যাচ্ছে আমার এ ভাঁজ-পড়া 
কোচকানো হৃদয়ের যত বিশুষ্ক বলিরেখা।


//তোমার উৎকর্ষ//

সে-এক অননুকরণীয় উৎকর্ষ তোমার
লুক্সরের মন্দিরের মতন, যা দেখে মুগ্ধ হয়েছিলাম আমি, সেই

মেট্রোপলিটান মিউজিয়ামে: 
চুনসুরকিহীন, পাথরের ওপর শুধু পাথর বসিয়ে বানানো।
(ব্যাপারটা দেখিয়ে দিলেন জাদুঘরের গাইড মশায়)
নিউ ইয়র্কীয় আকাশের উঁচু ধূসর গম্বুজের
নিচে শানদার একটি মন্দির।

এই এত যে উৎকর্ষ, আর এত যে মহিমা, 

তার চেয়েও বেশি পছন্দ আমার
গোধূলিকালীন হাত দুটিকে তোমার।


//চূড়ান্ত অবধি//

হৃদয় আমার

লড়ে যায় হরদম: 
নাই এমন কোনো ব্যূহ, যাকে সে ভেঙেচুরে ভেদ করে পারে না যেতে;
শহিদ হয়ে যায় আমার এ-প্রাণ আমাদের ভূখণ্ড-রক্ষায়।


Masud Khan August 29, 2018(সর্বশেষ পোষ্ট ডেইট)(Facebook)

Saturday, January 5, 2019

মাসুদ খান-এর দীর্ঘ কবিতা ‘প্যারানরমাল’

‘প্যারানরমাল’

           -  মাসুদ খান

পাঁচ ধাতুতে তৈরি খাঁচা তার ভেতরে তোতা
ছয়টা চোরে যুক্তি করে খোঁচাচ্ছে অযথা।
ঘাবড়ে যাচ্ছে তোতা।

অজস্র বিমান ওঠানামার মাঝেই 
গা-ছমছমে ভূতের গল্প জেগে ওঠে ঝলমলে বিমানবন্দরে।
রানওয়ের দুই পাশে ফুটে-থাকা বিন্দু-বিন্দু আলোকপুষ্পের মধ্যে
অনেকগুলিই আর আলো নয় তখন, আলেয়াবিশেষ। 
হঠাৎ হালকা এক অনুনাসিক সুর, 
আধাজবাই-করা হলকুম-উপচানো ঘ্যাঁসঘ্যাঁস শব্দ আর 
টুটাফাটা-ফুসফুস-নির্গত কিছু প্রাচীন নিশ্বাস ভেসে আসে অমর্ত্য, ইথারিয়াল...
কোনটা ভূতার্থ দ্যুতি, কোনটা আলেয়া, কোনটাই-বা অলোকশ্রবণ-- 
ধোঁয়াশায় ভেজা সব।

পাঁচ ধাতুতে তৈরি খাঁচা তার ভেতরে তোতা
ছয়টা চোরে যুক্তি ক’রে খোঁচাচ্ছে অযথা।
ভড়কে যাচ্ছে তোতা।

আশেপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে সব দীর্ঘপাদ পাখি, 
আবার সে-গোয়েন্দা গিরগিটি, খররোমা, দীপ্তাক্ষ বেড়াল
শহরের ব্যস্ততম সড়কে উটপাখিতে চড়ে উদলা-গায়ে 
শ্লথ-প্লুত গতিতে এগিয়ে চলছে এক কৌপীন-পরিহিত বহিরাগত। 
হঠাৎ সামনে পড়ে-যাওয়া এক লিমুজিনকে দেখে বলছে,
“বাহ! কী সুন্দর বাহন!” 
অমনি খেপে গিয়ে তেড়ে আসছে লিমুজিন, বহিরাগতের দিকে। 
বিস্মিত কৌপীন। হ্যাশট্যাগ আজগবি আগন্তুক।

এদিকে রাস্তার মাঝখানে আচমকা হৃৎক্রিয়া বন্ধ হয়ে 
‘আউচ’ শব্দে অন্তিম হিক্কা তুলে মারা গেল এক বয়োবৃদ্ধ আউডি। 
ডোম ডাক্তার পুলিশ দমকল বিমা ও বিবেকমতি...ছুটে এসেছে সবাই।
রিসাসিটেশন, রিসাসিটেশন। কাজ হচ্ছে না। যানজট।

চিকিৎসা হবে বাহনের, নাকি অন্তিম সৎকার-- বিভ্রান্ত সবাই। 
ভাগাড়ে নেবার লাশবাহনও প্রস্তুত।

পাঁচ ধাতুতে তৈরি খাঁচা তার ভেতরে তোতা
ছয়টা চোরে যুক্তি ক’রে খোঁচাচ্ছে অযথা।
ওই তো আবার ঘাবড়ে যাচ্ছে তোতা।

সামনে সুমেধা সাগর, পেছনে শ্রীভ্রষ্ট মরুভূমি। 
এক কোণে ছোট্ট মরূদ্যান-- 
কাঁটাঝোপ, ক্যাকটাস, দুয়েকটি গন্ধকরঙিন বৃশ্চিক, সরীসৃপ
যেন শূন্য প্রান্তরজুড়ে বিছিয়ে-রাখা বিশাল তুলোট কাগজের খাঁ-খাঁ পৃষ্ঠা
নিচে একপাশে হিজিবিজি দুরক্ষর দস্তখত।
তৃষ্ণা পেলে মুসাফির এক আঁজলা আগুন-মেশানো মরীচিকা 
পান করে পাড়ি দেয় মরুভূমি-- বিষণ্ন, অনাথ। 
না না, এ তো প্রকৃতির স্পষ্ট ব্যভিচার এই সান্ধ্য-সলজ্জ অধিবেশনে! 
ওই ছোট্ট মরূদ্যানটুকু যেন তার সবশেষ-সমঝোতা-- 
কিছুটা লৌকিক বটে, অনেকটাই অপ্রাকৃত। হ্যাশট্যাগ অজাচার-অভিচার।

ওই মরূদ্যান যেন আদিগন্ত বারোটা-বাজিয়ে-রাখা ব্যভিচারের দায়ে
নিসর্গের কাছ থেকে জোর-করে-নেওয়া শাদা কাগজে স্বাক্ষর।

এবার বলুন, কোন উপচারে, অভিজ্ঞানে, কোন কলনবিধিতে 
সমাধান হবে এইসব গূঢ় সমাকলনের?

ভ্রুকুণ্ডা ঘাসের বীজ বিঁধে আছে পোশাকে তোমার
তুরীয় মস্তিতে মওলা মুর্শিদ মুরিদ সব একাকার
মাস্ত মওলা মাস্ত কালান্দার 
যুগলনিয়তিবন্দি ফুল ও ভ্রমর, অনিবার্য ওই ভ্রামরী মিত্রতা
অজ্ঞেয় আসক্তিবশে।

পাঁচ ধাতুতে তৈরি খাঁচা তার ভেতরে তোতা
ছয়টা চোরে যুক্তি ক’রে খোঁচাচ্ছে অযথা।
মাঝে মাঝেই ঘাবড়ে যাচ্ছে তোতা।

জিরাফের উচ্চ চিন্তা আর কোনোভাবেই পৌঁছায় না মেষশাবকের কাছে। 
দিকে দিকে অপভ্রংশ, অভিচার, ব্যতিহার মানচিত্র-- ঝাপসা, জটিল, দুরধ্যয়। 
জাতিবৃক্ষে ফোটে ফুল, ডালপালা ভরে ওঠে লক্ষকোটি জাতিফলে-- 
টক-মিষ্টি-কটু-ও-কষায়। চিরবসন্ত, চিরহরিৎ। 
ঝরে না কোনো পাতা, খসে না কোনো বাকল। হ্যাশট্যাগ জাতিবৃক্ষ।

বহুপর্ণা সে-জাতিগাছের কোটরের ভেতরে কোকিলাসনে আসীন 
মকর-ত্বকের-কোট-পরা এক মেদমন্থর বানর। 
কড়কড়ে ডলার গুনছে আর পটাচ্ছে বরিষ্ঠা বানরীকে।

নিচে কত কষ্টে থাকে 
দুস্থ শেয়াল সারমেয় বনবিড়াল কুরঙ্গ ও মিয়ারক্যাটেরা! 
তারা দরবিগলিত চোখে ও চিত্তে সামনের দু-পা তুলে তাকায় 
ওপরের দিকে। টুপটাপ খসে পড়ে দু-একটি ডলার। 
সমষ্টির স্বাস্থ্যে ব্যষ্টির ব্যাধি নিরাময়, নাকি 
ব্যষ্টির অসুখ সারলে সমষ্টির স্বাস্থ্য হয়-- 
এ-সবই গোলচক্র গোলকধাঁধা।
তবে রোবটদের পাসপোর্ট দেওয়া হচ্ছে জেনে বিরক্ত সবাই। 
দোষ আর রোষ একসঙ্গে গিয়ে পড়ছে মুখপোড়া হনুমানের ওপর। 
হায়! এ কেমন রোষাত্মক জ্ঞাতিতোষ, শিবাশিবচক্র! 
ইতিহাস মেরামত হচ্ছে ল্যাবে, পরিমাণমতো ট্রুথ সিরাম মিশিয়ে। 
হ্যাশট্যাগ ট্রুথ সিরাম।

অদূরে যুগলকণ্ঠে গান হচ্ছে: 
“তোমার গলি খুঁজতে গিয়ে পেলাম আমার ঘর
তোমার খোদা খুঁজতে গিয়ে মিলল আমার রব
তোমার যোজনগন্ধার ঘ্রাণ জাগিয়ে রাখে সব
বিজলি হয়ে পড়ব যখন, বুঝবে উপদ্রব।”

প্রেমগান হচ্ছে, কিন্তু প্রেম হচ্ছে না। 
কিরণ বিনিময় হচ্ছে, কিন্তু সে-কিরণ নিস্তেজ, নিস্তেজস্ক্রিয়।
দুটি শব্দ হতে চায় এক শব্দ, সুচারু সমাসবদ্ধ, 
কিন্তু হায়, হয়ে যায় হাইফেনে সিদ্ধ। 
আস্ফালন, স্বরাঘাত, শ্বাসাচার, নিপাতনে সিদ্ধ লঘু পরিহাস।

এইমাত্র ভাগাড়ে বিধ্বস্ত হলো বোমারু বিমান। 
সঙ্গে সঙ্গে কি-জানি কোত্থেকে একঝাঁক ডোমকাক এসে 
ডাইভ দিয়ে পড়ল বোমারুর দাউদাউ ভগ্নাংশের ওপর। 
মহাকাশ থেকে অহেতু স্ফুলিঙ্গসহ ঝরতে থাকল 
অজস্র আসমানি কমা ও সেমিকোলন, দস্তাকণা, বকেয়া বিস্ময়চিহ্ন।

পাঁচ ধাতুতে তৈরি খাঁচা তার ভেতরে তোতা
ছয়টা চোরে যুক্তি ক’রে খোঁচাচ্ছে অযথা।
ওই তো আবার ভড়কে যাচ্ছে তোতা।

কবুতর। নাম ভল্লাতক। কারা যেন পুচ্ছে ও পালকে তার 
বাইশবার কৌশলমন্ত্র পড়ে ছেড়ে দিয়েছে ভবিতব্যের দিকে। 
আজন্ম উড়ছে আর ঘুরছে কবুতর, 
উড়ে-ঘুরে মরছে, ভগ বা ভবিতব্য মিলছে না কিছুই।

শীতের রাতে অচেনা দুয়ারের সামনে ফেলে-রেখে-যাওয়া নবজাতক 
বড় হয়ে একদা বেরিয়ে পড়ে বেরহম বাবামায়ের সন্ধানে।
নিশ্চয়ই রয়েছে কোথাও-না-কোথাও এক দ্বিতীয়রহিত জায়গা 
যেখানে এসে মিলিত হয় হাহাকার করতে-করতে-আসা 
দুনিয়ার যত দয়ামায়াহীন পিতামাতা আর পরিত্যক্ত সন্তানেরা,
এমনকি নর্দমায় ছুড়ে ফেলে-দেওয়া পলিথিনবদ্ধ ভ্রূণেরাও। 
জড়িয়ে ধরে তারা পরস্পরে
ফেলে দেবার জন্য বারবার ধন্যবাদ দেয় বিগলিত বাবামাকে।

পাঁচ ধাতুতে তৈরি খাঁচা তার ভেতরে তোতা
ছয়টা চোরে যুক্তি ক’রে খোঁচাচ্ছে অযথা।
ঘাবড়ে যাচ্ছে তোতা।

মত্ত ড্রামারের হাত থেকে ছুটে-যাওয়া-ফের-ধরে-ফেলা যুগলকাঠির আবেশে 
কিছুক্ষণের মধ্যেই স্বয়ংক্রিয় উন্মাতাল বাজতে থাকবে ড্রাম, 
ড্রামারের হতভম্ব দু-হাতকে হাজিরনাজির মেনেই। 
লৌকিক এপিসোড হয়ে উঠবে অলীক অলৌকিক। 
সমগ্র সংগীতসন্ধ্যা একটু একটু করে হয়ে উঠবে
খর অপিনিহিতি পেরিয়ে আসা এক নম্র অভিশ্রুতি।

এই তো ধীরে ধীরে রসাগম হচ্ছে পাঠবস্তুতে। 
রূপ আসছে, রূপক আসছে, অলংকার-ঠিকরানো দ্যুতি আসছে, 
ছন্দও আসছে চুপিচুপি। ছন্দশ্চ্যুতি, সেও। 
আসছে ছন্দছুপানো কৃৎকৌশলও।

রসাধিক্যে ভোগার আগেই কোরো রসসংযম। 
তা না হলে রসোত্তীর্ণ হতে হতে হয়ে যাবে বেসামাল, রসজীর্ণ।
হ্যাশট্যাগ রসাধিক্য।

এবার দেখুন
ছয়টা চোরে দাবি করে খাঁচার মালিকানা
দখলদারি মারামারি অনিবার্য, জানা। 
সূর্য তেতে ওঠার আগেই উড়াল দেবে তোতা
দেবেই দেবে, হবে না অন্যথা।

আবার তোতা আসবে নাকি ফিরে
আগমনিগম চক্র তবে ঘুচবে কেমন করে!?