Showing posts with label সাহিত্যের ইতিহাস-ঐতিহ্য. Show all posts
Showing posts with label সাহিত্যের ইতিহাস-ঐতিহ্য. Show all posts
Wednesday, March 6, 2019
শায়ের, শায়েরি ও মাহফিলে মুশায়েরা
- রফিকুল ইসলাম রফিক নানা আঙ্গিকের শিল্প-সাংস্কৃতিক চর্চার পাশাপাশি ভারতীয় উপমহাদেশের বিভিন্ন শহরের মতো ঢাকারও ছিল মুশায়েরা আয়োজনের ঐতিহ্য। মুশায়েরা হলো উর্দু শেরশায়েরি পাঠের আসর। এ মাধ্যম উর্দু কাব্য-আন্দোলনে বেশ গুরুত্বপূর্ণ এক ভূমিকা পালন করে। ঢাকা একসময় উর্দু ও ফারসি সাহিত্যের চর্চার জন্য ছিল বিশেষভাবে খ্যাত। যখন কোনো সাহিত্য পত্রিকা ছিল না, তখন এই মুশায়েরা পাঠের আয়োজনের মাধ্যমে সাধারণ মানুষ কাব্যচর্চার সংস্পর্শে আসার সুযোগ পেত। মজার বিষয়, অক্ষরজ্ঞানহীন শায়েররাও এ কাব্য সভায় উপস্থিত হয়ে অনর্গল উর্দু শের উপস্থাপন করতেন। এ কাব্যসভায় উপস্থিত থাকতেন কয়েকজন বিচারক। সভার সভাপতিকে মির মুশায়েরার বলা হতো। কবিতা বা শেরশায়েরি পাঠকের সামনে শামাদানে রাখা হতো মোমের প্রদীপ। মুশায়েরা অনুষ্ঠানে যেসব শেরশায়েরি জনপ্রিয় হতো, সেগুলো পরে পত্রিকায় প্রকাশ করে বিনা মূল্যে বিতরণ করা হতো। এ ছাড়া মুখে মুখে কাব্যের প্রসারে মুশায়েরা অনুষ্ঠান অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করে। এর সঙ্গে সম্পর্কিত আদব-কায়দা ছিল অত্যন্ত মার্জিত ও সুশৃঙ্খল। এবার ঢাকার সে সময়ের জনপ্রিয় একটি শায়েরির কয়টি পঙ্ক্তি উদ্ধৃত করা যাক : ‘বেতাবি কাহ রাহি হায়/ চালো কুয়ে ইয়ার মে/ সিমার কি তারাক হয়ে/দেলে (দিল) বেকারার মে।’ অর্থাৎ অস্থির হৃদয় বলছে চল প্রিয়ার কোঠায়। পারদের প্রদাহ আছে আমার অস্থির মনে। সমকালীন শহুরে পরিবেশে মুশায়েরা বুদ্ধিবৃত্তিক চিত্তবিনোদনের সর্বাপেক্ষা মার্জিত অনুষ্ঠান বলে পরিচিতি লাভ করে। গজল রচনার সঙ্গেও মুশায়েরা অনুষ্ঠানটি ছিল সম্পর্কিত। ঢাকায় ঘরে ঘরে একসময় উর্দু পাহেলি বলার প্রচলন ছিল। পাহেলি বলতে বোঝানো হতো ধাঁধাকে। ঢাকাইয়া মানুষের মুখে মুখে একসময় পাহেলি বলার চল ছিল, বসত এর আসরও। ঢাকায় প্রচলিত দুটি পাহেলি ছিল : ১. কালি মুরগি কালাম তারাস/ আণ্ডা দেবে শ ও পচাশ। অর্থাৎ মাখনা। এবং ২. ওস পার সে আয়ি গৌরী/ ওসপে হ্যায় রেশম কি ডোরি/ খোদ দৌড়তি, লোগকো দৌওরাতি। অর্থাৎ ঘুড়ি।
মুশায়েরা আয়োজন মোগল আমলেই উৎকর্ষ লাভ করে, পায় ব্যাপক প্রসার। ঢাকায় একসময় কবি মির্জা গালিবের ছিল অসংখ্য গুণগ্রাহী। উর্দু ভাষার জনাকয়েক কবি তাঁর সঙ্গে পত্র-যোগাযোগ করতেন। অনেকে তাঁর সানি্নধ্যেও এসেছিলেন। নওয়াব শামসুদদৌলাহ ছিলেন উর্দু সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষক। তিনি মুশায়েরার আয়োজন করতেন। তাঁর আয়োজিত বৈঠকের একটি শের মানুষের মুখে মুখে ফিরত : ‘মোহাব্বত মে এক এয়সা বক্ত ভি আতা ইনসাঁ পর/ সিতারো কি চমক সে চোট লাগতি হ্যায় রগেঁজা পর।
আহসান মঞ্জিলের নবাব পরিবারও মুশায়েরার জন্য খ্যাত। নবাব আহসান উল্লাহ কাব্যপ্রেমিক এবং তিনি নিজে উর্দু ও ফারসি কবিতা রচনা করতেন। করতেন মুশায়েরার আয়োজন। নবাব আবদুল গনি ছিলেন সংগীতপ্রেমী মানুষ। তাঁর দরবারে গজল এবং নাতের আসর বসত। নবাব গনি মহররম মাসে শহীদে কারবালার স্মরণে মর্সিয়া, সালাম, কাশিদা, নাত, নওহা ইত্যাদি পাঠের জন্য কবিদের উৎসাহিত করতেন। নানা উৎসব উপলক্ষেও আহসান মঞ্জিলে জাঁকজমকের সঙ্গে মুশায়েরা অনুষ্ঠিত হতো।
আশরাফউজ্জামান তাঁর ছেলেবেলার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে যে তথ্য দিয়েছেন, তা এ রকম : ‘ঢাকার রইস সম্প্রদায়ের ভাষাও ছিল উর্দু। কাজেই উর্দু ভাষা নিয়ে ঈদের দিনে কবিতার আসর জমে উঠত আহসান মঞ্জিলে। কবিরা এক এক লাইন করে কবিতা আওড়াতেন। আর শায়েরা বাহ, বাহ, মারহাবা, মারহাবা_মাশাআল্লাহ ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে উঠতেন। বেগম সাহেবরা অন্দরমহল থেকে আসরে পাঠাতেন জাফরানি শবরত এবং ইরাকি খেজুর। দুধযোগে কাশ্মীরি চা-ও আসত সঙ্গে।’ নবাব খাজা আহসান উল্লাহ শাহীনের একটি শায়েরির কয়েকটি পঙ্ক্তি এমন : ‘দেল খোশহো কে ফাসলে গুল, গুলিস্তাঁমে ফের আয়ি হায়/ নাওয়েদে আয়েশ ও ইসরাত ফের সাবা গুলশান মে লায়ি হায়।/ খিলে হায় ফুল বো কালমুমে নহরে হার তরপ জারি/ মায় ইসরাত পেলাসাকি, ঘটাভি শার পেছায়ি হায়।
সৈয়দ মোহাম্মদ বাকের, তাবতা বাই ও আগা জানই রানি ফারসি ভাষার উঁচু স্তরের কবি ছিলেন। প্রতি মাসে তাঁদের বাসভবনে ফারসি মুশায়েরার আসর বসত। কয়েকটি ঢাকাইয়া পরিবারে নিয়মিত মুশায়েরার আসর বসত। হাকিম হাবিবুর রহমানের বাসভবনে প্রতি মাসে একবার মুশায়েরার আসর বসত। ১৯৩০ থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত প্রতি মাসে মুশায়েরার আয়োজন করা হতো। মুশায়েরার পঠিত শেরশায়েরির মধ্য থেকে বাছাই করা শের ‘গুলদাস্তা’ নামের কাব্য পত্রিকায় প্রকাশ করে বিনা মূল্যে বিতরণ করা হতো। কবি কাজী নজরুল ইসলাম কোনো এক মাঘী পূর্ণিমায় হাকিম সাহেবের বাড়ির ছাদে এক মজলিসে উপস্থিত ছিলেন। নজরুলের গজল ও ইসলামী গান শোনার জন্য শহরের গণ্যমান্য ও সংগীতজ্ঞ বহু লোক এ সভায় এসেছিলেন। হাকিম সাহেবের মুশায়েরায় নবাববাড়ির কবিরাও অংশ নিতেন।
ঢাকার বকশিবাজারের হজরত হাফেজ জহুরুল হক মোবারকির বাসভবনে নিয়মিত মুশায়েরার আসর বসত। এখানে ড. আন্দালিব শাদানীসহ উপমহাদেশের অনেক কবি মুশায়েরায় অংশগ্রহণ করতেন। পাকিস্তান আমলে ঢাকার নিমতলীর রেডিও পাকিস্তান (বর্তমানে বাংলাদেশ বেতার) থেকে প্রচারিত মুশায়েরা অনুষ্ঠানে সমাজের বিশিষ্ট কবি এবং সহিত্যিকরা উপস্থিত থাকতেন।
‘গুলিস্তানে-এ শরফ’ গ্রন্থের লেখক সৈয়দ শরফউদ্দীন শরফ আল হুসাইনী তাঁর বেগমবাজারের বাসভবনে মুশায়েরার আসর জমাতেন। উর্দু কবি নওশাদপুরী তাঁর বাসভবনে মুশায়েরার আয়োজন করতেন। এখানে উর্দু ভাষাভাষি লোকজন ছাড়াও বাঙালি কবি-সাহিত্যিকরাও স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করেছেন। সাবেক ওয়ার্ড কমিশনার, উর্দু সাহিত্যপ্রেমিক মরহুম আলহাজ মোহাম্মদ সাখী মিয়াও প্রায়ই মুশায়েরার আয়োজন করতেন।
Sunday, March 3, 2019
বিউটি বোর্ডিং: ইতিহাস-ঐতিহ্য, অন্যান্য তথ্য এবং ভিডিও ডকুমেন্টারী
একটা বাড়ি কী করে একটি দেশের, একটি ভাষার সাহিত্য সংষ্কৃতির ইতিহাসের সঙ্গে ভীষণভাবে জড়িয়ে থাকতে পারে তার সবচেয়ে জলজ্যান্ত উদাহরণ বিউটি বোর্ডিং।
পুরান ঢাকার বংশাল মোড়ের যানজট পেরিয়ে খানিকটা এগুলেই ভিক্টোরিয়া পার্ক। আর পার্কের পাশের রাস্তা ধরে কিছুটা দূর সামনে এগুলেই শ্রীশদাস লেন। এই লেনের এক নাম্বার বাড়িটিই বিউটি বোর্ডিং।
বাড়িটি ছিল জমিদার সুধীর চন্দ্র দাসের। লোকজন জমিদার বাড়ি বলেই চিনত। ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের সময় জমিদার সুধীর চন্দ্রের পরিবার ভারতে চলে যায়। তখন এখানে গড়ে ওঠে একটি ছাপাখানা। সে সময় এখান থেকেই প্রকাশিত হত সোনার বাংলা নামের একটি পত্রিকা। দেশ ভাগের পর সোনার বাংলা পত্রিকাটির অফিস কলকাতায় চলে গেলে জমিদারের কাছ থেকে জায়গাটি বুঝে নেন নলিনী মোহন সাহা ও তার ভাই প্রহ্লাদ সাহা। তারপর সোনার বাংলা প্রেসের জায়গায় নলিনী মোহন সাহা তার বড় মেয়ের নামানুসারে স্থাপন করেন বিউটি বোর্ডিং নামে আবাসিক ও রেস্তোঁরা।
এই বিউটি বোর্ডিংকে কেন্দ্র করেই পরে বাংলাদেশের শিল্প সংস্কৃতির রেনেসাঁ ঘটে। বিউটি বোর্ডিং ও এর আড্ডার ইতিহাস চল্লিশের দশক থেকেই সুখ্যাতি লাভ করেছিল। সমমনা লোকদের তখন নানা বিষয় নিয়ে চলত তোলপাড় করা সব আড্ডা।
অনেক কবি সাহিত্যিকেরই এভাবে লেখা তৈরির বহু ইতিহাস রয়েছে এই বিউটি বোর্ডিংয়ে। এক সময় এখানে কবি শামসুর রাহমান, সৈয়দ শামসুল হক, আসাদ চৌধুরী, শহীদ কাদরী, আবদুল গাফফার চৌধুরী, হাসান হাফিজুর রহমান, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, আল মাহমুদ, মহাদেব সাহা, নির্মলেন্দু গুণ, সমর দাশ, সত্য সাহা, গোলাম মুস্তফা, খান আতা, জহির রায়হান, বেলাল চৌধুরী, আনিসুজ্জামান, সন্তোষ গুপ্ত, ফজল শাহাবুদ্দিন, কবি ইমরুল চৌধুরী, জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, শফিক রেহমান, ফয়েজ আহমদসহ শিল্প সাহিত্যের বহু বিখ্যাত মানুষ আড্ডা দিতেন বিউটি বোর্ডিং এর অন্দরে।
টিভি ব্যক্তিত্ব ফজলে লোহানী, শিল্পী দেবদাস চক্রবর্তী, চিত্রশিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী, যাদু শিল্পী জুয়েল আইচেরও দেখা মিলত বিউটি বোর্ডিং এর আড্ডায়।
চলচ্চিত্র শিল্পের কিংবদন্তি আব্দুল জব্বার এখানে বসেই লেখেন বাংলার প্রথম সবাক ছবি ‘মুখ ও মুখোশ’ এর চিত্রনাট্য। প্রখ্যাত সুরকার সমর দাস বাংল ভাষার বহু বিখ্যাত গানের সুর সৃষ্টি করেছিলেন এখানে আড্ডা দেয়ার ফাঁকে ফাঁকে।
ফিকে হয়ে যাওয়া হলদে ভবনটি এই কিংবদন্তিদের পদচিহ্ন বুকে নিয়ে আজো ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে এখনো দাড়িয়ে আছে।
অবশ্য সময়ের সাথে সাথে কিছুটা বদলও এসেছে এখানে। মূল ফটকের উপরে হাতে লেখা সাইন বোর্ডের পাশপাশি লেগেছে ডিজিটাল সাইন।
মূল ফটক দিয়ে প্রবেশ মাত্রই চোখে পড়বে ফিকে হয়ে যাওয়া হলদে রঙের দোতলা বাড়িটা। বাড়ির সামনে সবুজে ঘেরা প্রশস্ত উঠান। দেখলেই বোঝা যায় জম জমাট আড্ডা দেবার এটাই সবচেয়ে উপযোগী জায়গা। পাশে শোবার ঘর, খাবার ঘর, পেছনে সিঁড়ি ঘর ও উপাসনালয় সবই যেন রূপকথার গল্পের মতো করে সাজান। কিছু সময়ের জন্য মনে হবে যেন অতীতে হারিয়ে গেছেন।
প্রধান ফটক দিয়ে ঢোকার মুখেই চোখে পড়বে খাবার ঘর। সারি সারি টেবিল চেয়ার পাতা। প্রতিটিতে স্টিলের বড় থালা আর গ্লাস রাখা। একসময় এখানে পিঁড়িতে বসে মেঝেতে থালা রেখে খাওয়ানো হতো। খাবার ঘরটিতে ঢুকার সাথে সাথেই বাহারি সব খাবারের ঘ্রানে জিবে জল এসে পড়বে। খাবারের তালিকায় রয়েছে ভাত, ডাল, সবজি, শাকভাজি, ভর্তা, বড়া, চড়চড়ি, সরিষা ইলিশ, রুই, কাতলা, বাইলা, তেলাপিয়া, চিতল, পাবদা, ফলি, সরপুটি, শিং, কৈ, মাগুর, ভাংনা, চিংড়ি, চান্দা, বোয়াল, কোরাল মাছ, আইড় মাছের ঝোলের মতন নানান সুস্বাদু পদ।
এসব দিয়ে তৃপ্তি করে খাবেন। সেই তুলনায় বিল যে খুব বেশি আসবে তাও না। বিউটি বোর্ডিংএ বসে ইলিশের স্বাদ নিতে চাইলে খরচ করতে হবে ১৮০ টাকা। মুরগি ও খাসির মাংস ১০০, খিচুড়ি প্রতি প্লেট ৪০ টাকা, পোলাও ৫০ টাকা, সবজি ৩০ টাকা, বড়া ১০, চচ্চড়ি ৩০ আর একবাটি মুড়িঘণ্ট মিলবে মাত্র ৭০ টাকায়।
বোর্ডিংএ রয়েছে সব মিলিয়ে ২৭ থাকার ঘর। এর মধ্যে ১৭ টি সিঙ্গেল বেড ও ১০ টি ডাবল বেড। সিঙ্গেল রুমের ভাড়া ২০০ টাকা আর ডাবল রুম ৪০০ টাকা।
এখন অবশ্য সেই আড্ডা আর বসে না বিউটি বোর্ডিং এ। হলেও খুব কম। দেখলে অনেকে হয়তো বিশ্বাসই করতে চাইবে না এখান থেকেই মোড় ঘুরে গিয়েছিলো একটি দেশের সাহিত্য সংষ্কৃতির। সৃষ্টি হয়েছিল অন্য এক জাতিসত্ত্বার যার মূলে ছিলো আড্ডাবাজ একদল মানুষ।
পুরান ঢাকার বংশাল মোড়ের যানজট পেরিয়ে খানিকটা এগুলেই ভিক্টোরিয়া পার্ক। আর পার্কের পাশের রাস্তা ধরে কিছুটা দূর সামনে এগুলেই শ্রীশদাস লেন। এই লেনের এক নাম্বার বাড়িটিই বিউটি বোর্ডিং।
বাড়িটি ছিল জমিদার সুধীর চন্দ্র দাসের। লোকজন জমিদার বাড়ি বলেই চিনত। ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের সময় জমিদার সুধীর চন্দ্রের পরিবার ভারতে চলে যায়। তখন এখানে গড়ে ওঠে একটি ছাপাখানা। সে সময় এখান থেকেই প্রকাশিত হত সোনার বাংলা নামের একটি পত্রিকা। দেশ ভাগের পর সোনার বাংলা পত্রিকাটির অফিস কলকাতায় চলে গেলে জমিদারের কাছ থেকে জায়গাটি বুঝে নেন নলিনী মোহন সাহা ও তার ভাই প্রহ্লাদ সাহা। তারপর সোনার বাংলা প্রেসের জায়গায় নলিনী মোহন সাহা তার বড় মেয়ের নামানুসারে স্থাপন করেন বিউটি বোর্ডিং নামে আবাসিক ও রেস্তোঁরা।
এই বিউটি বোর্ডিংকে কেন্দ্র করেই পরে বাংলাদেশের শিল্প সংস্কৃতির রেনেসাঁ ঘটে। বিউটি বোর্ডিং ও এর আড্ডার ইতিহাস চল্লিশের দশক থেকেই সুখ্যাতি লাভ করেছিল। সমমনা লোকদের তখন নানা বিষয় নিয়ে চলত তোলপাড় করা সব আড্ডা।
অনেক কবি সাহিত্যিকেরই এভাবে লেখা তৈরির বহু ইতিহাস রয়েছে এই বিউটি বোর্ডিংয়ে। এক সময় এখানে কবি শামসুর রাহমান, সৈয়দ শামসুল হক, আসাদ চৌধুরী, শহীদ কাদরী, আবদুল গাফফার চৌধুরী, হাসান হাফিজুর রহমান, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, আল মাহমুদ, মহাদেব সাহা, নির্মলেন্দু গুণ, সমর দাশ, সত্য সাহা, গোলাম মুস্তফা, খান আতা, জহির রায়হান, বেলাল চৌধুরী, আনিসুজ্জামান, সন্তোষ গুপ্ত, ফজল শাহাবুদ্দিন, কবি ইমরুল চৌধুরী, জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, শফিক রেহমান, ফয়েজ আহমদসহ শিল্প সাহিত্যের বহু বিখ্যাত মানুষ আড্ডা দিতেন বিউটি বোর্ডিং এর অন্দরে।
টিভি ব্যক্তিত্ব ফজলে লোহানী, শিল্পী দেবদাস চক্রবর্তী, চিত্রশিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী, যাদু শিল্পী জুয়েল আইচেরও দেখা মিলত বিউটি বোর্ডিং এর আড্ডায়।
চলচ্চিত্র শিল্পের কিংবদন্তি আব্দুল জব্বার এখানে বসেই লেখেন বাংলার প্রথম সবাক ছবি ‘মুখ ও মুখোশ’ এর চিত্রনাট্য। প্রখ্যাত সুরকার সমর দাস বাংল ভাষার বহু বিখ্যাত গানের সুর সৃষ্টি করেছিলেন এখানে আড্ডা দেয়ার ফাঁকে ফাঁকে।
ফিকে হয়ে যাওয়া হলদে ভবনটি এই কিংবদন্তিদের পদচিহ্ন বুকে নিয়ে আজো ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে এখনো দাড়িয়ে আছে।
অবশ্য সময়ের সাথে সাথে কিছুটা বদলও এসেছে এখানে। মূল ফটকের উপরে হাতে লেখা সাইন বোর্ডের পাশপাশি লেগেছে ডিজিটাল সাইন।
মূল ফটক দিয়ে প্রবেশ মাত্রই চোখে পড়বে ফিকে হয়ে যাওয়া হলদে রঙের দোতলা বাড়িটা। বাড়ির সামনে সবুজে ঘেরা প্রশস্ত উঠান। দেখলেই বোঝা যায় জম জমাট আড্ডা দেবার এটাই সবচেয়ে উপযোগী জায়গা। পাশে শোবার ঘর, খাবার ঘর, পেছনে সিঁড়ি ঘর ও উপাসনালয় সবই যেন রূপকথার গল্পের মতো করে সাজান। কিছু সময়ের জন্য মনে হবে যেন অতীতে হারিয়ে গেছেন।
প্রধান ফটক দিয়ে ঢোকার মুখেই চোখে পড়বে খাবার ঘর। সারি সারি টেবিল চেয়ার পাতা। প্রতিটিতে স্টিলের বড় থালা আর গ্লাস রাখা। একসময় এখানে পিঁড়িতে বসে মেঝেতে থালা রেখে খাওয়ানো হতো। খাবার ঘরটিতে ঢুকার সাথে সাথেই বাহারি সব খাবারের ঘ্রানে জিবে জল এসে পড়বে। খাবারের তালিকায় রয়েছে ভাত, ডাল, সবজি, শাকভাজি, ভর্তা, বড়া, চড়চড়ি, সরিষা ইলিশ, রুই, কাতলা, বাইলা, তেলাপিয়া, চিতল, পাবদা, ফলি, সরপুটি, শিং, কৈ, মাগুর, ভাংনা, চিংড়ি, চান্দা, বোয়াল, কোরাল মাছ, আইড় মাছের ঝোলের মতন নানান সুস্বাদু পদ।
এসব দিয়ে তৃপ্তি করে খাবেন। সেই তুলনায় বিল যে খুব বেশি আসবে তাও না। বিউটি বোর্ডিংএ বসে ইলিশের স্বাদ নিতে চাইলে খরচ করতে হবে ১৮০ টাকা। মুরগি ও খাসির মাংস ১০০, খিচুড়ি প্রতি প্লেট ৪০ টাকা, পোলাও ৫০ টাকা, সবজি ৩০ টাকা, বড়া ১০, চচ্চড়ি ৩০ আর একবাটি মুড়িঘণ্ট মিলবে মাত্র ৭০ টাকায়।
বোর্ডিংএ রয়েছে সব মিলিয়ে ২৭ থাকার ঘর। এর মধ্যে ১৭ টি সিঙ্গেল বেড ও ১০ টি ডাবল বেড। সিঙ্গেল রুমের ভাড়া ২০০ টাকা আর ডাবল রুম ৪০০ টাকা।
এখন অবশ্য সেই আড্ডা আর বসে না বিউটি বোর্ডিং এ। হলেও খুব কম। দেখলে অনেকে হয়তো বিশ্বাসই করতে চাইবে না এখান থেকেই মোড় ঘুরে গিয়েছিলো একটি দেশের সাহিত্য সংষ্কৃতির। সৃষ্টি হয়েছিল অন্য এক জাতিসত্ত্বার যার মূলে ছিলো আড্ডাবাজ একদল মানুষ।
Source: www.dhakatimes24.com
Please see these video:
Please browse this link for more information: https://adarbepari.com/beauty-boarding-bangla-bazar-dhaka
Saturday, March 2, 2019
লিটল ম্যাগ কালচারঃ ইতিহাস, ঐতিহ্য ও ভবিষ্যৎ ।
লিটল ম্যাগ কালচারঃ ইতিহাস, ঐতিহ্য ও ভবিষ্যৎ ।
- প্রবীর বিকাশ সরকার
লিটল ম্যাগাজিন। আদর করে অনেকে বলেন ‘লিটল ম্যাগ’ বা ‘লিট ম্যাগস’ নামে। যার অর্থ আদতেই ক্ষুদ্র সাহিত্যকোষ। বাংলায় ছোট কাগজ। কী অর্থে ছোট? সেটা সুস্পষ্ট নয়। সেই তো ঢাউস-ঢাউস সাহিত্য ম্যাগাজিনও বের হয়েছে এবং হচ্ছে। কলকাতার বিখ্যাত ছোট কাগজ ‘অনুস্টুপ’ এর পূজা সংখ্যা এতই বিপুলÑ মেদবহুল যে হাতের মুঠোয় ধরে না! প্রকৃতপক্ষে, কোন্ মানদণ্ডে ছোট কাগজ তা নিয়ে বিতর্ক বিদ্যমান। মূলত প্রথাবিরুদ্ধ একটি আন্দোলন ছিল এই লিটল ম্যাগাজিন প্রকাশ। যাতে নতুন বা অখ্যাত কবিরাই কবিতা লিখবেন এবং অবাণিজ্যিক ভিত্তিতে। লক্ষ্য : কবিতাকে পণ্য করা যাবে না। পরবর্তীকালে এই গণ্ডি ভেঙ্গে গেছে সংযুক্ত হয়েছে প্রবন্ধ, গল্প, নাটক, চলচ্চিত্র, সাক্ষাতকার, গ্রন্থালোচনা, শিল্পকলা আরও কত কী!
‘লিটল ম্যাগাজিন’ শব্দটি বাংলায় কবি বুদ্ধদেব বসু প্রথম ব্যবহার করেছিলেন ১৯৫৩ সালের সাপ্তাহিক ‘দেশ’ কাগজের মে সংখ্যায় প্রকাশিত তার ‘সাহিত্যপত্র’ নামক প্রবন্ধে। মনে হয় কোনক্রমে মার্কিন দেশীয় লিটল ম্যাগাজিন জাতীয় সাহিত্য কাগজ তার হাতে এসে থাকবে বা লিটল ম্যাগাজিন আন্দোলনের খবর তিনি পেতেন। তারপর তো পঞ্চাশের দশকে তিনি আমেরিকাতেই গেলেন অতিথি অধ্যাপক হিসেবে সেখানকার বিশ্ববিদ্যালয়ে তুলনামূলক সাহিত্য পড়াতে তখন স্বচক্ষে লিটল ম্যাগাজিন প্রত্যক্ষ করেছেন বলাই যায়।
লিটল ম্যাগাজিন প্রথম কী আমেরিকায় প্রকাশিত হয়েছিল? সঠিক জানা নেই, তবে অনেকে মনে করেন আঠারো শতকের মাঝামাঝি আমেরিকার বোস্টন শহর থেকে প্রকাশিত ‘ডায়াল’ (১৮৪০-৪৪) কাগজটিই প্রথম লিটল ম্যাগ। এটা সম্পাদনা করেছিলেন যৌথভাবে যথাক্রমে শিক্ষক, কবি ও প্রাবন্ধিক রেলফ ওয়ালডো এমারসন এবং সারা মার্গারেট ফুলার অসোলিÑ তিনি ছিলেন শিক্ষক, সাংবাদিক, নারীবাদী কর্মী এবং আমেরিকার প্রথম পরিপূর্ণ গ্রন্থ পর্যালোচক। ১৮৯৬ সালে লন্ডনে লিটল ম্যাগ প্রকাশ করেন কবি ও সমালোচক আর্থার সাইমন ‘দি সেভয়’ নামে।
বিংশ শতাব্দীতে লিটল ম্যাগাজিনের জগতে প্রথম তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা হচ্ছে ‘দি মাসেস’ (জনসাধারণ) নামে একটি কাগজের উত্থান। এটা নিউইয়র্কে প্রকাশিত হয়েছিল তরুণ এক গবেষকের দ্বারা তার নাম ম্যাক্স ইস্টম্যান অবশ্য মূল উদ্যোক্তা ছিলেন এক খেয়ালী বামপন্থী ওলন্দাজ অভিবাসী পিয়েট ভেøগ। এই ম্যাগাজিন নিয়ে মামলাও হয়েছিল সাম্যবাদী বিষয়বস্তুর কারণে। নিষিদ্ধও হয়েছিল। অবশ্য পরবর্তীকালে ‘দি লিবোরেটর’ এবং ‘দি নিউ মাসেস’ নামে পুনরায় প্রকাশিত হয়েছিল, চালু ছিল ১৯১১-১৭ পর্যন্ত। আরও উল্লেখযোগ্য ঘটনা হচ্ছে, ১৯১২ সালে আমেরিকার শিকাগো শহরে প্রকাশিত হয় প্রভূত শক্তিশালী লিটল ম্যাগ ‘পোয়েট্রি : এ ম্যাগাজিন অব ভার্জ’- এটা সম্পাদনা করতেন কবি হেরিয়েট মনরয়ে এবং বিদেশী সম্পাদক হিসেবে প্রভাবশালী কবি এজরা পাউন্ড। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে (১৯১৪-১৮) আরও একাধিক লিটল ম্যাগ প্রকাশিত হয় আমেরিকা ও ইউরোপীয় বিভিন্ন শহরে যেমন শিকাগো, নিউইয়র্ক, সানফ্রান্সিসকো ও প্যারিস থেকে প্রকাশিত ‘দি লিটল রিভিউ’ নামক একটি ম্যাগাজিনের কথা জানা যায় যেটা ১৯১৪-২৯ পর্যন্ত বিদ্যমান ছিল, সম্পাদনা করেছেন মার্গারেট কেরোলিন এন্ডারসন নামে একজন খ্যাতিমান লেখিকা। এটা খুব প্রভাবশালী সাহিত্য কাগজ ছিল। এতে লিখে প্রভূত খ্যাতি লাভ করেছেন কবি এজরা পাউন্ড, কবি টি এস ইলিয়ট, কবি ও উপন্যাসিক জেমস জয়েস, কবি রবার্ট ফ্রস্ট প্রমুখ। ১৯১৪-১৯ পর্যন্ত ‘দি ইগোয়িস্ট’ নামে একটি কাগজ প্রকাশিত হয়েছে লন্ডনে সম্পাদক ছিলেন যথাক্রমে সাংবাদিক ও দর্শনবিষয়ক লেখিকা ডোরা মার্সডেন এবং রাজনৈতিক নারী নেত্রী ও সম্পাদক হেরিয়েট শোও ইউভার। ১৯১৫-১৯ সাল পর্যন্ত প্রকাশিত হয়েছে ‘আদারস্’ সম্পাদনা করেছেন কবি আলফ্রেড ক্রেমবর্গ। এভাবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পর্যন্ত অনেক লিটল ম্যাগ প্রকাশিত হয়েছে আমেরিকা ও ইউরোপে যেমন ‘মডার্ন রিভিউ’ (১৯২২-১২৪), ‘দি ফিউজিটিভ’ ১৯২২-২৫), ‘ভয়েসেস’ (১৯২১-৬৫), ‘সেশন’ (১৯২২-২৪) ‘ব্রুম’ (১৯২১-২৪), ‘দিস কোয়ার্টার’ (১৯২৫-৩২), ‘দি এনিমি’ (১৯২৭-২৯), ‘দি মিডল্যান্ড’ (১৯১৫-৩৩), ‘দি ফ্রন্টিয়ার’ (১৯২০-৩৯) ‘সাউথওয়েস্ট রিভিউ’ (১৯২৪), ‘ডাবল-ডিলার’ (১৯২১-২৬), ‘দি এনভিল’ (১৯৩৩-৩৫), ‘ব্লাস্ট’ (১৯৩৩-৩৪), ‘দি পার্টিশান রিভিউ’ (১৯৩৩), ‘ট্রানজিশন’ (১৯২৭-৩৮), ‘নিউ ভার্জ’ (১৯৩৩-৩৯), ‘ক্রাইটেরিয়ন’ (১৯২২-৩৯) উল্লেখযোগ্য।
এশিয়ার জাপান এবং ভারতবর্ষেও লিটল ম্যাগ আন্দোলন বিশেষ ইতিহাস সৃষ্টি করেছে। জাপানে লিটল ম্যাগাজিনকে বলা হয় ‘দোওজিনশি’, এদেশে প্রথম যে লিটল ম্যাগটির সংবাদ পাওয়া যায় সেটি সাধারণ সাহিত্যভিত্তিক নাম ‘গারাকুতা বুনকো’ ১৮৮৫ সালে প্রকাশিত হয়। এতে হাইকু, তানকা কবিতার সঙ্গে ছোটগল্পও ছিল। এটা প্রকাশ করেছিলেন কয়েকজন কবি ও সাহিত্যিক মিলে এঁরা হলেন ঔপন্যাসিক ওজাকি কোওয়োও, কবি, সাহিত্যিক ও সমালোচক ইয়ামাদা বিমিয়োও, ঔপন্যাসিক ইশিবাশি সিআন এবং কবি মারুওকা কিউকা তারা ‘কেনইউশা’ নামে একটি সাহিত্যগোষ্ঠী প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এরপর ১৮৯৩ সালে প্রকাশিত হয় বিখ্যাত ‘বুনগাকুকাই’ সাহিত্য কাগজ তাতে খ্যাতিমান সাহিত্যিক শিমাজাকি তোওসোন, ঔপন্যাসিক হিগুচি ইচিয়োও, কবি হিরাতা তোকুবোকু প্রমুখ লিখতেন। ১৯০৭ সালে প্রকাশিত হয় ‘শিনশিচোও’- এই গোষ্ঠীতে ছিলেন বিশ্বখ্যাত কবি ও ঔপন্যাসিক আকুতাগাওয়া রিইউনোসুকেসহ খ্যাতিমান সাহিত্যিক ও সাংবাদিক কিকুচি হিরোশি, হাইকু কবি, ঔপন্যাসিক ও নাট্যকার কুমে মাসাও প্রমুখ। ১৯১০ সালে বের হয় আলোড়ন সৃষ্টিকারী লিটল ম্যাগ ‘শিরাকাবা’ এটার সঙ্গে জড়িত ছিলেন প্রভাবশালী কবি, কথাসাহিত্যিক ও চিত্রশিল্পী রবীন্দ্রভক্ত মুশাকোজি সানেআৎসু, ঔপন্যাসিক শিগে নাওইয়া, কবি কিনোশিতা রিনগে প্রমুখ। ১৯২৩ পর্যন্ত কাগজটি চালু ছিল। অন্য দুটো সাহিত্য কাগজ আজও প্রকাশিত হয়ে চলেছে। বিগত শতবর্ষ ধরে জাপানে সাহিত্য, সংস্কৃতি, চলচ্চিত্র, নাটক ও শিল্পকলার বহু লিটল ম্যাগ প্রকাশিত হয়েছে, ঝরে গিয়েও এখনও বেশকিছু টিকে আছে। বিশেষ করে কবিতাপত্র ‘গেনদাইশি’ খুবই ঋদ্ধ একটি লিটল ম্যাগ এবং ব্যাপক জনপ্রিয়। হাইকুভিত্তিক লিটল ম্যাগও একাধিক প্রকাশিত হচ্ছে। জাপানী সাহিত্য এক বিশাল জগত, সেই বিপুল বৈচিত্র্যময় জগতের অনেক কীর্তিমান কবি ও সাহিত্যিকই লিটল ম্যাগ সম্পাদনা করেছেন এবং এর মাধ্যমেই প্রতিষ্ঠার পথে এগিয়ে গেছেন। জাপানে সবাই হাইকু লিখতে জানে। তানকা কবিতা লেখার চর্চাও সুবিস্তৃত। ফলে উচ্চবিদ্যাপীঠগুলো থেকে প্রচুর লিটল ম্যাগ প্রকাশ করে ছাত্রছাত্রীরা।
ভারত উপমহাদেশের প্রথম লিটল ম্যাগাজিন কোথায় প্রকাশিত হয়েছিল গবেষণাসাপেক্ষ। কেউ কেউ সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় সম্পাদিত ‘বঙ্গদর্শন’, অনেকে মনে করেন কথাশিল্পী প্রমথ চৌধুরীর সুসম্পাদিত ‘সবুজপত্র’ সাময়িকী ভারতবর্ষ তথা উপমহাদেশের প্রথম সাহিত্যবিষয়ক লিটল ম্যাগ বা ছোটকাগজ। তবে মুক্ত বিশ্বকোষ উইকিপেডিয়ার কল্যাণে জানা যাচ্ছে যে, অবিভক্ত বাংলার লিটল ম্যাগ আন্দোলন অনন্য এক ইতিহাস সৃষ্টি করেছে। এই ধারা প্রভাবিত করেছে পঞ্চাশের দশকে মারাঠি সাহিত্য এবং ষাটের দশকে বোম্বের সাহিত্য জগতকে। হিন্দি, উর্দু এবং অসমীয় সাহিত্যিকদেরও নাড়া দিতে সক্ষম হয়েছে। ১৯২৩ সালে কলকাতায় ‘কল্লোল’ সাহিত্য কাগজকে কেন্দ্র করে সূচিত হয় লিটল ম্যাগ আন্দোলন। আধুনিক কবি যথাক্রমে কাজী নজরুল ইসলাম, মোহিতলাল মজুমদার, অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত, সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত, প্রেমেন্দ্র মিত্র প্রমুখ এই আন্দোলনের পুরোধা ছিলেন। ১৯৩০ সালের দিকে প্রকাশিত হয় প্রবাদপ্রতিম আধুনিক কথাসাহিত্যিক কবি বুদ্ধদেব বসুর সম্পাদিত ‘কবিতা’, তারও আগে ১৯২৯ সালে ঢাকায় কবি অজিত দত্তের সঙ্গে ‘প্রগতি’ সম্পাদনা করেন প্রথমে হাতে লিখে; কবি সুধীন্দ্রনাথ দত্ত বের করেন ‘পরিচয়’ প্রভৃতি। এরপর একাধিক ছোটকাগজ প্রকাশিত হয়েছে কলকাতায় তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, শনিবারের চিঠি, সওগাত, শিখা, কালিকলম, পূর্বাশা, চতুরঙ্গ প্রভৃতি।
পঞ্চাশের দশকে ভূমিকম্পের মতো নাড়া দিল দুই বাংলার সাহিত্য জগতকে ‘কৃত্তিবাস’ কাগজ, শক্তিশালী তরুণ কবি যেমন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, আনন্দ বাগচী, দীপক মজুমদার প্রমুখ এর উদ্যোক্তা। কিন্তু ‘কৃত্তিবাস’কে ছাড়িয়ে ধূমকেতুর মতো ঝড় তুলল তাদেরই সমবয়সী কবি ও সাহিত্যিক সমীর রায়চৌধুরী, মলয় রায়চৌধুরী, দেবী রায় প্রমুখ মিলে অভিনব সাহিত্য আন্দোলন ‘হাঙরি জেনারেশন’ বা ‘হাঙরি আন্দোলন’ ষাট দশকের প্রথম দিকে। তাদের মুখপত্র ছিল ‘হাওয়া ৪৯’ নাম একটি কাগজ।
আমার সঙ্গে লিটল ম্যাগাজিনের প্রথম পরিচয় ১৯৭৬ সালে। এর আগে জানতাম না এই সম্পর্কে, অবশ্য দরকারও পড়েনি। তখন খুব শুনতাম ‘সংকলন’ শব্দটি। তাতে থাকে কবিতা, ছড়া, গল্প ও প্রবন্ধ। কোন কোনটা ছড়ার সঙ্কলন, কোনটা কবিতার, কোনটা গল্পের ইত্যাদি। কিন্তু সঙ্কলন আর ছোটকাগজ মনে হয় এক জিনিস নয়। যদিওবা দুটোই মুদ্রিত জিনিস। সঙ্কলনের মধ্যে চিন্তা ও সময়ের সীমাবদ্ধতা অনুভূত হয় যা নয় ছোটকাগজে-তাতে সমুদ্রেরও গভীরতা খুঁজে পাওয়া যায়। বহু মহৎ রচনা ছোটকাগজের কল্যাণে পাঠকসমাদৃত হয়েছে যুগে যুগে।
সাহিত্যের ইতিহাস থেকে জানা যায় দেশে-বিদেশে যুগে যুগে বড় বড় কবি ও লেখকরা লিটল ম্যাগ বা ছোটকাগজ থেকেই উঠে এসেছেন প্রতিষ্ঠার মঞ্চে। আমি যা লিখেছি ১৯৭৬ সাল থেকে এখন পর্যন্ত খুব কমই লিটল ম্যাগে লিখেছি তবে জাতীয় দিবসভিত্তিক ছড়া সঙ্কলনে বেশ ছড়া লিখেছি একসময়, তখন সেটা একটা রীতি গড়ে উঠেছিল স্বাধীনতার পর। অবশ্য আমি বড় কোন কবি বা লেখক নই। হওয়ার ইচ্ছেও নেই। রাজা হয়ে গেলে রাজকীয় ঝামেলা-ঝক্কিও অনেক। নিচু হয়ে থাকাই নিরাপদ ও বন্ধুসুলভ।
তাই বলে লিটল ম্যাগ বা ছোটকাগজ পড়ি না তা নয়, বরং আমার যথেষ্ট স্নেহ ও দুর্বলতা আছে এই প্রকাশনা মাধ্যমটির জন্য কৈশোর থেকেই। জানি না ঠিক কেন? জাপানেও বিস্তর লিটল ম্যাগাজিন প্রকাশিত হয়ে থাকে আগেই বলেছি। প্রচুর কবি, লেখক ও সাহিত্যিক এগুলোতে লিখে থাকেন। প্রচার সংখ্যাও হাজার হাজার। বিশেষ করে কবিতা ও চিত্রকলার ছোটকাগজগুলো অসাধারণ! অধিকাংশই ইনার পেজ সাদাকালো তবে প্রচ্ছদ ও বিজ্ঞাপনগুলো বহুরঙা। প্রাতিষ্ঠানিক বিরোধিতা থাকা সত্ত্বেও ম্যাগগুলো বড় বড় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন পেয়ে থাকে। বৈচিত্র্যময়, সুখপাঠ্য কবিতা, গল্প ও প্রবন্ধ থাকে অনেক। সঙ্গে মনোহরা রঙিন ও সাদাকালো অঙ্কন, ইলাস্ট্রেশন। অনেক লিটল ম্যাগকে স্বল্পায়ু নিয়ে হারিয়ে যেতেও দেখেছি। জাপানে একটি জিনিস খুব সহজলভ্য সেটা হলো কাগজ। কত বিচিত্র রঙের ও রকমের কাগজ যে এদেশে আছে তা না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন। হাতে তৈরি ঐতিহ্যবাহী ‘ওয়াশি’ নামে খসখসে হাল্কা চমৎকার কাগজ রয়েছে একটু ব্যয়বহুল হলেও তাতে রঙিন অঙ্কন ও মুদ্রণের কারণে আলাদা একটা সৌন্দর্য ফুটে ওঠে। কাগুজে বৈচিত্র্যের কারণে জাপানের লিটল ম্যাগগুলো দেখতে যেমন চোখে আরাম লাগে তেমনি সংরক্ষণ করতেও ভাল লাগে।
বাংলাদেশের প্রতিটি শহরের আনাচে কানাচে লিটল ম্যাগ বা ছোটকাগজ প্রকাশিত হয়ে থাকে। লেখায় ও রেখায় অবশ্যই সমৃদ্ধ তা বলার অপেক্ষা রাখে না। স্বাধীনভাবে নিজস্ব মত প্রকাশ এবং হাত মকশো করার জন্য লিটল ম্যাগ নিরাপদ মাধ্যম। অবশ্য বিপদের আশঙ্কা যে একেবারে নেই তা নয়, তা নির্ভর করে সময় ও পরিস্থিতির ওপর। কলকাতা তথা পশ্চিমবঙ্গে প্রচুর লিটল ম্যাগ প্রকাশিত হয়। লিটল ম্যাগ পুরস্কারও প্রদান করা হয় সরকারীভাবে। ২০০৭ সালে নন্দন চত্বরে জাতীয় লিটল ম্যাগ মেলা দেখে বিস্মিত হয়েছি প্রাচুর্যতার কারণে! ওখানে বহু লিটল ম্যাগ এখনও সিল্ক স্ক্রিন প্রিন্ট পদ্ধতিতে ছাপা হয় তাই উৎকট একটা গন্ধ থাকে যেটা ভাল লাগে না। তবে লেখাগুলো ভাবনার উদ্রেক করে। অনেক লিটল ম্যাগ আমি একাধিকবার কিনে নিয়ে গিয়েছি জাপানে দুই বাংলা থেকে। বন্ধুদের বিলিয়ে দিয়েছি।
পাক আমল এবং স্বাধীনতার পর ঢাকাতেও লিটল ম্যাগ আন্দোলন হয়েছিল, বিস্তর খ্যাত-অখ্যাত লিটল ম্যাগ বা ছোটকাগজ প্রকাশিত হয়েছে যেমন মীজানুর রহমানের ত্রৈমাসিক পত্রিকা, সমকাল, স্যাড জেনারেশন, স্বাক্ষর, কণ্ঠস্বর, সাম্প্রতিক, উত্তরণ, সুন্দরম, না, পূর্বমেঘ, দ্রষ্টব্য, বিপ্রতীক, নিসর্গ, একবিংশ, চালচিত্র, কিছুদিন রৌত্রের মুখোমুখি, রূপম, শিল্পতরু, স্বকাল, চর্যাপদ, সুতরাং, অক্ষর, অরিত্র, অর্কেস্ট্রা, আজকের কবিতা আড্ডা, আশির দশক, ঈষিকা, উলুখাগড়া, উল্লেখ, উন্মেষ, ঊষালোক, উটপাখি, ঋগ্বেদ, এবংবিধ, এ্যান্টিক্লক, এষণা, ওঙ্কার, কর্ষণ, কহন, সুবিল, কাশপাতা, কালধারা, ক্রম, দাহপত্র, লেখাবিল, ক্রান্তিক, কবিকণ্ঠ, ক্যাথরসিস, কিউপিড, থার্ডম্যাগ, দোআঁশ, নদী, কোরাস, কারুজ, দ্যুতি, খেয়া, গন্ধম, ঘাস, ঘুড্ডি, চিহ্ন, জীবনানন্দ, সূর্যঘুড়ি, নান্দীপাঠ, শব্দপাঠ, প্রাকৃত, পুন্ড্র, উল্লেখ, পথরেখা, প্রমা, পরাবাস্তব, প্রাতিস্বিক, পুষ্পকরথ, ব্যস, ব্রাত্য, ব্যতিক্রম, মধ্যাহ্ন, লোকায়ত, লাস্টবেঞ্চ, শুদ্ধস্বর, শিরদাঁড়া, সুনৃত, জংসন, মঙ্গলসন্ধ্যা, সমুজ্জ্বল সুবাতাস, শব্দশিল্প, শতদ্র, পূর্ণদৈর্ঘ্য, অলক্ত, ১৪০০, দ্বিতীয় চিন্তা, কবিতাপত্র, দুয়েন্দে, তারুণ্য, কিছুধ্বনি, প্রচ্ছদ, প্রাক্সিস জার্নাল, গান্ডিব, সিম্ফনী, নতুন কবিতা, ঢেউ, সূচীপত্র, চারিত্র, প্রতিশিল্প, ছোটকাগজ, বৈঠা প্রভৃতি। গুণেমানে সমৃদ্ধ ম্যাগাজিনের জন্য বিখ্যাত প্রকাশনা সংস্থা মুক্তধারার কর্ণধার চিত্তরঞ্জন সাহা প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় পুরস্কার ঘোষণা করে উৎসাহ দিয়েছেন। ‘ছোটকাগজ’ থেকে প্রথম কবিদের স্বকণ্ঠে আবৃত্তিকৃত কবিতার ক্যাসেটও প্রকাশিত হয়েছিল যা নতুন একটি উদ্যোগ বলা যায়।
একসময় চট্টগ্রামকে বলা হতো লিটল ম্যাগের রাজধানী। বহু ম্যাগাজিন রূপেবৈচিত্র্যে ও মনআনচান করা লেখায় প্রকাশিত হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে দেখেছি। স্বাধীনতার পরপর ‘স্পার্ক জেনারেশন’ সাহিত্য আন্দোলন ব্যাপক আলোড়ন তুলেছিল। নেতৃত্বে ছিলেন কবি কমল সেনগুপ্ত, স্বপন দত্ত, শিশির দত্ত প্রমুখ। কালপুরুষ, এইদিন সেইদিন, রক্তিম ফাগুন, প্রতিরোধ, শিরোনাম, যতদিন পৃথিবীতে, পদক্ষেপ, ধ্রুবপদ, ক্রান্তিক, ষড়ঋতু, অন্যব্রত, অন্যস্বর, দাঁড়কাক, বোধ, অথৈ, প্রমুক্ত বালার্ক, অক্ষোহিনী, অচিন পাখি, রানার, ধ্রুপদ, চর্যা, কালধারা, দ্রৌপদী প্রভৃতি লিটল ম্যাগ প্রকাশিত হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের তরুণ চিত্রশিল্পীরা নতুন একটি মাত্রা এনেছিলেন বেশকিছু ছোটকাগজের প্রচ্ছদে হাতেলেখা নামের অলঙ্করণে। ইলাস্ট্রেশন ছিল আকর্ষণীয়। সেই ছোটকাগজ সংস্কৃতির যৌবন এখন ঝুলে গেছে, নিবু নিবু, ম্রিয়মাণ। সংরক্ষণের অভাবে সেগুলোর পাতাগুলো ঠোঙা বা চানাচুর আর বাদামের মোড়ক, কিংবা রেস্টুরেন্টের প্লেট ও হাত মোছার ন্যাপকিনস্বরূপ বিলুপ্ত হয়ে গেছে কবেই!
জাপানে যেভাবে মুদ্রিত বস্তু এবং প্রকাশনাগুলো সংরক্ষণ হয়ে থাকে সরকারী ও বেসরকারীভাবে তা কিন্তু বাংলাদেশ বা ভারতে হয় না। জাপানে ‘পোস্টার শিরিয়োওকান’ বা ‘পোস্টার জাদুঘর’ যেমন আছে তেমনি আছে প্রচারপত্র বা হ্যান্ডবিল সংরক্ষণ জাদুঘর পর্যন্ত। আবার সারাদেশে আছে অসংখ্য সাহিত্য জাদুঘর। খুবই আশ্চর্য হয়েছি যে, টোকিওর কুদানশিতা শহরে অবস্থিত একটি রাস্তার পাশে একটি স্মৃতিফলক দেখতে পেয়ে। ১৯৯২ সালে স্থাপিত ফলকটিতে জাপানের প্রথম যে লিটল ম্যাগ ‘গারাকুতা বুনকো’ প্রকাশ করেছিল সেই সাহিত্যগোষ্ঠী ‘কেন্ইউশা’র ইতিবৃত্তি লেখা আছে অর্থাৎ ‘কেন্ইউশা’ নামে আধুনিক জাপানের সূচনাকালের একটি সাহিত্যগোষ্ঠী এখানে অবস্থিত ছিল তার স্মারকচিহ্ন এটা। ফলে এ দেশের অগণিত কবি, সাহিত্যিক ও গবেষক কিংবা গুরুত্বপূর্ণ তথ্যাদি হারিয়ে যায় না যেটা হরহামেশা হারিয়ে যাচ্ছে উপমহাদেশে। কত কবি, লেখক ও সাহিত্যিক আর মূল্যবান রচনা, ইতিহাস, ঘটনা হারিয়ে গেছে, হারিয়ে যাচ্ছেও প্রতিদিন কে তার হদিশ রাখে? তবে আশার কথা যে কলকাতায় কবি সন্দীপ দত্ত এবং বাংলাদেশে সাজ্জাদ বিপ্লব লিটল ম্যাগ বা ছোটকাগজ সংগ্রহ করে চলেছেন এবং গড়ে তুলছেন সংগ্রহশালা। বগুড়া জেলায় সাজ্জাদ গড়ে তুলেছেন ‘পুন্ড্রনগর লিটল ম্যাগাজিন লাইব্রেরি’ নামে একটি জাদুঘর।
বেশ কয়েক বছর আগে কুমিল্লা শহরের জগতখ্যাত রামমালা গ্রন্থাগারে অসংখ্য লিটল ম্যাগ দেখেছিলাম এলোমেলোভাবে টেবিলের ওপর স্তূপ হয়ে আছে। পুরনো যেমন ছিল তেমনি আনকোড়া নতুন কাগজও ছিল। যেমন পূর্বাশা, অলক্ত, আমরা জ্যোৎস্নার প্রতিবেশী, সে আমি তুমি, অশ্রু হলো বারুদ, আপন, কমলাঙ্ক, জাগৃতি, রংধনুসহ অনেক ঋতুভিত্তিক কৃশকায় সাহিত্য সঙ্কলনও। এগুলোর কোন যতœ নেয়া হয় না বলেই প্রতীয়মান হয়েছিল। এখন কী অবস্থায় আছে কে জানে! নোনাও ধরে যেতে পারে। পুরো মহেশাঙ্গনটাই এখন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে যেটা আসলে এ রকম ছিল না কখনই। রামমালা গ্রন্থাগার এখন পরিত্যক্ত না প্রবেশ নিষিদ্ধ বোঝা মুশকিল। এর ভেতরে একটি লিটল ম্যাগ সাহিত্য জাদুঘর প্রতিষ্ঠা করা যেতেই পারে।
এটাও সত্য যে, বাঙালীর পাঠবিমুখতা ইতিহাসখ্যাত। আর এখন প্রযুক্তির চরম উৎকর্ষতার যুগে আবস্থা আরও তথৈবচ। লিটল ম্যাগ এখনও বের হচ্ছে ঠিকই আগের মতো অগণিত নয়, প্রচার সংখ্যাও যেমন অপ্রতুল তেমনি চলে বলেও মনে হয় না। আগ্রহটা তেমন আর নেই তরুণ প্রজন্মের সাহিত্যের জন্য। তারা যে কী পড়তে ভালবাসে বোঝা মুশকিল! লিটল ম্যাগ তথা ছোটকাগজের স্থান দখল করে চলেছে দ্রুতগতিতে ইন্টারনেট ওয়েবসাইট, অনলাইন ম্যাগাজিন, ব্লগ, ফেসবুক প্রভৃতি। সেগুলোতে যে মানসম্পন্ন লেখা প্রকাশিত হচ্ছে তা বলা যাবে না। বহু বছরের ঐতিহ্য কাগুজে ঘ্রাণ সেখানে যেমন নেই তেমনি অঙ্গসজ্জার বৈচিত্র্যও অনুপস্থিত। আধুনিক মননশীল বইয়ের দোকান উদ্বোধন হচ্ছে ঠিকই কিন্তু মননশীল পাঠক যেন ক্রমহ্রাসমান। আজকাল সেবা প্রকাশনীর মুখরোচক হাল্কা আনন্দের বই খোঁজে কিশোর-কিশোরীরা কিন্তু সেগুলো কী সাহিত্য? জানি না। আমরাও কৈশোরে অনেক রহস্য গল্প বা গোয়েন্দা সিরিজের বই দেদার গিলেছি যেমন দস্যু শশধর, দস্যু বাহরাম, দস্যু মোহন, দস্যু বনহুর; দীনেন্দ্রকুমার রায়ের রহস্য গল্প, অদ্রীশ বর্ধন কিংবা ডাঃ নীহাররঞ্জন গুপ্তের রহস্যপোন্যাস অথবা ভৌতিক ও ডাকাতির গল্প কম পড়িনি। সেবা প্রকাশনীর কুয়াশা সিরিজও অনেক পড়েছি। কিন্তু পাশাপাশি রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, বঙ্কিম, দ্বীজেন্দ্রলাল, শরৎ, ফাল্গুনী, বনফুল, তারাশঙ্কর, প্রভাত কুমার, জরাসন্ধ, দৃষ্টিপাত, যাযাবর, ইকবাল, কায়কোবাদ, ফররুখ, গোলাম মোস্তফা, মীর মোশারফ, বন্দে আলী, জসীমউদ্দিন প্রমুখের লেখাও পড়েছি। এগুলো এখন যদিওবা ক্লাসিক। এখনকার ছেলেমেয়েরা নামও জানে না। গ্রন্থাগার নেই দেশের অধিকাংশ বিদ্যালয়ে, থাকলেও প্রবেশ করতে দেয়া হয় না ছাত্রছাত্রীদের। মাদ্রাসার কথা আর বলে লাভ নেই। এক সময়কার অনুপম সংস্কৃতি দেয়ালপত্রিকা বা দেয়ালিকা কিংবা স্কুল ম্যাগাজিন এখন বিলুপ্ত। কিন্তু জাপানে দেখেছি দেয়াল পত্রিকা আজও গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশিত হচ্ছে।
পাঠবিমুখতা, সাহিত্যের প্রতি অনুৎসাহ এবং লেখালেখি চর্চার প্রতি অবজ্ঞার ধারা চলতে থাকলে অদূর ভবিষ্যতে লিটল ম্যাগ কালচার লুপ্ত হয়ে যাবে তাতে কোন সন্দেহ আছে কী?
প্রথম প্রকাশিত : ১৪ অক্টোবর ২০১৬
Source: http://www.dailyjanakantha.com
Sunday, February 10, 2019
প্রাচীন পুঁথি: উৎসমুখের খোঁজে
- তৌফিকুল ইসলাম চৌধুরী
পুঁথি-সাহিত্য আমাদের ঐতিহ্যের অংশ। এমন এক সময় ছিল যখন ঘরে ঘরে ছিল পুঁথি। দিনের আলো নিভে গেলেই কুপি জ্বালিয়ে শুরু হত পুঁথি-পাঠ। পুঁথি-পাঠককে ঘিরে সকলেই জড়ো হতেন এবং মনোযোগ সহকারে শুনতেন। প্রাচীনকালে মূলত প্রান্তিক শ্রেণীর মানুষেরাই ছিল পুঁথি অনুরাগী। তাদের লেখাপড়া বা ভাবনা-চিন্তার পরিধি আটপৌরে হলেও অন্যরা যে একে অবহেলা করতো, তা কিন্তু নয়। সেকালে পুঁথি ছিল সার্বজনীন। শিশু-কিশোর-বয়স্ক নির্বিশেষে সকলের কাছেই পুঁথি-সাহিত্যের অনুপম কাহিনী-আখ্যানগুলো ছিল অমৃততুল্য। আধুনিক যন্ত্র-সভ্যতার দাপুটে বাস্তবতায় প্রাচীন পুঁথিকাব্য, পুঁথি-কাহিনী বিস্মৃত ও বিলুপ্ত প্রায় হলেও আজো মানুষ ফিরে যেতে চায় স্বপ্ন, কল্পনা ও বাস্তবতার মিশেলের সেই বিমূর্ত নান্দনিক স্টেশনে, যেখানে পুঁথি সাহিত্যের মিথ কল্পকথা, লোক কাহিনী, লোকাচার, ধর্মকথা, রাজবন্দনা, হাসিকান্না, যাপিত জীবনের নানা অনুষঙ্গের রূপচ্ছটায় বিরাজ করে অলৌকিক আনন্দ ভুবন।
প্রাচীনকালে যখন ছাপাখানা ছিল না তখনো প্রচলন ছিল পুঁথির। এ উপমহাদেশে ত্রয়োদশ শতকের পূর্বে কাগজ ব্যবহারের কোন প্রমাণ পাওয়া যায় না। (ওহফরধহ চধষবড়মৎধঢ়যু- ইঁযষবৎ, ১৯৬২, চধমব-১৪৫) । আর ১৭৭৮ সালের পূর্বে বাংলাভাষার কোন ছাপাখানাও এ তল্লাটে ছিল না। ১৭৭৮ সালে হুগলিতে প্রথম বাংলা ছাপাখানা স্থাপিত হয়। তবে এতদঞ্চলে এয়োদশ শতকের পূর্বে কাগজ ব্যবহারের নমুনা বা ১৭৭৮ সালের পূর্বে ছাপানো পা-ুলিপি আবিষ্কৃত না হলেও অন্যান্য উপাদানে যে লিখন পদ্ধতি প্রচলিত ছিল, তার যথেষ্ট প্রমাণ রয়েছে। প্রাচীন হস্তলিখিত পুঁথিগুলো সাধারণত ভূর্জছাল, কাপড়ের পট, তালপাতায় লেখা হত। তালপাতার পুঁথিগুলোর বেশীর ভাগই ছিল পুজোর পুঁথি। মাদুলির মন্ত্রগুলো লেখা হতো ভূর্জছালে। মুসলমানদের ধর্মীয় ঐতিহ্য ভিত্তিক বিভিন্ন পুঁথিও লিখিত হতো তালপাতায়। তেরেট নামে তাল জাতীয় এক প্রকার বৃক্ষের পাতায়ও তখন পুঁথি লেখা হতো। ‘কবি মুকুন্দ রামের বাসভূমি দামুন্যায় তেরেট পাতায় লেখা ‘চ-ী-মঙ্গলের’ একটি পুঁথি সংরক্ষিত আছে’। (বাঙ্গালা সাহিত্যের ইতিহাস- প্রথম খ--সুকুমার সেন। চতুর্থ সংস্করণ-১৯৬৩। কোলকাতা। পৃঃ ৫১৪)। তবে ‘হরিতালী কাগজ’ নামে পরিচিত তুলট কাগজে লেখা পুঁথি তখন ব্যাপক সমাদৃত ছিল। কাব্য-সাহিত্য-ধর্মী পুঁথিগুলো এ ধরনের তুলট কাগজে লেখা হতো। এ কাগজ যত মজবুত হতো, লেখাও তত সুন্দর দেখাত। ছাপাখানার ব্যাপক প্রসারের ফলে ঊনবিংশ শতকে পুঁথি-সাহিত্যের নব উন্মেষ ঘটে। এ সময় থেকে হস্তলিখিত পা-ুলিপি বা পুঁথির ব্যবহার ক্রমে লোপ পেতে থাকে এবং এর জায়গা দখল করে নেয় মুদ্রিত পুঁথি। এসময় কোলকাতার শোভাবাজার কেন্দ্রিক বিশেষ ধরনের পুঁথি বা বটতলার পুঁথির প্রচলনের ফলে ‘পুঁথি’ শব্দটি বিভ্রান্তির শিকার হয়।
পুঁথি সাধারণত দু’ধরনের-১) কবির হস্তলিখিত মূল রচনা (ঙৎরমরহধষ গধহঁংপৎরঢ়ঃ) ও ২) লিপিকারের অনুলিপি (ঈড়ঢ়রবফ গধহঁংপৎরঢ়ঃ) । প্রথম ধরনের পুঁথি এখন আর পাওয়া যায় না। লিপিকারের অনুলিপি নিয়েই আমাদের পুঁথির জগৎ- যা থেকে বটতলার পুঁথি বা ছাপানো পুঁথির উদ্ভব। পুঁথির বিষয়বস্তু নানা ধরনের হতে পারে-যেমন কাব্যসাহিত্য, চরিতকাব্য, মহাকাব্য, মঙ্গলকাব্য, অনুবাদ সাহিত্য, ধর্মকথা, জঙ্গনামা, নবী কাহিনী, দেব-দেবী-পীর আউলিয়া বন্দনা, তন্ত্রমন্ত্র, পূজাবিধি, রাজবন্দনা, পাঁচালি, পদাবলী ইত্যাদি।
বলা হয়ে থাকে, ‘পুঁথি’ শব্দটি এসেছে সংস্কৃত ‘পুস্তক’ থেকে। তবে প্রাকৃত ‘পুত্থিয়া’, হিন্দি ‘পোথী’, অসমীয়া ‘পুথী’, ফরাসী ‘পুস্তিন’ও যে বাংলা ‘পুঁথি’ বা ‘পুঁথি’ শব্দের প্রচলনে অনুঘটকের ভূমিকা পালন করেনি তা বলা যাবে না। প্রাচীন হস্তলিখিত পুঁথি যদিও লিখিত সাহিত্য, তথাপি এর প্রস্তুতিকর্মের প্রতিটি পর্যায়ে লোকায়ত উদ্যোগ দৃষ্টিগ্রাহ্য হতো। পুঁথির ভেতরের প্রতিটি পাতা চারদিকে মার্জিন রেখে সাজানো হতো, যাতে পৃষ্ঠা ওল্টানো মাত্রই লেখাগুলো দৃশ্যমান হয়। পাতায় কোন লাইন না টেনে সমান্তরালভাবে প্রতি পাতায় সম-সংখ্যক ছত্র সন্নিবেশ করে নিপুণ পটুয়ার মতো পুঁথি যেভাবে লিপিবদ্ধ হতো, তা আজো আমাদের বিস্ময়ে হতবাক করে। প্রাচীন পুঁথিতে উভয় পৃষ্ঠায় লেখার রেওয়াজ ছিল। তবে কাগজ খুব পাতলা হলে উভয় পৃষ্ঠায় না লিখে কাগজ দুভাঁজ করে উভয় পাশে লিখা হতো। পুঁথির পত্রাঙ্ক প্রতি পৃষ্ঠায় না লিখে সাধারণত পাতার দ্বিতীয় পৃষ্ঠায় লেখা হত। আবার এমন পুঁথিও দেখা গেছে, যেগুলোতে লিপিকার পত্রাঙ্ক নির্দেশ করত না। পুঁথির দাঁড়ি, কমা, সেমিকোলন, অলঙ্করণ, ভুল-ত্রুটি সংশোধন ইত্যাদি ক্ষেত্রে নানা চিহ্নের প্রয়োগ হত। প্রাচীন পুঁথির পাতাগুলো ধারাবাহিকভাবে একের এক সাজানো, আলগা ও সেলাইবিহীন ছিল বিধায়, সেগুলোকে কাঠের পাটা দিয়ে শক্ত করে বাঁধা হত। এক্ষেত্রে শাল বা সেগুন কাঠের পাটা ব্যবহত হত। এছাড়া কোন কোন পুঁথির বহিরাবরণ হিসেবে চামড়ার খোলের ব্যবহারও চোখে পড়ত। এসব কাঠের পাটা বা চামড়ার আবরণে বাইরের দিকে পুঁথির বিষয়বস্তুর সাথে সম্পর্কিত নানা নকশা বা চিত্র খোদাই বা অঙ্কিত করা হতো। ভেতরের দিকে থাকতো নানা লতা-পাতার চিত্র। ধারণা করা হয়, সতের শতকের লোক-শিল্পের প্রভাব এসব চিত্রে পরিস্ফুট। (অ এবহবৎধষ এঁরফব ঃড় উধপপধ গঁংবঁস, উযধশধ, ১৯৬৪ চধমব-৪৮) ।
প্রাচীনকালে লিখিত বাংলা পুঁথিগুলোর বেশীর ভাগই ছিল বাংলা হরফে। তবে কিছু কিছু বাংলা পুঁথি আরবী হরফেও লিখিত পাওয়া গেছে। যতীন্দ্র মোহন ভট্টাচার্য সম্পাদিত ‘বাংলা পুঁথির তালিকা সমন্বয়’ গ্রন্থে এ ধরনের আরবী হরফে লিখিত বাংলা পুঁথির নমুনা খুঁজে পাওয়া যায়। (বাংলা পুঁথির তালিকা সমন্বয় (১ম খ-)-যতীন্দ্র মোহন ভট্টাচার্য। ১৯৭৮ইং। পৃষ্ঠা-৩৮১।) উড়িষ্যা রাজ প্রদর্শনশালা ‘ভুবনেশ্বরে’ ওড়িয়া অক্ষরে অনেক বাংলা পুঁথি সংরক্ষণ করা আছে (প্রাগুক্ত। পৃষ্ঠা-৩৮১)। আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদের সংগ্রহে বাংলা অক্ষরে একটি উর্দু পুঁথির নমুনা পাওয়া গেছে। (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পুঁথি-ক্রমিক-৫৮, পৃঃ ১৭৯, পত্র -৯১-১১৫)। কাইথি লিপিতে লেখা ক্ষেমানন্দের ‘মনসামঙ্গল’ এর দুটি কপি বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ পুঁথিশালায় সংগৃহীত আছে। আঠারো-উনিশ শতকে সিলেট অঞ্চলে ব্যাপকভাবে বিকশিত ‘নাগরী লিপিতে’ প্রচুর পুঁথি লিখিত হয়েছে। নাগরী লিপিতে পুঁথি লেখকদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছেন-শীতালং শাহ্, আরকুম শাহ্, শাহনুর শাহ্, ইরফান আলী, ভেলা শাহ্, মুহাম্মদ খলিল, আবদুল কাদির শাহ্, ওয়াহেদ আলী শাহ্, আছদ আলী, মুন্সী সাদেক আলী, মুন্সী আবদুল করিম, ছৈয়দুর রহমান, শাহ আরমান আলী, দীন ভবানন্দ প্রমুখ।
প্রাচীন ও মধ্যযুগের সঙ্গে আধুনিক যুগের সেতুবন্ধন হচ্ছে পুঁথি। একারণে সুদূর অতীত থেকেই পুঁথি সংগ্রহ ও সংরক্ষণের প্রচেষ্টা দৃষ্ট হয়। এদেশে ব্যক্তি উদ্যোগে প্রথম পুঁথি সংগ্রহে হাত দেন কয়েকজন বৃটিশ নাগরিক। তাদের মধ্যে বাংলা ব্যাকরণের আদি রচয়িতা নাথানিয়েল ব্রাসি হ্যালহেড (১৭৫১-১৮৩০) অন্যতম। তিনি ১৭৭২ থেকে ১৭৮৩ সালে বাংলাদেশে অবস্থানকালে ১২টি বাংলা পুঁথি সংগ্রহ করেন, যা পরে তিনি ব্রিটিশ মিউজিয়ামে অর্থের বিনিময়ে প্রদান করেন। এর মধ্যে রামায়ণ, মহাভারত, চ-ীমঙ্গল ও কালিকামঙ্গল উল্লেখযোগ্য। হ্যালহেডের ব্যাকরণের বাংলা হরফ নির্মাতা চার্লস উইলকিন্স ১৭৮৬ সালের দিকে ‘চ-ীমঙ্গল’ ও ‘বিদ্যাসুন্দর’ নামে দুটি পুঁথি সংগ্রহ করে ইন্ডিয়া অফিস লাইব্রেরীতে প্রদান করেন। বৃটিশ গভর্ণর জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংসের ঘনিষ্ঠ বন্ধু রিচার্ড জনসন ১৮০৭ সালে এদেশ থেকে সংগৃহীত ১৪টি বাংলা পুঁথি ইন্ডিয়া অফিস লাইব্রেরীতে প্রদান করেন। তার পুঁথিগুলোর মধ্যে রয়েছে কাশীরাম দাশের ‘মহাভারত’ লোচন দাশের ‘দুল্লভসার’ ‘চৈতন্যতত্ত্বসার’ ও ‘নামসংকীর্ত্তন’। ১৭৯৩ সালের নভেম্বর বঙ্গদেশে আসেন উইলিয়াম কেরী (১৭৬১-১৮৩৪)। তাঁর নেতৃত্বে ১৮১৮ সালে প্রতিষ্ঠিত শ্রীরামপুর কলেজ গ্রন্থাগার (কেরী লাইব্রেরী) এ খ্রীষ্টান মিশনারীগণ ৩ হাজারেরও বেশী বই ও হস্তলিখিত পুঁথি দান করেন। সুনীল কুমার চট্টোপাধ্যায় জানিয়েছেন, ১৯২১ সালে সংগৃহীত পুস্তক তালিকায় আমরা ৫১টি বাংলা পুঁথির নাম পাই। (বাংলার নব জাগরণে উইলিয়াম কেরী ও তার পরিজন-সুনীল কুমার চট্টোপাধ্যায়। ১৯৭৪ইং, পৃঃ ১৬৭)। সে সংগ্রহে ছিল ‘মনসার ভাসান’, ‘চ-ী’, ‘জৈমুনী ভারত’, ‘চৈতন্য মঙ্গল’, ‘চৈতন্য চরিতামৃত’ পুঁথি। এদেশে সরকারী প্রচেষ্টায় ১৯৬৮ সালে প্রথম পুঁথি সংগ্রহের উদ্যোগ নেয় এশিয়াটিক সোসাইটি। বৃটিশ গভর্ণর জেনারেল লর্ড লরেন্সের অনুদানকৃত ৩২০০/- টাকা দিয়ে শুরু করা এ কাজে প্রথম দায়িত্ব দেয়া হয় পুরাতত্ত্ববিদ রাজেন্দ্র লাল মিত্র ও পরে হরপ্রসাদ শাস্ত্রীকে। রাজেন্দ্র এ কাজে ততটা সফল না হলেও হরপ্রশাদ শাস্ত্রীর আন্তরিক প্রচেষ্টায় অনেক দুষ্প্রাপ্য বাংলা পুঁথি সংগৃহীত হয়। ১৯৪১ সালে প্রকাশিত এশিয়াটিক সোসাইটির ‘পুঁথি বিবরণী’তে এ ধরনের ৩৬৭টি পুঁথির বিবরণ লিপিবদ্ধ আছে। নগেন্দ্র নাথ বসু প্রায় ৩০০০ (তিন হাজার), সনৎকুমার বসু ২০০০ (দুই হাজার) এবং হরিদাস পালিত অনেক পুঁথি সংগ্রহ করে ‘কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুঁথিশালায় দান করলেও এসবের মধ্যে বাংলা পুঁথির সংখ্যা ছিল নিতান্ত নগণ্য। তবে মনীন্দ্র মোহন বসু সম্পাদিত ‘কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় সংগৃহীত পুঁথি তালিকায়’ (১ম ও ২য় খ-, ১৯৪১ ও ১৯৬৩) মোট ৫৯২৭টি বাংলা পুঁথির বিবরণ আছে। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘বিশ্বভারতী’ বিভিন্ন ভাষার পুঁথি সংগ্রহের কাজ করে। ১৯৪৭ সালের জুলাইয়ের এক হিসাবে দেখা যায়, এ সময় পর্যন্ত বিশ্বভারতীতে ১৪৩৯টি বাংলা পুঁথি ছিল্ চট্টগ্রামের আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদ আজীবন পুঁথি সংগ্রহ করেন। তিনি প্রায় সহস্রাধিক পুঁথি আবিষ্কার করেছেন এবং এসব পুঁথি অসাধারণ দক্ষতার সাথে সম্পাদনা করেছেন। তার আবিষ্কৃত পুঁথি নিয়ে তিনি প্রায় ৬ শতাধিক প্রবন্ধ লিখে প্রাচীন ও মধ্য যুগের বাংলা সাহিত্য বিষয়ে পাঠকদের অবহিত করেন। তার সংগৃহীত পুঁথির মধ্যে আছে আবদুন নবীর ‘আমীর হামজা’ (রচনা-১৮৫৯) শাহ মোহাম্মদ সগীরের ‘ইউসুফ জোলেখা’ (রচনা-১৭৩২), সৈয়দ সুলতানের ‘ওফাত-ই-রসুল’ (লিপিকাল-১৮৩৯), মোহাম্মদ খানের ‘কেয়ামত নামা’, শেখ ফয়জুল্লাহর ‘গোরক্ষবিজয়’ (১৭৭৭), আলী রেজা ওরফে কানু ফকিরের ‘জ্ঞান সাগর’, আলাওলের ‘পদ্মাবতী’ (লিপিকাল-১৮৭৮), মোহাম্মদ খানের ‘মুক্তল হোসেন’ (লিপি-১৭৭৪), মোহাম্মদ হানিফার লড়াই (১৭২৪), দৌলত উজির বাহরাম খানের ‘লায়লী মজনু’ (১৮২৯), দৌলত কাজীর ‘সতীময়না-লোর চন্দ্রানী’, (লিপি-১৭৫৪), ফকির গরীবুল্লাহর ‘সোনাভান’ ইত্যাদি। তার সংগৃহীত ৫৮৫টি মুসলিম বাংলা পুঁথি তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দান করেছেন। তার সংগৃহীত ৩৩৮টি পুঁথি রাজশাহী বরেন্দ্র রিসার্চ মিউজিয়ামে সংরক্ষিত আছে। মধ্যযুগের সাহিত্য গবেষক ড. এনামুল হক গবেষণার প্রয়োজনে কিছু পুঁথি সংগ্রহ করেন। তার সংগৃহীত ২৩টি বাংলা পুঁথি বরেন্দ্র রিসার্চ যাদুঘরে আছে। বরেন্দ্র অনুসন্ধান সমিতির প্রতিষ্ঠাতা শরৎ কুমার রায় সংগৃহীত ১১১০টি পুঁথিও এ মিউজিয়াম গ্রন্থাগারে রয়েছে। অধ্যাপক মনসুর উদ্দিনের সংগ্রহে কিছু পুঁথি ছিল।্ চট্টগ্রামে ইসহাক চৌধুরীর ব্যক্তিগত সংগ্রহেও অনেক পুঁথি রয়েছে। বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদেও অনেক পুঁথির সংগ্রহ আছে। ১৩৫৬ বঙ্গাব্দে প্রকাশিত ‘পরিষৎ পরিচয়’ গ্রন্থ থেকে জানা যায়, এ সময় পরিষদ পুঁথিশালায় সংরক্ষিত বাংলা পুঁথির সংখ্যা ছিল ৩২৪৬টি(পরিষৎ পরিচয়- ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়। ১৩৫৬। পৃঃ-৩০)। শ্রীহট্ট সাহিত্য পরিষদে ৪৭৯টি বাংলা পুঁথি সংগৃহীত ছিল বলে যতীন্দ্রমোহন ভট্টাচার্য প্রকাশিত একটি তালিকা থেকে জানা যায়। (বাংলা পুঁথির তালিকা সমন্বয় (১ম খ-)- অধ্যাপক যতীন্দ্র মোহন ভট্টাচার্য, এশিয়াটিক সোসাইটি, কোলকাতা, ১৯৭৮)। ১৯২৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘পুঁথি সংগ্রহ সমিতি’ গঠিত হলে ঢাকা যাদুুঘরের কিউরেটর নলিনীকান্ত ভট্টাশালীকে এর সম্পাদক নিয়োগ করা হয়। তার নেতৃত্বে প্রায় ১৭,০০০ বাংলা ও সংস্কৃত পুঁথি সংগৃহীত হয়। এর কিছু পুঁথি বাংলাদেশের জাতীয় যাদুঘরে সংরক্ষিত আছে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়েও অনেক পুঁথি সংরক্ষিত আছে। বাংলা একাডেমীও কিছু পুঁথি সংগ্রহ করেছে। ১৯৯৫ সালে প্রকাশিত তালিকা অনুযায়ী এ সংখ্যা ৩৪৪১টি।
প্রাচীন পুঁথি ভূর্জপত্র, তালপাতা, তেরেট পাতা, হরিতালী কাগজ ইত্যাদি ভঙ্গুর ও ক্ষণস্থায়ী উপাদানে লেখা হতো বলে স্যাঁতসেঁতে বিরুপ আবহাওয়ায় তা নষ্ট হয়ে যেত। তা সত্ত্বে প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়াই করে যে সব পুঁথি আজো টিকে আছে তা আমাদের বাংলা সাহিত্যের মহামূল্যবান সম্পদ। প্রাচীন পুঁথি তা খ-িত, পূর্ণাঙ্গ কিংবা একটি মাত্র পাতা- যাই হোক না কেন এর ঐতিহাসিক মূল্য কম নয়। এর উপর ভিত্তি করেই গড়ে উঠেছে আমাদের বাংলা সাহিত্যের গৌরবময় ঐতিহ্য। ‘চর্যাপদ’ ও ‘শ্রীকৃষ্ণ কীর্তন’ এর কথা আমরা কে না জানি! অথচ এ দুটি পুঁথিও খ-িত ও বিচ্ছিন্ন। আর এগুলো আবিষ্কারের পরই আমাদের নজরে আসে, প্রাচীন ও মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের অনেক অনাহরিত অধ্যয়। মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী ১৯১৬ সালে নেপালের রাজদরবার থেকে ৪৬টি চর্যাপদ তথা বৌদ্ধ গান ও দোহা উদ্ধার করেন, যা বাংলা সাহিত্যের আদি নিদর্শন হিসেবে সর্বজনস্বীকৃত। চর্যাপদের ভাষা দুর্বোধ্য হলেও এগুলো যে বাংলা গীতিকাব্য তথা বাংলা পুঁথির আদিরূপ- তাতে সন্দেহ নেই। শ্রীকৃষ্ণ কীর্তনের পুঁথি উদ্ধারের ফলে মধ্যযুগের কীর্তনধারার সুস্পষ্ট রূপ আমাদের সামনে উদ্ভাসিত হয়ে উঠে।’ শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’-এর একমাত্র পুঁথিটি কোলকাতার ‘বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ পুঁথিশালায়’ সংরক্ষিত আছে।
আনুমানিক পঞ্চদশ শতকে লিখিত এই পুঁথিটি বাংলা লিপির প্রাচীনতম নির্দশন। দৌলত কাজীর ‘সতী ময়না ও লোর চন্দ্রানী’, আলাওলের ‘পদ্মাবতী’ মধ্যযুগের কাব্য সাহিত্যের প্রতিনিধিত্বস্থানীয় ‘পুঁথি’। মুহাম্মদ আবদুল হাফিজ বলেন, ‘নর-নারীর প্রণয়কে উপলক্ষ করে মধ্যযুগে যে আখ্যায়িকা-কাব্য গড়ে উঠেছিল, তাকে ‘রোমান্স কাহিনী কাব্য’ নামে অভিহিত করা হয়েছে। ‘সতী ময়না ও লোর চন্দ্রানী’ এই ধারারই শ্রেষ্ঠ কাব্য’ (সতী ময়না ও লোর চন্দ্রানী-সম্পাদনায়-মযহারুল ইসলাম ও মুহাম্মদ আবদুল হাফিজ। নওরোজ কিতাবিস্থান, ঢাকা-১৯৭৩, পৃঃ-৩৬) আলাওলের ‘পদ্মাবতী’ সম্পর্কে ক্ষেত্রগুপ্ত বলেন, ‘পদ্মাবতী কাব্যকে মাঝে মাঝে মাধ্যযুগের বাংলা কাব্যের বাতায়ন নামে চিহ্নিত করার বাসনা জাগে, (প্রাচীন কাব্য সৌন্দর্য জিজ্ঞাসা ও নব মূল্যায়ন- ক্ষেত্র গুপ্ত।
পুস্তক বিপণি, কোলকাতা। পৃঃ-১৭৮)। এ ধরনের অসংখ্য পুঁথি আজো ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে এদেশের পথে-প্রান্তরে। অতীত বর্তমানের সেতু-বন্ধনের প্রয়োজনে, আমাদের সাহিত্য-সংস্কৃতির উৎসমুখের খোঁজে, আমাদের শিকড়ের সন্ধানে ধূলিমলিন আস্তরণ থেকে এসব খুঁজে বের করতে হবে। আমাদের ইতিহাস-ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা রক্ষার স্বার্থে এসব পুঁথির সংরক্ষণ, আরো পুঁথি সংগ্রহ এবং পুঁথির ব্যাপক চর্চা ও গবেষণা প্রয়োজন।
Source: http://www.dailyjanakantha.com
Wednesday, February 6, 2019
বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় মুসলিম অবদান
- মনসুর আহমদ
সৃষ্টি জগতের সমস্ত সৃষ্টির নিজ নিজ ভাষা আছে, কিন্তু সে সব ভাষায় নেই কোন পরিবর্তন বিবর্তন। কিন্তু আল্লাহ প্রদত্ত মানুষের ভাষায় রয়েছে বৈচিত্র্য ও পরিবর্তন বিবর্তনের গতি। মানুষের ভাষা আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুদরতের নিদর্শন। পবিত্র কুরআনে এরশাদ হচ্ছে, ‘‘তার নিদর্শনাবলীর অন্যতম নিদর্শন হল আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টি এবং তোমাদের ভাষা ও বর্ণ বৈচিত্র্য; নিশ্চয়ই এতে জ্ঞানীদের জন্য রয়েছে নিদর্শন।’’
পৃথিবীতে রয়েছে কয়েক হাজার ভাষা। সময়ের স্রোতে প্রতিটি ভাষা কম বেশি তার রূপ বদলায়। আমাদের মাতৃভাষা বাংলাও বিভিন্ন সময় তার রূপ পাল্টিয়েছে। প্রতিটি ভাষার রূপের কারিগর ঐ ভাষাভাষী মানুষ। আমাদের মাতৃভাষা বাংলার যে সুন্দর রূপ বর্তমানে আমরা দেখতে পাই তার পেছনে রয়েছে বাঙালীর বহু শতাব্দীর সাধনা।
ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর মতে বাংলা ভাষার উৎপত্তিকাল খ্রীস্টিয় সপ্তম শতাব্দী। অন্যূন হাজার বছরের পুরানো বাংলা ভাষা উৎপত্তির পর থেকে নানা পর্যায়ে পরিবর্তনের মাধ্যমে আধুনিক পর্যায়ে উপনীত হয়েছে। বাংলাদেশের অধিবাসীরা প্রথম থেকেই বাংলা ভাষায় কথা বলত না। বর্তমান বাংলা ভাষা প্রচলনের আগে গৌড় ও পুন্ড্রের লোকেরা অসুর ভাষাভাষী ছিল। এই অসুর ভাষাই ছিল আমাদের দেশের ভাষা। বাংলাদেশে আর্যদের আসার আগে এদেশবাসীরা যে ভাষা ব্যবহার করতেন, তার কোন নিদর্শন আজ পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।
ঐতিহাসিকরা মনে করেন, বাংলা ভাষার প্রাথমিক স্তর পঞ্চম থেকে দশম শতাব্দীর মাঝামাঝি সময় উদ্ভূত হয়েছিল। সেনরাজগণ বিদেশী ছিলেন বলে বাংলা সম্বন্ধে বিশেষ কৌতূহলী ছিলেন না। তাদের সভায় সংস্কৃতজ্ঞ ব্রাহ্মণ-পন্ডিতদের প্রাধান্য ছিল বেশি। বাংলাদেশে বাংলা ভাষা ও বাংলা সাহিত্যের উদ্ভব ও প্রসার লাভ ঘটেছে বৌদ্ধ আমলে; বিশেষ করে স্বাধীন পাল রাজাদের পৃষ্ঠপোষকতায়। পাল এবং সেন বংশীয় রাজাদের আমলে বাঙালি জনগণ ও তাদের ভাষাও অন্যতম মুখ্য বিশিষ্টতা প্রাপ্ত হয়। নতুন ভাষা বাঙলার রূপ গ্রহণের সাথে সাথে বাঙালির মানসিক সংস্কৃতি এই ভাষার মাধ্যমে আত্মপ্রকাশের কাজে লেগে গেল-আনুমানিক দশম শতক হতে প্রাচীন বাঙলায় রচিত বৌদ্ধ চর্য্যাপদকে অবলম্বন করে বাংলা ভাষার সাহিত্যিক ইতিহাস শুরু হয়।
বাংলা সাহিত্যের প্রথম মুসলমান কবি হিসেবে শাহ মুহম্মদ সগীর বিশেষ গৌরবের অধিকারী। তিনি গৌড়ের সুলতান গিয়াসউদ্দিন আজম শাহের রাজত্বকালে [ ১৩৯৩-১৪০৯ খ্রিঃ] ইউসুফ জোলেখা কাব্য রচনা করেন। এর পরে যাদের নাম করতে হয় তারা হলেন দৌলত উজির বাহরাম খান, মুহম্মদ কবির, সাবিরিদ খান ও দোনাগাজী চৌধুরীর।
মধ্যযুগে [১২০০-১৮০০ খ্রিস্টাব্দ] আরকান রাজ সভায় বাংলা সাহিত্যের চর্চা হয় এবং সেখানকার মুসলমান কবিগণ ধর্ম সংস্কার মুক্ত মানবীয় প্রণয়কাহিনী অবলম্বনে কাব্য রচনা করে এক নতুনতর বৈশিষ্ট্য দেখান। আরকানের বৌদ্ধ রাজাদের আনুকূল্যে বাংলা সাহিত্যের চর্চা করে যে সমস্ত মুসলিম কবি খ্যাতি অর্জন করেছেন, তাঁদের মধ্যে দৌলত কাজীর নাম সর্বাগ্রে স্মরণীয়। তাঁর রচিত কাব্যগ্রন্থের মধ্যে ‘সতী ময়না ও লোর চন্দ্রানী' নামে একটি মাত্র কাব্যের সন্ধান পাওয়া যায়।
আরকান রাজসভার বাংলা সাহিত্যের আর একজন নামকরা কবি মহাকবি আলাওল। কবি আলাওলের সাহিত্য সম্পদের প্রাচুর্য সহজেই চোখে পড়ার মত। ফারসী সাহিত্য ভান্ডার থেকে তিনি ‘সেকান্দার নামা', ‘সয়ফুল মুলক বদিউজ্জামাল', ‘হপ্ত পয়কর' প্রভৃতি কাব্য ও ধর্ম বিষয়ক ‘তোহফা' গ্রন্থটি অনুবাদ করেন। মহাকবি আলাওলের অমর কাব্য ‘পদ্মাতবি কাব্য। এছাড়াও সতের শতকের বিখ্যাত মুসলমান কবি হলেন, আবদুল হাকিম, নওয়াজিস খান, সৈয়দ মুহম্মদ আকবর প্রমুখ।
বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের যে রূপ নিয়ে আমরা গর্ব করি তা প্রকৃত প্রস্তাবে শুরু হয়েছিল বাংলাদেশে মুসলিম শাসনামল থেকে। গুপ্তদের শাসনামলে সংস্কৃত ভাষা ও সাহিত্যের যে চর্চা শুরু হয়, পাল ও সেন আমলে সে ধারা অব্যাহত থাকে। তবে বাংলা দেশের স্বাধীন শাসক পালদের আমলে দেশীয় ভাষা হিসাবে প্রথম বাংলার চর্চা শুরু হয়। বাংলা দেশে বাংলা ভাষা ও বাংলা সাহিত্যের উদ্ভব ও প্রসার ঘটেছে বৌদ্ধ আমলে; বিশেষ করে স্বাধীন পাল রাজাদের পৃষ্ঠপোষকতায়। হিন্দু সেন রাজাদের আমলে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য পৃষ্ঠপোষকতা থেকে বঞ্চিত হয়। সেন আমলে বাংলা ভাষার চর্চা না হলেও এ ভাষার নিজস্ব সত্তা একেবারে লোপ পায়নি। স্বাভাবিকভাবে মুসলমানদের আগমনের পর মুক্ত পরিবেশে সাধারণের মুখের ভাষা বাংলার ব্যাপক চর্চার সুযোগ ঘটে।
বাংলা ভাষা মুসলমান প্রভাবের পূর্বে অতীব অনাদর ও উপেক্ষায় আত্মপ্রকাশ করেছিল। ইতরের ভাষা বলে বাংলা ভাষা পন্ডিত সমাজে অপাংক্তেয় ও উপেক্ষার পাত্র ছিল। মুসলমান বিজয় বাংলা ভাষার জন্য শুভ দিন বয়ে আনল। বাংলা ভাষা-সাহিত্য তথা বাঙালীর জন্য ১২০৫ খ্রিষ্টাব্দ এক মহা ঐতিহাসিক ক্ষণ। তুর্কি মুসলিম সেনাপতি মুহম্মদ বখতিয়ার খিলজি বাংলা দেশে মুসলিম রাজত্ব কায়েমের ফলে বাংলাভাষা ও সাহিত্যের নবজন্ম ঘটে। মুসলমান শাসক হুসেন শাহ, গৌড়ের সামসুদ্দিন ইউসুফ শাহ এবং অপরাপর মুসলমান সম্রাটেরা বাংলা দেশে বাংলা ভাষাকে সুপ্রতিষ্ঠিত করে আমাদের সাহিত্যে এক নতুন যুগ সৃষ্টি করেছিলেন। এ সব ইতিহাস সামনে রেখে শ্রীদিনেশ চন্দ্র সেন মন্তব্য করেন, ‘‘মুসলমান সম্রাটগণ বর্তমান বঙ্গ-সাহিত্যের এইরূপ জন্মদাতা বলিলেও অত্যুক্তি হয় না।... বঙ্গ সাহিত্য মুসলমানদেরই সৃষ্ট, বঙ্গভাষা বাঙ্গালী মুসলমানের মাতৃভাষা।’’
বাংলা সাহিত্যে মুসলমান শাসকগণের উদার পৃষ্ঠপোষকতায় যে নবজীবনের সূচনা হয়েছিল সে সম্পর্কে ড. মুহম্মদ এনামুল হক মন্তব্য করেছেন, ‘বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের বিকাশে বাংলার মুসলমানদের যতখানি হাত রহিয়াছে হিন্দুদের ততখানি নহে। এদেশের হিন্দুগণ বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের জন্মদাতা বটে; কিন্তু তাহার আশৈশব লালন পালন ও রক্ষাকর্তা বাংলার মুসলমান । স্বীকার করি, মুসলমান না হইলে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য মনোরম বনফুলের ন্যায় পল্লীর কৃষককণ্ঠেই ফুটিয়া উঠিত ও বিলীন হইত, কিন্তু তাহা জগতকে মুগ্ধ করিবার জন্য উপবনের মুখ দেখিতে পাইত না বা ভদ্র সমাজে সমাদৃত হইত না।'
মধ্যযুগে মুসলিম সুলতান ও আমাত্যগণের অকৃপণ পৃষ্ঠপোষকতায় হিন্দু মুসলিম উভয় কবিদের মিলিত প্রচেষ্টায় সুসমৃদ্ধ সাহিত্য গড়ে ওঠে। মধ্যযুগে আরবী- ফারসি- তুর্কি- উর্দু শব্দের সংমিশ্রণে বাংলা যেমন সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে, বাঙালী মুসলিম হিন্দু নির্বিশেষে সে ভাষায় কাব্যচর্চা করে বাংলা সাহিত্য ভান্ডারকে পূর্ণ করে তোলেন।
মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে ধর্মীয় বিষয় বস্তু ব্যাপক ভাবে স্থান লাভ করেছিল। মর্সিয়া কাব্যের উপাদান বিবেচনা করলে এগুলোকেও ধর্মীয় সাহিত্য হিসেবে বিবেচনা করা যায়। মোগল আমলে বাংলায় মর্সিয়া সাহিত্য রচনা করেছিলেন তাদের মধ্যে উল্লেখ যোগ্য হলেনঃ দৌলত উজির বাহরাম খান, মুহম্মদ খান, হায়াৎ মামুদ, জাফর, হামিদ প্রমুখ। দৌলত উজির বাহরাম খান ‘জঙ্গনামা' কাব্য রচনা করেছিলেন। মুহম্মদ খান ‘মক্তুল হোসেন' কাব্য রচনা করে যথেষ্ট খ্যাতি লাভ করেছিলেন । ইসলামী বিষয় অবলম্বনে বাংলা সাহিত্য সৃষ্টির যে সব নিদর্শন মধ্য যুগে লক্ষ করা যায় তার মধ্যে সুফী সাহিত্য বিশিষ্ট স্থানের অধিকারী। বাংলা সুফী সাহিত্যের ধারায় সর্বাধিক উল্লেখ যোগ্য কবি সৈয়দ সুলতান।
১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধে বাংলার স্বাধীন সূর্য অস্তমিত হবার পর বাংলা সাহিত্যে আবার পালা বদল হল। পরিবর্তন ঘটল মুসলিম শাসনের। সনাতন শিক্ষা ব্যবস্থা ভেঙ্গে গড়ে উঠতে লাগল ইংরাজ সৃষ্ট নতুন ইঙ্গ- হিন্দু মার্কা শিক্ষা ব্যবস্থা। ফারসীর বদলে নতুন রাষ্ট্র ভাষা হল ইংরাজি। ইংরাজি ভাষা- সাহিত্যের প্রভাবে ইংরাজি পড়া বাঙালীর হাতে আধুনিক বাংলা সাহিত্যের গোড়া পত্তন হল।
ফোর্ড উইলিয়মের সংস্কৃতজ্ঞ পন্ডিতেরা বাংলাভাষায় পন্ডিতী রীতির জন্মদান করেন এবং বিদ্যাসাগর (১৮২০-১৮৯১) তার প্রাণ প্রতিষ্ঠা করেন। তাদের আমলে বাংলা ভাষা এক রকম বাঙালিত্ব বর্জন করে খাঁটি আর্য ভাষায় (সংস্কৃত) রূপান্তরিত হয়েছে। উল্লেখ করা যেতে পারে, আধুনিক বাংলার জনক নামে পরিচিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের ভাষা এত খাঁটি ছিল যে, তার ‘বেতাল পঞ্চবিংশতি' ও ‘সীতার বনবাস' গ্রন্থদ্বয়ের শব্দ সম্ভারের শতকরা ৯০ থেকে ৯৯ ভাগ পর্যন্ত সংস্কৃত হয়ে উঠেছিল। ফোর্ড উইলিয়ম কলেজকে কেন্দ্র করে যে বাংলা গদ্যের ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত হয় বাঙালী হিন্দু সমাজ ছিল তার প্রধান রূপকার। বাঙালী মুসলমানদের তরফ থেকে এই প্রয়াসের বিরুদ্ধে যে প্রতিবাদ জ্ঞাপন করা হয়েছিল, দুর্ভাগ্য ক্রমে তা বিশেষ আমলে আনা হয়নি।
ফোর্ট উইলিয়মের পন্ডিতেরা নির্মীয়মান বাংলা থেকে ইচ্ছাকৃত ভাবে আরবী-ফার্সী শব্দ বর্জন করে ছিলেন। তারা বাংলা ভাষার বিশুদ্ধতা রক্ষার জন্য এই শব্দ বর্জনের পরামর্শ দিয়েছিলেন। হিন্দু পন্ডিতগণ এ আদেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করে ছিলেন কিন্তু মুসলমান কবিরা আরবী-ফার্সী শব্দাবলীকে বাংলা ভাষার নিজস্ব সম্পদ মনে করে তা বর্জন করতে রাজী হননি।
ফোর্ট উইলিয়মের পন্ডিতগণ ও তার পরবর্তী হিন্দু সাহিত্যিকগণ যাই করুন না কেন, বাঙালী মুসলমান লেখকগণ কিন্তু এই অভিনব গদ্য-পদ্যের ধারাকে কোনদিনই মনে প্রাণে গ্রহণ করতে পারেনি। ফলে, তথাকথিত আধুনিক বাংলা সাহিত্যের ধারা থেকে তাঁরা বহু দিন ধরে দূরে অবস্থান করেছেন। উনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে মীর মোশাররফ হোসেন [১৮৪৭- ১৯১২] মুসলমানদের সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় বিশয় বস্তু নিয়ে সাহিত্য সৃষ্টি করেছেন। তার পরে কায়কোবাদ থেকে শুরু করে শেখ আবদুর রহীম, মুনশী রিয়াজুদ্দীন, মোজাম্মেল হক প্রমুখ সাহিত্যিকগণ ইসলামী সাহিত্যের ধারা সৃাষ্টি করলেন তাদের সাহিত্য কর্মে। এ সব মুসলিম সাহিত্যিক বিদ্যাসাগর, বঙ্কিম, ও মধুসূদনের অনুপ্রেরণায় পাশ্চাত্য প্রভাবান্বিত আধুনিক বাংলা গদ্য সাহিত্য সৃষ্টির পথ তৈরির প্রয়াস চালিয়েছেন। ।
প্রকৃত পক্ষে প্যারীচাঁদের ‘আলালের ঘরের দুলাল' রচনা কাল থেকে আধুনিক বাংলা গদ্য রীতির একটি শক্তিশালী ধারার উদ্ভব ঘটে। বঙ্কিমচন্দ্র (১৮৩৮-১৮৯৪) আলালের ঘরের দুলালের ভাষা- রীতির দ্বারা আকৃষ্ট হয়ে বাংলা গদ্য পুনঃনির্মাণের গরজ অনুভব করেছিলেন। বঙ্কিমচন্দ্রের সমসাময়িককালে মধুসূদনের অবির্ভাব। বিশাল প্রতিভার অধিকারী মধুসূদন বাংলায় প্রথম সার্থক মহাকাব্য, সনেট, গীতিকাব্য, নাটক ও প্রহসন রচনা করেন।
মধুসূদনের পরে বাংলা সাহিত্যে যে যুগান্তকারী প্রতিভার আবির্ভাব ঘটে তিনি হলেন রবীন্দ্র নাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১)। তিনি নানা বৈচিত্র্যে ও অভূতপূর্ব অবদানে বাংলা সাহিত্যকে এক নতুন দিগন্তে পৌঁছে দেন। রবীন্দ্রনাথের পরে বাংলা কাব্যের সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য কবি হলেন কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯-১৯৭৬)। রবীন্দ্রনাথের প্রভাব বলয় অতিক্রম করে তিনি বাংলা কাব্যে এক নতুন ধারার যুগান্তকারী বৈশিষ্ট্য নিয়ে আসেন। বাংলার যে একটি মুসলমানী রূপ আছে নজরুল ইসলাম তাঁর কাব্যে সেটা সার্থকভাবে তুলে ধরেছেন। নজরুল ইসলাম বাংলা কাব্যে যে তেজস্বিতা, প্রাণময় উদ্দীপনা ও নতুন বৈশিষ্ট্য নিয়ে এলেন, তাঁর সমকালে অনেক কবি তাতে অনুপ্রাণিত হয়ে বাংলা কাব্যকে নানা ভাবে সমৃদ্ধ করে তোলেন।
বাংলা গদ্যের সমৃদ্ধিতে মুসলিম সাহিত্যিকদের অবদান ঈর্ষণীয়। এদের মধ্যে যারা শীর্ষে ছিলেন তাঁরা হলেন নওশের আলী খান ইউসুফ জায়ী, আবদুল করীম সাহিত্যবিশারদ, মোহাম্মদ রওশন আলী চৌধুরী, সৈয়দ ইসমাইল হেসেন সিরাজী, বেগম রাকেয়া, কাজী ইমাদুলহক, লুৎফর রহমান এস. ওয়াজেদ আলী, শাহাদৎ হোসেন, ইবরাহিম খাঁ শেখ ফজলুল করিম, আবুল মনসুর আহমদ, কাজী আবদুল ওয়াদুদ, মোহাম্মাদ নজিবর রহমান, মোম্মদ বরকতুল্লাহ মোহাম্মাদ ওয়াজেদ আলী, শেখ হাবিবর রহমান, মোতাহের হোসেন চৌধুরী প্রমুখ।
এ ভাবে আমরা দেখতে পাই, মধ্যযুগের বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের উন্নতি ও শ্রীবৃদ্ধির মূলে রয়েছে মুসলমান আমীর-উমরাহ থেকে শুরু করে বিভিন্ন মুসলিম কবি সাহিত্যিক।
বাংলা ভাষার শ্রী বৃদ্ধির পরে আলোচনা করতে হয় বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় মুসলমানদের অবদান নিয়ে। ভারতে বৃটিশ রাজের শেষের দিকে গৃহীত লাহোর প্রস্তাব থেকে শুরু করে ১৯৪৭ সনে উপমহাদেশের মুসলমানদের জন্য স্বাধীন রাষ্ট্র পাকিস্তানের অভ্যূদয়ের প্রেক্ষাপটে বাংলা ভাষার মর্যদা প্রতিষ্ঠার জন্য এক নতুন আবহ সৃষ্টি হয়। ১৯৪০ সালের ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাব পাশের, তথা সাবেক পাকিস্তান আন্দোলনের সময় থেকে, ১৯৫২ সালের ঐতিহাসিক ভাষা আন্দেলনের সময় পর্যন্ত যদি ইতিহাস পর্যালোচনা করা যায়, তা হল বিভিন্ন মুসলিম ব্যক্তিদের ঐতিহাসিক ভূমিকার পরিচয় দীপ্ত হয়ে উঠবে।
মাতৃভাষা বাংলার সাথে উর্দুর একটি প্রতিযোগিতা গড়ে উঠেছিল দেশ বিভাগের বেশ আগ থেকেই। এক শ্রেণীর বাঙালী মুসলমানের মনে উর্দু প্রীতির উদ্ভব ঘটেছিল বিভিন্ন কারণে। যেমন, ‘‘যখন বাঙ্গলা সাহিত্য চর্চায় বাঙ্গলার মুসলমানগণের একটা ঘৃণা জন্মিয়া গেল, তখন তাহারা কোথাকার উর্দু ভাষাকে মাতৃভাষা বলিয়া বরণ করিয়া লইতে বৃথা চেষ্টা করিতে লাগিলেন।’’
দেশ বিভাগের অনেক আগে, ১৯৪২ সালেরও আগে, ‘পূর্ব পাকিতান কথাটি' একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ও প্রতীক হিসাবে চালু হয়ে গিয়েছিল এবং বুদ্ধিজীবীদের মনোরাজ্যেও ঠাঁই করে নিয়েছিল। বস্তুত এ কারণেই সাবেক পাকিস্তান প্রতিষ্ঠারও বহুকাল আগে ১৯৪২ সালেই কলকাতায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ‘পূর্ব পাকিস্তান রেনেসাঁ সোসাইটি এবং ঢাকায় ‘পূর্ব পাকিস্তান সাহিত্য সংসদ।' দেশ বিভাগ ও (সাবেক) পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হবার পর ‘পূর্ব পাকিস্তান'- এর রাষ্ট্র ভাষা কি হবে, এ নিয়ে রেনেসাঁ আন্দোলনের নায়করা চিন্তা ভাবনা করেছিলেন দেশ বিভাগের বহু আগে, ১৯৪২-৪৩ সালেই। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আগেই বাংলা ভাষাকে নতুন রাষ্ট্রের, রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দানের দাবি উঠে ছিল। বস্তুত সেকালেই ‘দৈনিক আজাদ', ‘মাসিক মোহাম্মদী' , ‘সওগাত' প্রভৃতি পত্রিকায় প্রবন্ধ ও অন্যান্য রচনার মাধ্যমে মুসলিম বুদ্ধিজীবীরা পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষা নিয়ে আন্দোলন শুরু করেন। ‘আজাদ'- এর প্রতিষ্ঠাতা মওলানা মোহাম্মাদ আকরাম খাঁ ছিলেন বাংলা ভাষার সুপন্ডিত শক্তিমান লেকক, মাতৃভাষার প্রতি গভীর অনুরাগী ও শ্রদ্ধাশীল। ‘বাংলা ভাষা বাঙালী মুসলমানের মাতৃভাষা কিনা' এই হটকারী ও বিভ্রান্তিমূলক প্রশ্নের উত্তরে ১৩২৫ সালেই মওলানা মোহাম্মদ আকরাম খাঁ বলেছিলেন, ‘দুনিয়ায় অনেক রকম অদ্ভুত প্রশ্ন আছে, বাঙালী মুসলমানের মাতৃ ভাষা কি? উর্দু না বাংলা? এই প্রশ্নটা তাহার মধ্যে সর্বাপেক্ষা অদ্ভূত। নারিকেল গাছে নারিকেল ফলিবে না বেল?... বঙ্গে মোছলেম ইতিহাসের সূচনা হইতে আজ পর্যন্ত বাংলা ভাষাই তাহাদের লেখ্য ও কথ্য মাতৃভাষা রূপে ব্যবহৃত হইয়া আসিয়াছে। এবং ভবিষ্যতেও মাতৃভাষা রূপে ব্যবহৃত হইবে।'
উর্দুকে মাতৃভাষা রূপে গ্রহণ করার মানসিকতা কিছু মুসলমানের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছিল এক বিশেষ প্রেক্ষাপটে। ইতিহাসের প্রেক্ষাপট বিশেষণ করলে দেখা যায় হিন্দু নেতারা বার বার মুসলমানদের ভাষা উর্দুকে দূরে ঠেলে দিয়ে হিন্দিকে সুপ্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা চালিয়েছে। ‘As early as 1867, Hindu leaders in Benares began a movement to replace Urdu- the chief language of the Muslims- by Hindi.’ ১৯১৮ সালে বিশ্ব ভারতীতে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ভারতবর্ষে বাংলার পরিবর্তে হিন্দীকে রাষ্ট্র ভাষা করার প্রস্তাব করেছিলেন। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ হিন্দির পরিবর্তে বাংলার পক্ষে যুক্তি-তর্ক উপস্থাপনা পেশ করেন এবং বলেন, ‘‘শুধু ভারত কেন, সমগ্র এশিয়া মহাদেশেই বাংলা ভাষার স্থান হবে সর্বোচ্চ। ভাব সম্পদ ও সাহিত্যের গুণে বংলাভাষা এশিয়ার ভাষা গোষ্ঠীর মধ্যে অদ্বিতীয়।’’ হিন্দুরা সেদিন এটি মেনে নিতে পারেনি। উর্দু-হিন্দি-বাংলা বিতর্কে কংগ্রেসের সব নেতাই হিন্দির পক্ষে রায় দেন। শুধু রায়ই নয়, সমগ্র ভারতকে এক রাষ্ট্রে পরিণত এবং এক জাতীয়তায় আবদ্ধ করার জন্য কংগ্রেসের সব নেতাই এক বাক্যে হিন্দির পক্ষে রায় দেন। এ ঘটনার প্রায় ৩০ বছর পরে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার প্রক্কালে ১৯৪৭ সালের জুলাই মাসে আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যানেন্সলর ড. জিয়াউদ্দীন আহমদ স্বাধীন ভারতে হিন্দিকে রাষ্ট্র ভাষা করার মোকাবিলায় পাকিস্তানে উর্দু কে রাষ্ট্র ভাষা করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। ইতিহাসের এই গতি ধারায় মুহম্মদ আলী জিন্নাহ পাকিস্তান সৃষ্টির পরে ১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ ঢাকায় গোটা পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষা হিসাবে উর্দু উপযুক্ত হবে বলে বিবেচনা করে ঘোষণা প্রদান করেন যে উর্দু হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষা। জিন্নাহর এই ঘোষণাকে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ মাতৃভাষা বাংলা ও সংস্কৃতির ওপর হামলা বিবেচনা করে সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়। এই ভাষা সংগ্রামে যারা নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তারা সবাই ছিলেন মুসলমান। ভাষা আন্দেলনের ইতিহাসে একজনও অমুসলমান ছাত্র- যুবকের নাম খোঁজ করে পাওয়া যায় না। ১৯৪৮ সালের রাজপথে শুরু হওয়া ভাষা আন্দোলন- যা' ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারিতে কতগুলো মুসলমান শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জন করে অমর মহিমা। ঢাকার রাজপথ কিছু মুসলিম তরুণ তাদের বুকের তাজা রক্ত ঢেলে বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করল।
বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্য '৫২-এর ভাষা আন্দোলন রাজনৈতিক নৈতিক আন্দোলনের রূপ ধারণ করে। '৪৮ পূর্ব আন্দোলন ছিল বুদ্ধি বৃত্তিক আন্দোলন। স্বাধীনতা পূর্বকালে ১৮৯৯ সালে বাংলা দেশের মুসলিম পুনর্জাগরণের অগ্রদূত সৈয়দ নওয়াব আলীর নেতৃত্বে ‘বঙ্গীয় সাহিত্য বিষয়ক মুসলিম সমিতি' গড়ে ওঠে এবং ১৯১১ সালে ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতি' যে উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে যাত্রা শুরু করেছিল সেই একই উদ্দেশ্যে স্বাধীনতা উত্তর কালে জন্মলাভ করে ‘তমদ্দুন মজলিস'। এই তমদ্দুন মজলিশ ই সর্ব প্রথম ভাষা আন্দোলনকে সাংগঠনিক রূপ দান করে। এ ভাবেই তুর্কী আগমনের পর থেকে শুরু করে বাংলা ভাষার উন্নতি ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে মুসলমানগণ সক্রিয় অংশ গ্রহণ করে '৫২ সালে শাহাদতের মধ্য দিয়ে বিশ্বের দরবারে মাতৃভাষাকে মর্যাদার আসনে স্থান দিতে সক্ষম হয়।
Source: www.dailysangram.com
প্রকাশিত: শুক্রবার ২২ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ | প্রিন্ট সংস্করণ
Thursday, January 10, 2019
চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষাতেই চর্যাপদ রচিত
চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষাতেই চর্যাপদ রচিত
- ড. মোহাম্মদ আমীন
বাংলা ভাষার উৎপত্তি সম্পর্কে নানা মুনির নানা মত রয়েছে। কারও মতে খ্রিস্টীয় নবম-দশক শতকে, কারও মতে, হাজার থেকে দ্বাদশ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে এবং কারও কারও মতে, সপ্তম থেকে অষ্টম খ্রিস্টাব্দের মধ্যে বাংলা ভাষার উৎপত্তি। ড. শহীদুল্লহর হিসাব অনুযায়ী ৬৫০ খ্রিস্টাব্দে বাংলা ভাষার আরম্ভকাল। বাংলা ভাষার উৎপত্তি যখনই হোক, চর্যাপদ যে, বাংলা সাহিত্যের আদি নিদর্শন সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই এবং এর বিপরীতে অন্য কোনো গ্রহণযোগ্য প্রমাণ না পাওয়া পর্যন্ত চর্যাপদকেই বাংলা সাহিত্যের আদি নিদর্শন গণ্য করতে হবে। তাই ‘চর্যাপদ’ অদ্যাবধি বাংলা ভাষার প্রাচীন নিদর্শনের আসনে অধিষ্ঠিত। এখন প্রশ্ন হলো, চর্যাপদ বাংলা ভাষার আদি নিদর্শন হলে নেপালে গেল কীভাবে? এর উৎস-ভাষা এবং লেখার স্থানই বা কোথায়?
বাংলাদেশে বৌদ্ধ ধর্মের আবির্ভাবের প্রারম্ভ হতে চট্টগ্রাম অঞ্চলে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের রাষ্ট্রীয়, সামাজিক ও শিক্ষাগত প্রাধান্য ছিল। চর্যাপদের ভাষা, শব্দগঠন, না-বোধক শব্দের অবস্থান, উৎপত্তিগত ইতিহাস, রচয়িতাদের ধর্ম, প্রাকৃতিক পরিবেশ, আধুনিক চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষা ও চাটগাঁইয়া ভাষার সাহিত্যকর্ম, আরকান রাজসভায় বাংলা সাহিত্যচর্চা প্রভৃতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, চট্টগ্রামে চর্যাপদ রচিত হয়েছে এবং চর্যাপদের রচয়িতাগণের অধিকাংশই ছিলেন চট্টগ্রামের অধিবাসী। অধিকন্তু তাঁরা যে দোহা বা চর্যাপদ নামের কাব্য সৃষ্টি করেছেন তা চট্টগ্রামের প্রাচীন আঞ্চলিক ভাষা অনুসরণে রচিত।
১৯০৭ খ্রিস্টাব্দে হরপ্রসাদ শাস্ত্রী নেপালের রাজকীয় গ্রন্থাগারে হাতে লেখা একটা পুঁথির সন্ধান পেয়েছিলেন। পুঁথিটির নাম ‘আশ্চর্য চর্যাচয়’ বা ‘চর্যাচর্য বিনিশ্চয়’। ‘চর্যাচর্য বিনিশ্চয়’ সাধারণ্যে ‘চর্যাপদ’ নামে পরিচিত। ‘চর্যাপদ’-এর কবিতাগুলো বৌদ্ধ বাউল বা বৌদ্ধ লোকধর্মের অনুসারী। রচয়িতাগণ চর্যাসমূহে বিভিন্ন উপমায় ধর্মীয় বিষয়াদি ব্যাখ্যা করেছেন। অধিকন্তু চর্যাপদে বাংলাদেশের নদ-নদী, পাহাড়, খাল, বিল আর সাধারণ মানুষের কথা, সমাজের সুখ-দুঃখ ও দারিদ্র্যের কথা বিশেষ ভঙ্গিমায় ফুটিয়ে তোলার প্রয়াস লক্ষণীয়। সবচেয়ে বড়ো কথা হচ্ছে, চর্যাপদের ভাষা আধুনিক বাংলা ভাষার চেয়ে, চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষার সঙ্গে সমধিক সাযুয্যপূর্ণ।
চট্টগ্রামের বৌদ্ধ ইতিহাস সুপ্রাচীন। সুস্পা কাহ্নপো রচিত ‘পাগসাম-জোন-জন’ ও লামা তারানাথ লিখিত ‘কাবাভদুন দন’ নামের তিববতীয় গ্রন্থে চট্টগ্রামে বৌদ্ধ প্রাধান্য ও তাদের ধর্মমুখী সাহিত্যচর্চার কথা উল্লেখ আছে। ওই গ্রন্থদ্বয় থেকে জানা যায়, চট্টগ্রামের প্রাচীন নাম ‘জালনধারা, যার অপভ্রংশ ‘জলন্দর’, কোথাও কোথাও জুলধা। এই জুলধার কেন্দ্র ছিল বর্তমান কর্ণফুলী নদীর তীরে অবস্থিত কর্ণফুলী উপজেলায়। ওই উপজেলায় এখনও জুলধা নামের একটি গ্রাম রয়েছে। সিন্ধু দেশীয় বৌদ্ধ সিন্ধু বালপাদ চট্টগ্রাম অঞ্চলে কয়েক বছর সাহিত্য সাধনা করেছিলেন বলে জালন্ধরী পাদ বা জুলধা পাদ নামে খ্যাত হয়েছিলেন। তার অপর নাম হাড়িফা। তিনি ঝাড়ুদার হাঁড়ির কাজ করেছিলেন বলে এই নামেও পরিচিত ছিলেন। প্রাচীনকাল হতে সমুদ্রপথে নিরাপদ যাতায়াতোপযোগিতার কারণে ভারতীয় উপমহাদেশ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থল ছিল চট্টগ্রাম। তিনি চট্টগ্রামে এসে বর্তমান চরপাথরঘাটা এলাকায় উঠেছিলেন। জলে যাতায়াত প্রাধান্যের কারণে চট্টগ্রাম জলন্দর নামে অভিহিত হতো। তখনকার চট্টগ্রাম বর্তমান বাংলাদেশের অংশ ছিল না। তখন চট্টগ্রাম ছিল আরকানের অধীন, যে আরকানে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় প্রাচীনকাল হতে বাংলা সাহিত্যচর্চা চলত। নবম শতকের শেষদিকে চট্টগ্রাম পাট্টিকারার চন্দ্রবংশের রাজাদের শাসনাধীনে ছিল এবং পাট্টিকারার চন্দ্র রাজবংশের সাথে আরাকানের চন্দ্রবংশের রাজাদের জ্ঞাতিসম্পর্ক ছিল। অধিকন্তু নেপালের রাজাদের সঙ্গেও ধর্মীয় কারণে সুসম্পর্ক ছিল।
খিস্ট্রীয় আনুমানিক অষ্টম শতকে পূর্ববঙ্গের চট্টগ্রামে পন্ডিতবিহার বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হয়েছিল। পন্ডিতবিহার বিশ্ববিদ্যালয় ছিল উপমহাদেশের একটি প্রাচীন বিশ্ববিদ্যালয়। এই বিশ্ববিদ্যালয় ছিল নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এটি পূর্ববঙ্গে তান্ত্রিক বৌদ্ধধর্ম বিষয়ের শিক্ষা ও মতবাদ প্রচারের কেন্দ্র হিসেবে পরিচালিত হতো। ত্রয়োদশ শতকে এক সংঘাতে বিহারের নালন্দা বিহার ধ্বংস হয়ে গেলে পূর্ব দেশীয় বৌদ্ধ পন্ডিতবর্গের অনেকে পন্ডিতবিহার বিশ্ববিদ্যালয়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন। পাল সাম্রাজ্যের বৌদ্ধ ভিক্ষু এবং বৌদ্ধ ধর্ম প্রচারক অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান পন্ডিতবিহারে কিছুকাল অবস্থান করেছিলেন।
এখন দেখা যাক, চর্যাপদ কী? তিববত বিশেষজ্ঞ হিসেবে খ্যাত পন্ডিত শরচ্চন্দ্র দাস, লামা তারানাথের তিববতী গ্রন্থ থেকে পন্ডিতবিহার সম্পর্কে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ করেছিলেন। তিনি গ্রন্থ দুটি পর্যালোচনা করে বলেছেন, পূর্ববঙ্গে তথা চট্টগ্রামে মহাযান বা তান্ত্রিক বৌদ্ধ ধর্মবিষয়ক শিক্ষা ও ধর্মপ্রচারের প্রধান কেন্দ্র ছিল চট্টগ্রাম। মূলত এই কাজ পরিকল্পিতভাবে সুসম্পাদনের জন্য পন্ডিতবিহার বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। পন্ডিতবিহার বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকগণ অধ্যাপনা, অধ্যয়ন ও যোগ সাধনার পাশাপাশি অবসর সময়ে যে সব গান-দোঁহা রচনা করেছিলেন তাই পরবর্তীকালে চর্যাপদ নামে বাংলা ভাষা ও বাংলা কাব্যের আদি নিদর্শন হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে। পন্ডিতবিহারের পূর্বে এবং পরবর্তীকালে আঠারো শতকের মধ্যকাল পর্যন্ত অন্য কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নাম ইতিহাসে পাওয়া যায় না। অতএব এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই যে, চর্যাপদ চট্টগ্রামে অবস্থিত পন্ডিতবিহার বিশ্ববিদ্যালয়ে রচিত হয়েছিল। পন্ডিতবিহারের অবস্থান সম্পর্কে বিভিন্ন মত প্রচলিত রয়েছে। প্রাপ্ত কিছু স্মারক নিদর্শন অনুযায়ী তিব্বত ও বৌদ্ধ সংস্কৃতি বিশেষজ্ঞ শরচ্চন্দ্র দাসসহ আরও কিছু ইতিহাসবেত্তা ও গবেষকের মতে, অনুমান অষ্টম শতকে চট্টগ্রাম মহানগরের বর্তমান জেনারেল হাসপাতাল সংলগ্ন পাহাড়ে পন্ডিতবিহার বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান ছিল। কারও মতে সীতাকুন্ড উপজেলার চন্দ্রনাথ পাহাড়ে আবার কেউ কেউ মনে করেন, চট্টগ্রাম জেলার পটিয়া উপজেলার চক্রশালায় অথবা আনোয়ারা উপজেলার দেয়াঙ পাহাড়ের দক্ষিণাংশে ঝিওরী ও হাজিগাঁও গ্রামে পন্ডিতবিহার বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান ছিল। তবে অধিকাংশ যুক্তি-মত, প্রাপ্ত প্রমাণ এবং তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে দেয়াঙ পাহাড়ে বিশ্ববিদ্যালয়টির অবস্থান ছিল বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। উল্লেখ্য, ১৯২৭ খ্রিস্টাব্দের ফেব্রæয়ারি মাসে আনোয়ারা উপজেলার দেয়াঙ পাহাড়ের নিকটবর্তী ঝিওরী ও হাজিগাঁও গ্রামের সীমান্তে পিতলের ৬৬টি বুদ্ধমূর্তি পাওয়া যায় যা এই স্থানে পন্ডিতবিহার বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান নিশ্চিত করে। যেখানেই হোক না কেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান যে চট্টগ্রামে ছিল সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। বিশেষজ্ঞগণের অভিমত, চট্টগ্রামে অবস্থিত পন্ডিতবিহার বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা সাহিত্যের আদি নিদর্শন চর্যাপদসমূহ রচিত হয়েছিল।
আরাকানের প্রাচীন ইতিহাসসূত্রে জানা যায়, চক্রশালা ছিল আরাকান রাজ্যের আঞ্চলিক সদর দপ্তর। আনোয়ারার দেয়াঙ পাহাড়ে পন্ডিতবিহার বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পূর্বে অনুমান ২০০ খ্রিস্টাব্দের দিকে চট্টগ্রামের চক্রশালায় বৌদ্ধ বিহার প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। এটি ছিল বঙ্গদেশের প্রাচীনতম বিহার। তবে এটি বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের ছিল না। গৌতমবুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত চক্রশালায় বুদ্ধের জীবিতাবস্থায় একটি বৌদ্ধচক্র নির্মিত হয়েছিল। এই চক্রকে ঘিরে বৌদ্ধ বিহারটি নির্মিত হয়। বৌদ্ধধর্মের প্রচার, ধর্মীয় শিক্ষা প্রদান এবং অনুসারী সাধারণ লোকদের ধর্মীয় বিধিবিধান সম্পর্কে অবহিত করার জন্য বিহারটি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। এ বিহারের অন্য একটি উদ্দেশ্য ছিল, আঞ্চলিক ভাষার মাধ্যমে সাধারণ লোকদের সচেতন করা। সংস্কৃতভাষী ব্রাহ্মণদের দৌরাত্ম্য হতে মানুষের মুখের ভাষাকে রক্ষার জন্য গৌতম বুদ্ধই আঞ্চলিক ভাষায় ত্রিপিটক রচনা করে বিশে^ মাতৃভাষা আন্দোলনের সূচনা করেছিলেন যা তাঁর অনুসারীদের অনুপ্রাণিত করে। ফলে বৌদ্ধপন্ডিতগণ যেখান থেকে চট্টগ্রম বিহারে আসুক না কেন, সাহিত্যচর্চায় চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষাকে আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করেন।
যাই হোক, চক্রশালা বিহার প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর চক্রশালা পূর্ববঙ্গে সাহিত্যসাধনা ও বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যদের মিলনকেন্দ্রে পরিণত হয়। সিদ্ধাচার্যগণ এখানে বসে সাধারণ মানুষের মুখে মুখে প্রচলিত ভাষা তথা প্রাচীন বাংলা ভাষায় বিভিন্ন কবিতা, পদ রচনা করেন। এগুলোই হচ্ছে বাংলা সাহিত্যের প্রাচীন নিদর্শনের সূচনা। হরপ্রসাদ শাস্ত্রী আবিষ্কৃত অতি অল্প কয়েকটি চর্যাপদ ছাড়া অধিকাংশের হদিস এখনও পাওয়া যায়নি, হয়তো হারিয়ে গেছে। চক্রশালা বিহারে শুধু চর্যা রচিত হতো না, পালি ভাষাতেও নানা শ্লেক রচিত হতো। কিছু কিছু পাদকার পালি ভাষায় এবং কেউ কেউ প্রাচীন বাংলা ভাষায় কবিতা রচনা করতেন। ষষ্ঠদশ শতক থেকে চট্টগ্রামের প্রাচীন আঞ্চলিক ভাষায় বাংলায় কবিতা লেখার প্রচলন বেড়ে যায়। মুদ্রণ যন্ত্র না থাকায় প্রকাশিত পুস্তকাদি হাতে লেখা হতো এবং অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা কারণে এর প্রচার নির্দিষ্ট অঞ্চলে সীমাবদ্ধ থেকে যেত। তাই আঞ্চলিক ভাষায় সাহিত্যকর্ম করলে তা সহজে জনমনে আলোড়ন তুলতে সক্ষম হতো। এ জন্য চর্যাকারগণ মূলত চট্টগ্রামের প্রাচীন আঞ্চলিক ভাষায় সাহিত্য কর্ম করতেন। যার প্রভাব এখনও আরকান, বার্মিজ ভাষা, নেপাল ও ভারতের বিভিন্ন বঙ্গসংলগ্ন রাজ্যে লক্ষণীয়।
চট্টগ্রামে বসে এসব চর্যা বা দোহাগাণ রচিত হয়েছে বলে চর্যাপদের বাক্যের গঠনে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষার প্রভাব ব্যাপকভাবে লক্ষ করা যায়। এ প্রসঙ্গে কবি ভূসুকপাদের একটি পদ উল্লেখ করা যায় :
কাহেরে যিনি মেলি আছহ কীস,
বেড়িল পড় অ চৌদীষ।
আপনা মাংস হরিণা বৈরী,
খনহন ছাড় ভূসুক আহেরি।
তিন ন’চ্ছই হরিণা পিবই ন’পানী,
হরিণা হরিণীর নিল অন জানি।
এখানে বর্ণিত আছহ কীস, খনহন ছাড়, ন’চ্ছই ন’পানী, অন জানি প্রভৃতি শব্দগুচ্ছের ব্যবহার কেবল চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষা রীতির অনুরূপ। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় না-বোধক শব্দ ক্রিয়ার আগে বসে। যেমন : ন যও, ন চঅ ইত্যাদি। চর্যাচর্য বিনিশ্চয়ের চর্যাসমূহেও ক্রিয়ার আগে না- বোধক পদ ব্যবহৃত হয়েছে। আদি চর্যাকার লুইপা অধিকাংশ চর্যাকারের চর্যায় চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষা অনুযায়ী বাক্যগঠন লক্ষণীয়। কুক্কুরীপা, গুন্ডরীপা, ভুসুকুপা, কাহ্নুপা, ডোম্বীপা, শান্তিপা, মহিধরাপাসহ প্রায় সবার চর্যাপদে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষার শব্দ বিন্যাস দেখা যায়। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষার মতো এখানে ‘না’ শব্দটি ‘ন’ হয়ে ক্রিয়ার আগে বসেছে। বাক্যে শব্দে শব্দে ব্যবহৃত হয়েছে চন্দ্রবিন্দু।
এ প্রসঙ্গে আরও কয়েকটি উদাহরণ দেওয়া যায় : সিট করিঅ মহাসুহ পরিমাণ (লুইপা), ধুলি ধুলি পিটা ধরণ ন জাই (কুক্কুরী পা), জোইণি তঁই বিনু খনহি ন জীবমি (গুন্ডরিপা), খনছ না ছাড়অ ভুসুঅ হেরি, তিন নচ্ছুপাই হরিণা পিবাই ন পাণী (ভুসুকুপা), ভানুই হ্নু মোহিঅহি ন পইসই (কাহ্নপা), ভাবাভাব বলাগ না ছুধ (কাহ্নপা), তান্তি বিকণঅ ডোম্বি অবর ন চঙ্গতা (কাহ্নুপা), করুণা পিহাড়ি খেলছঁ নঅ কল (কৃষ্ণাচার্য পা), আগে নাব ন ভেলা দীসঅ ভাস্তি না পুচ্ছসি নাহা (শান্তিপা), বিদুজণ লোঅ তোঁরে কণ্ঠ ন মেলাঈঁ (কাহ্নুপা) প্রভৃতি।
শুধু এই চর্যাপদ নয়, অধিকাংশ চর্যার বাক্যগঠনে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষার গঠনশৈলী, অর্থ ও পরিবেশ-পরিক্রমা লক্ষণীয়। চর্যাচয় বিনিশ্চয় গ্রন্থে ২৩ জন কবির মোট ৫০টি পদ ছিল। কিন্তু হরপ্রসাদ শাস্ত্রী যে পান্ডুলিপিটি আবিষ্কার করেন সেখানে খন্ডিত ও ছেঁড়া থাকায় সাড়ে ৪৬টি পদ পাওয়া যায়। চর্যাপদ যারা রচনা করেছিলেন তাদের বলা হতো সিদ্ধাচার্য। চর্যাপদের ২৩ জন কবির অধিকাংশের লেখায় চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষার শব্দ গঠন রীতি সুস্পষ্ট।
এবার দেখা যাক, বাংলার প্রাচীন নিদর্শন চর্যাপদ কীভাবে নেপাল গেল। পন্ডিতবিহার বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হওয়ার পর চক্রশালা বৌদ্ধবিহারের সমদুয় কাগজপত্র দেয়াঙ পাহাড়ে অবস্থিত পন্ডিতবিহার বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থানান্তর করা হয়। পন্ডিতবিহারের প্রধান অধ্যক্ষ ছিলেন পটিয়া উপজেলার চক্রশালায় জন্মগ্রহণকারী ব্রাহ্মণ সন্তান তিলপাদ। তিনি হিন্দু থেকে বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। তাঁর হিন্দুকালীন যোগসাধন সঙ্গিনী তিল পিষে জীবন ধারণ করতেন। তাই তিনি তিলপাদ নাম গ্রহণ করেছিলেন। তিনি মহাযান তথা তান্ত্রিক বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করার পর প্রজ্ঞাভদ্র নাম ধারণ করেন। পন্ডিতবিহার বিশ্ববিদ্যালয়ের বৌদ্ধ পন্ডিতদের প্রধান কাজ ছিল মহাযান বা তান্ত্রিক বৌদ্ধদের ধর্মীয় বিধি, দোহাগান বা চর্যপদ রচনা, পূজার জন্য দেবদেবীর কম্পনা, মন্ডল আঁকা, স্তব-স্ত্রোত্র, ধারণী মন্ত্র এবং টীকা-টিপ্পনীসহ গ্রন্থাদি রচনা।
পন্ডিতবিহার বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ প্রজ্ঞাভদ্র, সংস্কৃত, পালি ও চট্টগ্রামের প্রাচীন আঞ্চলিক মিশ্রিত ভাষায় ছয়টি গ্রন্থ রচনা করেছিলেন। গ্রন্থগুলো হচ্ছে, শ্রী সহজ শম্বরস্বাধীষ্টান, অচিন্ত্য মহামুদ্রনাম, তত্ত¡ চতুরোপদেশ প্রসন্নদীপ, যোহা কোষ, ষড় ধর্মোপদেশ এবং মহামন্ত্রোপাদেশ। ইতিহাসবেত্তাদের ধারণা, প্রজ্ঞাভদ্রের জন্মস্থান চট্টগ্রাম হলেও তিনি সারাজীবন চট্টগ্রাম কাটাননি। অনেক ইতিহাসবেত্তা প্রজ্ঞাভভদ্র লিখিত অচিন্ত্য মহামুদ্রনাম গ্রন্থটি বিশ্লেষণ করে বলেছেন, এটি ‘যশঃপালপুরঃ’ নামক স্থানে লিখিত হয়েছিল। স্থানটি চট্টগ্রামে নয় বলে অনেকের অভিমত। কেউ কেউ মনে করেন, স্থানটি নেপালে অবস্থিত। তিনি কোনো বিশেষ কারণে চট্টগ্রাম হতে নেপাল গমন করেছিলেন। অবশ্য এটা ঠিক যে, প্রজ্ঞাভদ্র সারাজীবন পন্ডিতবিহার বিশ্ববিদ্যালয়ে কাটাননি। তিনি চট্টগ্রামের পন্ডিতবিহার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নেপাল গিয়েছিলেন। নেপাল যাবার সময় পন্ডিতবিহার বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু গ্রন্থ নিয়ে যান। ওই গ্রন্থসমূহের সঙ্গে চর্যাচর্য বিনিশ্চয় পুথিটিও ছিল যা ১৯০৭ খ্রিস্টাব্দে মহামহোপাধ্যায় হরপপ্রসাদ শাস্ত্রী নেপালের রাজকীয় গ্রন্থাগার হতে উদ্ধার করেন। হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর উদ্ধারকারী পুথি ছাড়াও অনুরূপ আরও অনেক পুথি পন্ডিতবিহার বিশ্ববিদ্যালয়ে ছিল, যা কালের প্রবাহে ও সংরক্ষণের অভাবে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। ভাগ্যিস প্রজ্ঞাভদ্র চর্যাচর্য বিনিশ্চয়ের একটা পুথি নেপালে নিয়ে গিয়েছিলেন, বাংলাদেশে থাকলেও ওগুলোও বিলুপ্ত হয়ে যেত।
চট্টগ্রামের লোকগান কত প্রাচীন তা যথার্থভাবে নির্ণয় করা কঠিন হলেও আধুনিক গবেষণায় প্রতীয়মান হয়েছে, চট্টগ্রামের লোকগান চর্যাপদের সমসাময়িক। অনেকের মতে, চর্যাপদের পূর্ব থেকে চট্টগ্রামের লোকগানের উৎপত্তি। পাহাড় নদীর সংগম আর নিজস্ব ভূনের স্বকীয়তা চট্টগ্রামবাসীকে বহুপ্রচীনকাল থেকে লোকগানের প্রতি প্রকৃতিগতভাবে আকৃষ্ট করে রেখেছিল। তাই চট্টগ্রামের লোকগানের ভাষা, অক্ষর ও বিন্যাসের সঙ্গে বাংলার আদি নিদর্শন চর্যাপদের চমৎকার সাযুজ্য ও মিল দেখা যায়।
মধ্যযুগের কবিদের মধ্যে আলাওল, সৈয়দ সুলতান, দৌলত উজির বাহরাম খান, মোহাম্মদ মুকিম, আব্দুল হাকিম প্রমুখ প্রসিদ্ধ কবিদের নাম আমরা পাই। চর্যাপদের সুরের কাছাকাছি সুরের দ্যোতনা দেখা যায় আস্কর আলী পন্ডিতের গানে। তিনি গেয়েছেন : কী জ্বালা দি গেলা মোরে, - - - ন রাখি মাটিতে, ন রাখি পাটিতে ন রাখি পালংকের পরে।’ এমন আরও গান আছে যেমন : ন মাতাই ন বুলাই গেলিরে বন্ধুয়া, মনর আশা ন ফুরালি - - -। এসময়কালের লোকগীতিকার আলী রজা ওরফে কানুফকির (১৭৫৯-১৮৩৭), শতকে আস্কর আলী পন্ডিত (১৮৪৬-১৯২৭), আবদুল জলিল সিকদার (১৮৫৭-১৯৩৪), সেকান্দর গাইন (১৮৬০-১৯৪২), খাদেম আলী (১৮৭০-১৯৪৭) প্রমুখের গানেও চর্যাপদের পদবিন্যাস লক্ষ করা যায়।
১৯২৬ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত The Origin and Development of the Bengali Language গ্রন্থে ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় বলেছেন, পুথিগুলোর মধ্যে কেবল চর্যাপদের ভাষাই বাংলা। চর্যাপদের, প্রতিটি চর্যাই গান এবং রচয়িতা বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্য। এঁরা বৌদ্ধ ছিল এমনটি নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। তবে এরা যে বৌদ্ধ লোকধর্মের অনুসারী ছিলেন এবং চট্টগ্রামে অবস্থিত পন্ডিতবিহার বিশ্ববিদ্যালয় বা চক্রশালা বিহারে এগুলো লিখেছেন, তা নিশ্চিত। চর্যাসমূহে তাঁরা ‘লোক’ হিসেবে নিজেদের দুঃখ-বেদনা এবং তাঁদের অনুসৃত লোকধর্মকে কেন্দ্র করে ধর্ম-সাধনার কথা ব্যক্ত করেছেন। চট্টগ্রামের আধুনিক লোকগানেও এমন দেখা যায়। আধুনিক মাইজভান্ডারি গান ও চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় লেখা আধ্যাত্মিক গানেও চর্যার প্রভাব এ চরিত্র লক্ষণীয়।
ভাষিক বিশ্লেষণও চর্যাপদকে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক লোকগানের দিকে ইঙ্গিত করে। চর্যাপদ এবং চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষার গঠন ও অর্থগত নিবিড়তা পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, চর্যাপদ মূলত চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষার একটি প্রাচীন কাব্যিক রূপ। যারা চর্যাপদ লিখেছেন তারা ছিলেন বৌদ্ধ বা বৌদ্ধ লোকধর্মের অনুসারী। এরূপ লোকদের অধিকাংশের নিবাস ছিল চট্টগ্রাম। তাই বিশেষজ্ঞদের অভিমত, চর্যাপদ বাংলা ভাষার আদি নির্দশন হলেও এ আদি নিদর্শন চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষার মৌলিকতায় সমর্পিত একটি মনোহরী ভাষা।
চর্যাপদের গীতিকাগুলোর সুরছন্দ, লয়তান ও বিন্যাস-দ্যোতনায় চট্টগ্রাম আঞ্চলিক ভাষার গানের অনুভব পাওয়া যায়। চাটিলপাদানং ৫ নম্বর চর্যার চর্যাকার হিসেবে স্বীকৃত। তাকে অনেকে চর্যাকারদের গুরু বলে অভিহিত করেন। ড. সত্যব্রত দে তাঁর লেখা ‘চর্যাগীতি পরিচয়’ গ্রন্থে লিখেছেন, “চাটিল চট্টগ্রামবাসী হইতে পারেন”। আধুনিক গবেষণায় প্রতীয়মান হয়েছে, দশম শতকে চট্টগ্রামের পন্ডিতবিহারে কাহ্নপাদানং ও শবরপাদানং ছাড়াও আরও কয়েকজন খ্যাতিমান চর্যাকার অধ্যাপনা করতেন। ইত্যাদি বিবেচনায় আমরা বলতে পারি চর্যাপদে চাটিলপাদানং প্রমুখ রচিত চর্যা মূলত চট্টগ্রামের প্রাচীন আঞ্চলিক ভাষায় রচিত চট্টগ্রামের লোকগানের প্রাচীনতম শাখা। হিন্দু আমলের শুরু থেকে পন্ডিত বৌদ্ধবিহারের প্রভাব কমে যেতে শুরু করে। ফলে সিদ্ধাচার্যগণ চট্টগ্রাম ত্যাগ করে আরকানে গিয়ে প্রাচীন বাংলা ভাষায় সাহিত্যচর্চা শুরু করেন। যে প্রাচীন ভাষা থেকে নানা বিবর্তনের মাধ্যমে আধুনিক বাংলা ভাষার উৎপত্তি। মধ্যযুগে যা আরও বিকশিত হয়ে ওঠে। চর্যাপদের আদি জন্মভূমি চট্টগ্রাম এবং চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষাতেই চর্যাপদ রচিত। অতএব আমরা বলতে পারি, চট্টগ্রামের আদি আঞ্চলিক ভাষাই বাংলা সাহিত্যের আদি নিদর্শন।
লেখক : কথাসাহিত্যিক, গবেষক, ইতিহাসবেত্তা, জীবনীকার, ভাষাবিজ্ঞানী ও অনুবাদক। শতাধিক গ্রন্থের প্রণেতা।
Source: www.dailyinqilab.com
প্রকাশের সময় : ৯ এপ্রিল, ২০১৭
Subscribe to:
Posts (Atom)





