Showing posts with label নীতি-কবিতা. Show all posts
Showing posts with label নীতি-কবিতা. Show all posts

Tuesday, March 26, 2019

নীতি-কবিতা : বাংলা কবিতার হারিয়ে যাওয়া সম্পদ

- মু হা ম্মা দ হা বী বু ল্লা হ 


            এক সমাজব্যবস্থা থেকে অন্যতর ও উন্নততর সমাজব্যবস্থার দিকে অভিযাত্রা এবং কালো সভ্যতা থেকে ভালো সভ্যতা অভিমুখে যাত্রার জন্যই নানা কালপর্বে নৈতিক বাণী, লোকধর্ম, ধর্ম, দর্শন, দর্শনজাত রাজনৈতিক আদর্শ ও মতাদর্শের সৃষ্টি। যুগ-যুগান্তরে নীতির জন্ম হয় মানবসমাজ ও সমাজজীবনের অভিজ্ঞতার পরিণতি থেকে, পরিণতি থেকে অর্জিত শিক্ষার পথ ধরে। ব্যক্তির জন্ম হয় নীতির ওপর, কিছুটা বেড়েও ওঠে সে নীতির ওপর। কিন্তু পরে বিকশিত হওয়ার পথে, বিশেষ করে দ্বান্দ্বরক্তিম আধুনিক জীবনে নীতিকে বিশাল বাধা মনে করে। প্রতিটি মানুষের ভেতরে কোনো না কোনোভাবে, জীবনের কোনো না কোনো কালপর্বে, নীতিবোধ, নীতিভাবনা, নীতিগ্রহণ ও নীতিপ্রচারের তাড়না এবং প্রেরণা থাকে। নীতিবোধ ও নীতিভাবনা প্রত্যেক মানুষের ভেতর, বোধহয়, জীবিত ও জাগ্রত থাকে আজীবন। কিন্তু নীতিগ্রহণ ও নীতিপ্রচারের প্রবণতা থাকে না বেশিদিন। প্রত্যেক ব্যক্তির নীতিবোধ ও নীতিভাবনা শক্তিতে-স্বচ্ছতায় এক ও সমগোত্রীয় নয়। মানুষের মনের গভীর প্রকোষ্ঠে নীতিবোধ ও আধ্যাত্মিকতাবোধ পথসঙ্গী হয়ে চলাচল করে। একটি সূক্ষ্ম-সুগভীর অধ্যাত্মবোধ ছাড়া শিল্পচর্চা হয়ে ওঠে না। বিশেষ করে ললিতকলার উপাসনা হয় না। কারণ, সূক্ষ্ম রসানুভূতির পথ ধরেই মানুষের মধ্যে শিল্পসৃষ্টির প্রয়াস ও প্রেরণা জেগেছিল একদিন; এখনও জাগে; জাগবেও চিরদিন। ফলে শিল্পসাধককে—নিজের সঠিক পথটিতে চলার জন্য অধ্যাত্মসাধক হতেই হয়। আধ্যাত্মিকতার আদর্শ যে গ্রহণ করে না এবং অধ্যাত্মবোধ (ব্যাপকার্থে; কোনো বিশেষ ইজমের দৃষ্টিকোণ থেকে নয়) যার ভেতর জাগ্রত হয়নি, তার জন্য ললিতকলা চর্চা করতে যাওয়া এক ধরনের কষ্টকল্পনা ও বিড়ম্বনা। কারণ জীবনকে বা পুরো জগতকে অধ্যাত্মভাব ও বোধ নিয়ে দেখলেই সবকিছুর মধ্যে একটা সূক্ষ্ম রসঘন সত্তা অনুভব করা যায়। আর এ সত্তাকে যিনি যত বেশি উপলব্ধি করতে পারেন, তিনি কথাস্রষ্টা হিসেবে তত বেশি সার্থক। এই নীতিবোধের কারণেই সমইজমের মানুষরাও একসময় পরস্পর পৃথক হয়ে যায়, ভিন্ন পথে ও মতে পা বাড়ায়। প্রত্যেকে চলে যে যার পথে। শুরু হয় তর্ক। নীতি-নৈতিকতাহীন জীবনের চেয়ে জড় হওয়াকে ভালো মনে করেছেন অনেকে। তাই বাহাদুর শাহ্ জাফরের কবিতায় অভিমান অভিনীত হয় এভাবে : ‘মানুষ হইয়া হ’ল না যখন মানুষের মত মন/ভাল হ’ত যদি হয়ে জড়মতি রহিতাম আমরণ’ (অনুবাদ : সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত)। 

          কাব্যসাহিত্য বিষয়ে ও আঙ্গিকে বহুশাখায়িত। তার শাখাসমূহের অন্যতম হলো নীতি-কবিতা। আধুনিকতার দুর্দম দাপটে মানুষের জীবন ও জীবনের সবকিছু এখন সংজ্ঞাহীন-প্রজ্ঞাহীন। মানুষ আজ সংজ্ঞার ছকে ফেলে কোনো কিছুকে বুঝতে চেষ্টা করে না এবং বোঝানোর চেষ্টা করা হলে সে বিরক্ত হয়। তথাকথিত অচলায়তন বা বৃত্ত ভাঙার যুদ্ধে এখন সবাই মত্ত। সুতরাং নীতি-কবিতার তাত্ত্বিক, ঐতিহাসিক ও একাডেমিক সংজ্ঞার পথ ধরে না এগিয়েও আমরা বলতে পারি—গল্প, কাহিনী, কাহিনী-খণ্ড বা নিছক কলাশিল্পের মাধ্যমে কবি জ্ঞানগর্ভ নীতিকথা বা তত্ত্বকথা প্রচার করে থাকেন। এজাতীয় কবিতাকে নীতি-কবিতা বলা যায়। তবে জ্ঞানের কথা, নীতির কথা বা তত্ত্বকথা কাব্য-সুষমায় মণ্ডিত হতে হবে। তা না হলে এ ধরনের কবিতা ব্যর্থ হতে বাধ্য। নীতি-কবিতায় কখনও প্রত্যক্ষভাবে, কখনও পরোক্ষভাবে কিংবা রূপক-প্রতীকের আশ্রয়ে মানবসমাজের কল্যাণার্থে আদেশ-উপদেশ বা নীতিকথা প্রকাশিত হয়। তবে মনে রাখতে হবে, উপদেশকথা ও নীতিকথার বিবরণ মানেই কবিতা নয়। অসাধারণ বাণীবদ্ধ কথামালাও সবসময় কবিতা হয়ে উঠতে পারে না। দেহসৌষ্ঠবের লাবণ্যের অন্তরালে প্রাণৈশ্বর্যপূর্ণ একটি আত্মাও থাকতে হয় কবিতায়। আত্মার প্রাণপ্রাচুর্যের মধ্যেই মূর্ত হয়ে ওঠে কবিতার রমণীয়তা, রসময়তা ও রহস্যময়তার সৌন্দর্য। ব্যক্তি এবং সেই সূত্রে পুরো সমাজ নিজের ত্রুটি-বিচ্যুতি ও নৈতিক কদাচারের সংশোধনের লক্ষ্যে অনুশাসনতুল্য পথনির্দেশক বাণী বা উপদেশকে বুকে নিয়ে এ জাতীয় কবিতার জন্ম। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ধর্ম, ধর্মগ্রন্থ ও ধর্মগ্রন্থে মূল মর্ম আলোচনা করলে দেখা যাবে, বিশ্বের মানুষকে শুদ্ধ মানুষ হিসেবে, সর্বোপরি সুনাগরিক ও সভ্যরূপে গড়ে তোলার জন্য নবী-রাসুল, শ্রেষ্ঠ মনীষী ও মহাপুরুষদের বাণী, বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থ, শিক্ষণীয় কাহিনীর আদর্শ, সেই সঙ্গে সাধারণ নীতিগ্রন্থ ও প্রবাদ-প্রবচন প্রবল শক্তি ও মন্ত্র হিসেবে কাজ করেছে। সেই সূত্র ধরে পরবর্তী যুগে নীতি-কবিতা বা উপদেশমূলক কবিতার উদ্ভব ও বিকাশ। ফলে কাব্যসাহিত্যের এই শাখাটির শক্তি উল্লখযোগ্যভাবে কার্যকর। তা না হলে প্রাচীন যুগ থেকে অদ্যাবধি বিশ্বের সকল দেশে ও সাহিত্যের তার গৌরবদীপ্ত প্রচলন এবং ভূমিকা থাকত না। আজকে যে আমরা বাউল ও মরমী দানের প্রতি শিক্ষিত সমাজের কৌতূহল দেখতে পাই, তারও মূলে রয়েছে নীতি-কবিতা প্রচলনের ভূমিকা। 

           শিল্পের সংস্থিতি উপেক্ষা করলে মানুষের কাছে পৌঁছুতে পারে না কোনো কবিতা। আর মানুষের কাছে পৌঁছুতে না পারলে কবিতা রচনা ব্যর্থ। পাঠকের মনে যদি কবিতা কিছু সঞ্চার না করে, তা হলে সে করবেটা কী? বলা হয়ে থাকে, পৌঁছানোর জিনিসটা কেবলই রূপনির্ভর। কিন্তু ভুললে চলবে না, রূপেরও তো একটা ঈপ্সিত ছাপ বা ভাব থাকে, যা কবি এঁকে দিতে চান পাঠককুলের হৃদয়-গভীরে। সেটি কি একরকম বোঝানোর কাজ নয়? ভাবা বা ছাপ যা কবি এঁকে দিতে চান, সেটা অবশ্যি একান্ত কবিরই; পাঠক যদি ঠিক তা ধরতে না পারেন, তাতে কিছু যায়-আসে না। কিন্তু পাঠকরা যদি আকৃষ্ট ও প্রাণিত না হন, তাদের বোধের তলদেশ যদি দুলে না ওঠে চেনা-অচেনা কোনো বোধের তরঙ্গে, তা হলে ওই কবিতা কি ব্যর্থ নয়? এই যে কিছু সঞ্চার করা এবং বোধের তরঙ্গে তলদেশ দুলে ওঠা—এটা সবচেয়ে বেশি হয় নীতি-কবিতায়। হয় কেন? এজাতীয় কবিতায় প্রত্যেক ব্যক্তির হৃদয়ের ব্যাখ্যা ও অনুবাদ হয় বলে, ভাষা ও বর্ণনা ঝরঝরে নির্ভার হয় বলে এবং ছন্দের সুরেলা ঝঙ্কার পাঠকের হৃদয়কে নাচিয়ে তুলে বলে। কবিতার একদল সমালোচক সেই আদিকাল থেকেই বলে আসছেন, কবিতাকে আনন্দ দিতে হবে, আবার উপদেশও দিতে হবে। কবিতা থেকে কোনো একরকম নৈতিক সহায়তা পাওয়া আকাঙ্ক্ষাটা একসময় মানুষের মজ্জাগত ছিল। কিন্তু পরে অন্যায়ভাবে তাকে আপন নিবাস থেকে গলা ধাক্কা দিয়ে বের করে দেয়া হয়েছে। বলা হয়ে থাকে, ‘কবিতার কাজ হচ্ছে খুলে দেখানো, শেখানো নয়’। কিন্তু কেন? তার কাজ তো একই সঙ্গে খুলে দেখানো এবং শেখানোও। ব্যক্তি মানুষের হৃদয়ানুভূতি যেমন নিজে উপভোগ করার মতো, তেমনি তা অপরের ভেতর সঞ্চার ও শেয়ার করার মতোও। শুধু সৃষ্টি করলে কী হবে? সরবরাহও তো করতে হবে। কবিমাত্র মানবের মাঝে শাশ্বত জীবনবোধ নিয়ে বেঁচে থাকতে চান। তাঁর বোধ ও ভাবনার রাজ্যে দিবারাত যে সংক্রমণ, তা তিনি চালিয়ে দিতে চান সবার মাঝে। তাই তার ব্যক্তিক অনুভূতি হয়ে ওঠে সবার অনুভূতি। কবিতা কোনোমতেই ধর্ম নয়; আবার ধর্মকথাদীপ্ত কবিতাও অকবিতা নয়। কবিতা যা দিতে পারে, তার কাছে তার চেয়ে বেশি চাওয়াটা ঠিক নয়, আবার যা দিতে পারে, তা ফিরিয়ে দেয়াও যৌক্তিক নয়। কবিতা শুধু মলমের কাজ না, মহৌষধের কাজও করে। কবিতাকে প্রচার করতে হয় না ধর্মতত্ত্ব ও নীতিকথা। কিন্তু এগুলো প্রচার করলেও মহাভারত অশুদ্ধ হয় না। কবিতা মানুষকে সচেতন করে, সজীব করে—এমনকি তাদের আমূল পরিবর্তনও করতে পারে। যেমন পারে ধর্ম ও নীতি। 


            গবেষকরা বলেছেন, বাংলাসাহিত্যে নীতি-কবিতার জন্ম হয় মধ্যযুগে। ওই সময় ভারতজুড়ে নানা পরিবর্তন, আন্দোলন, দ্বন্দ্ব-সংঘাত ও যুদ্ধবিগ্রহ। মানুষের মূল্যবোধ তখন সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত। চারিত্রিক শুদ্ধচারিতা বলতে গেলে শূন্যের কোঠায়। ঠিক ওই সময় নানা নৈতিক উপদেশ ও নীতিকথা কাব্যের আদলে অভিব্যক্ত হয়। তবে তখন নীতি-কবিতার আঙ্গিকরীতি নিয়ে তেমন কোনো পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়নি, তাতে তেমন আধুনিকতার ছোঁয়া লাগেনি। ঊনবিংশ শতাব্দী থেকেই মূলত আধুনিক আঙ্গিকে বাংলাসাহিত্যে নীতি-কবিতার ব্যাপক-বিচিত্র প্রকাশ ও প্রসার ঘটেছে। বাংলা নীতি-কবিতা যাদের চর্চায়-পরিচর্যায় ও সচেতন প্রয়াসে সমৃদ্ধ হয়েছে, তাদের মধ্যে ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত (১৮১২-১৮৫৯), কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদার (১৮৩৭-১৯০৭), রবীন্দ্রনাথ (১৮৬১-১৯৪১), কামিনী রায় (১৮৬৪-১৯৩৩), রজনীকান্ত সেন (১৮৬৫-১৯১০), সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত (১৮৮২-১৯২২), শেখ ফজলুল করীম (১৮৮২-১৯৩৬), ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ (১৮৮৫-১৯৬৯), সুকুমার রায় (১৮৮৭-১৯২৩), ডা. লুতফর রহমান (১৮৮৯-১৯৩৬), শেখ হবিবর রহমান (১৮৯১-১৯৬২), গোলাম মোস্তফা (১৮৯৭-১৯৬৪), আবদুল কাদির (১৯০৬-১৯৮৪), বন্দে আলী মিয়া (১৯০৬-১৯৭৯), কাজী কাদের নেওয়াজ (১৯০৯-১৯৮৩), ফররুখ আহমদ (১৯১৮-১৯৭৪) প্রমুখ উল্লেখযোগ্য। কবিদের মধ্যে কেউ কেউ নীতি-কবিতা-রচনার প্রতি এত বেশি ঝুঁকেছিলেন যে, তাদের একাধিক স্বতন্ত্র গ্রন্থ আছে নীতি-কবিতা নিয়ে। যেমন—রজনীকান্ত সেন। তার দু’টি স্বতন্ত্র কাব্যগ্রন্থ রয়েছে শুধু নীতি-কবিতা নিয়ে। তাঁর তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘অমৃত’ আটচল্লিশটি কবিতা নিয়ে প্রকাশিত হয় ১৯১০ সালে এবং ১৯১৩ সালে প্রকাশিত হয় ‘সদ্ভাব কুসুম’। কিন্তু দুঃখের বিষয়, বাংলাকাব্যের এই ঐতিহ্যধন্য ধারাটি ক্রমনিম্নগামী হয়ে এক সময় হারিয়ে গেছে। খোদাবন্দনা ও রাসুলপ্রশস্তির ধারাটি, যদিও নিভু নিভু অবস্থায় কোনোরকম টিকে আছে। কিন্তু নীতি-কবিতার ধারাটি একেবারে হারিয়ে গেছে বললেও চলে। বিংশ শতাব্দীর ষাটের দশকের পর থেকে নীতি-কবিতা-রচনার প্রয়াস তেমন লক্ষ্য করা যায়নি। এখন নীতি-কবিতার নিরাপদ আশ্রয় বলতে শুধু কয়েকখানা পাঠ্যবইয়ের পৃষ্ঠা। সেখানেও আবার কর্তন-বিয়োগের আজব খেলা। সেই শৈশবে যে পড়েছিলাম ‘এই করিনু পণ মোরা/এই করিনু পণ ফুলের মত গড়ব মোরা মোদের এই জীবন’ কিংবা ‘সকালে উঠিয়া আমি মনে মনে বলি/সারাদিন আমি যেন ভালো হয়ে চলি’—এগুলো এখন আর দেখা যায় না। অথচ একথা সবাই মানবেন যে, সার্বিক নীতিভ্রষ্ট ও নীতিশূন্যতার এ কালিমাচ্ছন্ন সময়ে নীতি-কবিতারই প্রবল প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। যাতে ব্যক্তিতে, সমাজে, বিশেষ করে আমাদের সমাজের তরুণ ও কিশোরদের মাঝে নৈতিকতার নতুন জাগরণ সূচিত হয়। আশার কথা হলো, বিদ্বত্সমাজ এই কবিতাসত্তাকে একেবারে ভুলে যাননি। অন্তত ক্ষুদ্রকায় কিছু সঙ্কলন বের করে হলেও তাকে স্মরণ রেখেছেন। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রকে ধন্যবাদ দিতে হয়। এই প্রতিষ্ঠানটি ‘বাংলাসাহিত্যের সেরা উপদেশমূলক কবিতা’ নামে একটি সঙ্কলন বের করে ১৯৯০ সালে। সেটির দ্বিতীয় সংস্করণও বের হয় ২০০০ সালে। কিন্তু বাংলাসাহিত্যের নীতি-কবিতার সমাদরপূর্ণ সংখ্যাধিক্যের তুলনায় সঙ্কলনটি খুবই ক্ষুদ্র ও ক্ষীণকায়। মাত্র পঞ্চান্ন পৃষ্ঠার বইটিতে আটত্রিশজন কবির মোট একশ’ চারটি কবিতা স্থান পেয়েছে। সেই সঙ্গে ‘বাঙালি-স্বভাব’ সুলভ অযত্ন ও অনুসন্ধিত্সার অভাবও সৃস্পষ্ট। নীতি-কবিতা বা উপদেশমূলক কবিতার সঙ্কলন থেকে গোলাম মোস্তফা (১৮৯৭১৯৬৪), আবদুল কাদির (১৯০৬-১৯৮৪), বন্দে আলী মিয়া (১৯০৬-১৯৭৯) ও কাজী কাদের নেওয়াজ (১৯০৯-১৯৮৩) কেন বাদ পড়েছেন, সেটা বিস্ময়ের ব্যাপার। অথচ এখনও গোলাম মোস্তফার ‘কিশোর’, আবদুল কাদিরের ‘মানুষের সেবা’ ও মৈত্রী’, বন্দে আলী মিয়ার ‘আমাদের গ্রাম’, কাজী কাদের নেওয়াজের ‘শিক্ষকের মর্যাদা’ ও ‘মা’ পাঠ্যবইয়ের অন্তর্ভুক্ত। এছাড়াও এঁদের আরও একাধিক নীতি-কবিতা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে তাঁদের কাব্যসম্ভরে। নীতি-কবিতার নানাকৌণিক রূপ-গুণ ও অবদানের ফলে কিছু কিছু কবিতা প্রবাদ-প্রবচন ও কিংবদন্তিতে পরিণত হয়েছে। সেগুলো এখনও মানুষের জিহ্বায় নেচে ওঠে, দুলিয়ে দেয় হৃদয়ের রুমাল। যেমন ধরা যাক— আপনাকে বড় বলে বড় সেই নয়/লোকে যারে বড় বলে বড় সেই হয়। চিরসুখী জন/ভ্রমে কি কখন/ব্যথিত বেদন বুঝিতে পারে? কী যাতনা বিষে/বুঝিবে সে কিসে/কভু আশী বিষে দংশেনি যারে। যে জন দিবসে/মনের হরষে/জ্বালায় মোমের বাতি/আশু গৃহে তার/দেখিবে না আর/নিশিতে প্রদীপ ভাতি। (কৃষ্ণকুমার মজুমদার) পারিব না এ কথাটি বলিও না আর/কেন পারিবে না তাহা ভাবো একবার। (কালীপ্রসন্ন ঘোষ) আপনারে লয়ে বিব্রত রহিতে/আসে নাই কেহ অবনী ‘পরে/ সকলের তরে সকলে আমরা/প্রত্যেকে মোরা পরের তরে। (কামিনী রায়) বাবুই হাসিয়া কহে, ‘সন্দেহ কি তায়?/কষ্ট পাই, তবু থাকি নিজের বাসায়,/পাকা হোক, তবু ভাই, পরের ও বাসা/নিজের হাতে গড়া মোর কাঁচাঘর খাসা। (রজনীকান্ত সেন) আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে/কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হবে/মুখে হাসি বুকে বল তেজে ভরা মন/মানুষ হইতে হবে এই তার পণ/বিপদ আসিলে কাছে হয় আগুয়ান/নাহি কি শরীরে তার রক্ত মাংস প্রাণ? (কুসুমকুমারী দাশ) ‘দাঁত আছে বলে কুকুরের গায়ে দংশি কেমন করে/কুকুরের কাজ কুকুর করেছে কামড় দিয়ে পায়,/তা’ বলে কুকুরে কামড়ানো কি রে মানুষের শোভা পায়?’ (সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত অনূদিত, মূল শেখ সাদী) গোলাপে ছিঁড়িয়া কেহ কি পেরেছে হাসি তার কেড়ে নিতে?/ধুলায় পড়েও হাসি ফোটে তার পাপড়িতে পাপড়িতে! (সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত অনূদিত, মূল, জালালুদ্দীন রুমী)।  Source: Daily Amardesh


Saturday, March 9, 2019

স্বাধীনতার সুখ – রজনীকান্ত সেন




স্বর্গ ও নরক – শেখ ফজলুল করিম



কোথায় স্বর্গ, কোথায় নরক, কে বলে তা বহুদূর ?
মানুষেরি মাঝে স্বর্গ নরক, –মানুষেতে সুরাসুর !
রিপুর তাড়নে যখনি মোদের বিবেক পায় গো লয়,
আত্মগ্লানির নরক-অনলে তখনি পুড়িতে হয়।
প্রীতি ও প্রেমের পুণ্য বাঁধনে যবে মিলি পরস্পরে,
স্বর্গ আসিয়া দাঁড়ায় তখন আমাদেরি কুঁড়ে ঘরে।




Wednesday, March 6, 2019

পণ্ডশ্রম - শামসুর রাহমান

এই নিয়েছে ঐ নিল যাঃ! কান নিয়েছে চিলে,
চিলের পিছে মরছি ঘুরে আমরা সবাই মিলে।
কানের খোঁজে ছুটছি মাঠে, কাটছি সাঁতার বিলে,
আকাশ থেকে চিলটাকে আজ ফেলব পেড়ে ঢিলে।
দিন-দুপুরে জ্যান্ত আহা, কানটা গেল উড়ে,
কান না পেলে চার দেয়ালে মরব মাথা খুঁড়ে।
কান গেলে আর মুখের পাড়ায় থাকল কি-হে বল?
কানের শোকে আজকে সবাই মিটিং করি চল।
যাচ্ছে, গেল সবই গেল, জাত মেরেছে চিলে,
পাঁজি চিলের ভূত ছাড়াব লাথি-জুতো কিলে।
সুধী সমাজ! শুনুন বলি, এই রেখেছি বাজি,
যে-জন সাধের কান নিয়েছে জান নেব তার আজই।
মিটিং হল ফিটিং হল, কান মেলে না তবু,
ডানে-বাঁয়ে ছুটে বেড়াই মেলান যদি প্রভু!
ছটতে দেখে ছোট ছেলে বলল, কেন মিছে
কানের খোঁজে মরছ ঘুরে সোনার চিলের পিছে?
নেইকো খালে, নেইকো বিলে, নেইকো মাঠে গাছে;
কান যেখানে ছিল আগে সেখানটাতেই আছে।
ঠিক বলেছে, চিল তবে কি নয়কো কানের যম?
বৃথাই মাথার ঘাম ফেলেছি, পণ্ড হল শ্রম।

Monday, February 18, 2019

মানুষের সেবা - আবদুল কাদির

- আবদুল কাদির


হাশরের দিন বলিবেন খোদা- হে আদম সন্তান 
তুমি মোরে সেবা কর নাই যবে ছিনু রোগে অজ্ঞান। 
মানুষ বলিবে - তুমি প্রভু করতার, 
আমরা কেমনে লইব তোমার পরিচর্যার ভার? 
বলিবেন খোদা- দেখনি মানুষ কেঁদেছে রোগের ঘোরে, 
তারি শুশ্রূষা করিলে তুমি যে সেথায় পাইতে মোরে। 
খোদা বলিবেন- হে আদম সন্তান, 
আমি চেয়েছিনু ক্ষুধায় অন্ন, তুমি কর নাই দান। 
মানুষ বলিবে- তুমি জগতের প্রভু, 
আমরা কেমনে খাওয়াব তোমারে, সে কাজ কি হয় কভু? 
বলিবেন খোদা- ক্ষুধিত বান্দা গিয়েছিল তব দ্বারে, 
মোর কাছে তুমি ফিরে পেতে তাহা যদি খাওয়াইতে তারে। 
পুনরপি খোদা বলিবেন- শোন হে আদম সন্তান, 
পিপাসিত হয়ে গিয়েছিনু আমি, করাও নি জল পান। 
মানুষ বলিবে- তুমি জগতের স্বামী, 
তোমারে কেমনে পিয়াইব বারি, অধম বান্দা আমি? 
বলিবেন খোদা- তৃষ্ণার্ত তোমা ডেকেছিল জল আশে, 
তারে যদি জল দিতে তুমি তাহা পাইতে আমায় পাশে।

Friday, February 15, 2019

রসাল ও স্বর্ণলতিকা - - মাইকেল মধুসূদন দত্ত


- মাইকেল মধুসূদন দত্ত
রসাল কহিল উচ্চে স্বর্ণলতিকারে;-
শুন মোর কথা, ধনি, নিন্দ বিধাতারে।
নিদারুণ তিনি অতি;
নাহি দয়া তব প্রতি;
তেঁই ক্ষুদ্র-কায়া করি সৃজিলা তোমারে।
মলয় বহিলে, হায়,
নতশিরা তুমি তায়,
মধুকর- ভরে তুমি পড় লো ঢলিয়া;
হিমাদ্রি সদৃশ আমি,
বন-বৃক্ষ-কুল-স্বামী,
মেঘলোকে উঠ শির আকাশ ভেদিয়া!
দূরে রাখি গাভী-দলে,
রাখাল আমার তলে
বিরাম লভয়ে অনুক্ষণ,-
শুন, ধনি, রাজ-কাজ দরিদ্র পালন!
আমার প্রসাদ ভুঞ্জে পথ-গামী জন।
কেহ অন্ন রাঁধি খায়
কেহ পড়ি নিদ্রা যায
এ রাজ চরণে।
মধু-মাখা ফল মোর বিখ্যাত ভূবনে!
তুমি কি তা জান না ললনে?
দেখ মোর ডাল-রাশি,
কত পাখি বাঁধে আসি
বাসা এ আগারে!
ধন্য মোর জনম সংসারে!
কিন্তু তব দুঃখ দেখি নিত্য আমি দুঃখী
নিন্দ বিধাতায় তুমি, নিন্দ, বিধুমুখী!
নীরবিলা তরুরাজ; উড়িল গগনে
যমদূতাকৃতি মেঘ গম্ভীর স্বননে;
মহাঘাতে মড়মড়ি
রসাল ভূতলে পড়ি
হায়, বায়ুবলে
হারাইল আয়ু-সহ দর্প বনস্থলে!
ঊর্ধ্বশির যদি তুমি কুল মান ধনে;
করিও না ঘৃণা তবু নিচ-শির জনে।
-সমাপ্ত-

নবীর শিক্ষা - শেখ হাবিবুর রহমান

- শেখ হাবিবুর রহমান


তিন দিন হ'তে খাইতে না পাই, নাই কিছু মোরে ঘরে, 
দারা পরিবার বাড়িতে আমার উপোস করিয়া মরে। 
নাহি পাই কাজ তাই ত্যাজি লাজ বেড়াই ভিক্ষা করি, 
হে দয়াল নবী, দাও কিছু মোরে নহিলে পরাণে মরি।' 
আরবের নবী, করুণার ছবি ভিখারির পানে চাহি, 
কোমল কণ্ঠে কহিল, -'তোমার ঘরে কি কিছুই নাহি?' 
বলিল সে, 'আছে শুধু মোর কম্বল একখানি।' 
কহিল রসুল, 'এক্ষণি গিয়া দাও তাহা মোরে আনি।' 
সম্বল তার কম্বলখানি বেচিয়া তাহার করে, 
অর্ধেক দাম দিলেন রসুল খাদ্য কেনার তরে, 
বাকি টাকা দিয়া কিনিয়া কুঠার, হাতল লাগায়ে নিজে, 
কহিলেন, 'যাও কাঠ কেটে খাও, দেখ খোদা করে কি-যে।' 
সেদিন হইতে শ্রম সাধনায় ঢালিল ভিখারি প্রাণ, 
বনের কাষ্ঠ বাজারে বেচিয়া দিন করে গুজরান। 
অভাব তাহার রহিল না আর, হইল সে সুখী ভবে, 
নবীর শিক্ষা ক'রো না ভিক্ষা, মেহনত কর সবে। 

ষোলা আনাই মিছে - সুকুমার রায়

বিদ্যেবোঝাই বাবুমশাই চড়ি সখের বোটে, 
মাঝিরে কন, ''বলতে পারিস সূর্যি কেন ওঠে? 
চাঁদটা কেন বাড়ে কমে? জোয়ার কেন আসে?'' 
বৃদ্ধ মাঝি অবাক হয়ে ফ্যাল্‌ফেলিয়ে হাসে। 
বাবু বলেন, ''সারা জীবন মরলিরে তুই খাটি, 
জ্ঞান বিনা তোর জীবনটা যে চারি আনাই মাটি।'' 

খানিক বাদে কহেন বাবু, ''বলতো দেখি ভেবে 
নদীর ধারা কেমনে আসে পাহাড় থেকে নেবে? 
বলতো কেন লবণপোরা সাগর ভরা পানি?'' 
মাঝি সে কয়, ''আরে মশাই অত কি আর জানি?'' 
বাবু বলেন, ''এই বয়সে জানিসনেও তা কি 
জীবনটা তোর নেহাৎ খেলো, অষ্ট আনাই ফাঁকি!'' 

আবার ভেবে কহেন বাবু, '' বলতো ওরে বুড়ো, 
কেন এমন নীল দেখা যায় আকাশের ঐ চুড়ো? 
বলতো দেখি সূর্য চাঁদে গ্রহণ লাগে কেন?'' 
বৃদ্ধ বলে, ''আমায় কেন লজ্জা দেছেন হেন?'' 
বাবু বলেন, ''বলব কি আর বলব তোরে কি তা,- 
দেখছি এখন জীবনটা তোর বারো আনাই বৃথা।'' 

খানিক বাদে ঝড় উঠেছে, ঢেউ উঠেছে ফুলে, 
বাবু দেখেন, নৌকাখানি ডুবলো বুঝি দুলে! 
মাঝিরে কন, '' একি আপদ! ওরে ও ভাই মাঝি, 
ডুবলো নাকি নৌকা এবার? মরব নাকি আজি?'' 
মাঝি শুধায়, ''সাঁতার জানো?''- মাথা নাড়েন বাবু 
মূর্খ মাঝি বলে, ''মশাই, এখন কেন কাবু? 
বাঁচলে শেষে আমার কথা হিসেব করো পিছে, 
তোমার দেখি জীবন খানা ষোল আনাই মিছে!'' 
Please See this video:

Thursday, February 14, 2019

পাছে লোকে কিছু বলে - কামিনী রায়

- কামিনী রায়

করিতে পারি না কাজ 
সদা ভয় সদা লাজ 
সংশয়ে সংকল্প সদা টলে,- 
পাছে লোকে কিছু বলে। 
আড়ালে আড়ালে থাকি 
নীরবে আপনা ঢাকি, 
সম্মুখে চরণ নাহি চলে 
পাছে লোকে কিছু বলে। 

হৃদয়ে বুদবুদ মত 
উঠে চিন্তা শুভ্র কত, 
মিশে যায় হৃদয়ের তলে, 
পাছে লোকে কিছু বলে। 

কাঁদে প্রাণ যবে আঁখি 
সযতনে শুকায়ে রাখি;- 
নিরমল নয়নের জলে, 
পাছে লোকে কিছু বলে। 

একটি স্নেহের কথা 
প্রশমিতে পারে ব্যথা,- 
চলে যাই উপেক্ষার ছলে, 
পাছে লোকে কিছু বলে। 

মহৎ উদ্দেশ্য যবে, 
এক সাথে মিলে সবে, 
পারি না মিলিতে সেই দলে, 
পাছে লোকে কিছু বলে। 

বিধাতা দেছেন প্রাণ 
থাকি সদা ম্রিয়মাণ; 
শক্তি মরে ভীতির কবলে, 
পাছে লোকে কিছু বলে। 

Tuesday, February 12, 2019

শিক্ষকের মর্যাদা - কাজী কাদের নেওয়াজ

বাদশাহ আলমগীর-
কুমারে তাঁহার পড়াইত এক মৌলভী দিল্লীর। 
একদা প্রভাতে গিয়া 
দেখেন বাদশাহ- শাহজাদা এক পাত্র হস্তে নিয়া 
ঢালিতেছে বারি গুরুর চরণে 
পুলকিত হৃদে আনত-নয়নে, 
শিক্ষক শুধু নিজ হাত দিয়া নিজেরি পায়ের ধুলি 
ধুয়ে মুছে সব করিছেন সাফ্ সঞ্চারি অঙ্গুলি। 
শিক্ষক মৌলভী 
ভাবিলেন আজি নিস্তার নাহি, যায় বুঝি তার সবি। 
দিল্লীপতির পুত্রের করে 
লইয়াছে পানি চরণের পরে, 
স্পর্ধার কাজ হেন অপরাধ কে করেছে কোন্ কালে! 
ভাবিতে ভাবিতে চিন্তার রেখা দেখা দিল তার ভালে। 
হঠাৎ কি ভাবি উঠি 
কহিলেন, আমি ভয় করি না'ক, যায় যাবে শির টুটি, 
শিক্ষক আমি শ্রেষ্ঠ সবার 
দিল্লীর পতি সে তো কোন্ ছার, 
ভয় করি না'ক, ধারি না'ক ধার, মনে আছে মোর বল, 
বাদশাহ্ শুধালে শাস্ত্রের কথা শুনাব অনর্গল। 
যায় যাবে প্রাণ তাহে, 
প্রাণের চেয়েও মান বড়, আমি বোঝাব শাহানশাহে। 

তার পরদিন প্রাতে 
বাদশাহর দূত শিক্ষকে ডেকে নিয়ে গেল কেল্লাতে। 
খাস কামরাতে যবে 
শিক্ষকে ডাকি বাদশা কহেন, ''শুনুন জনাব তবে, 
পুত্র আমার আপনার কাছে সৌজন্য কি কিছু শিখিয়াছে? 
বরং শিখেছে বেয়াদবি আর গুরুজনে অবহেলা, 
নহিলে সেদিন দেখিলাম যাহা স্বয়ং সকাল বেলা'' 
শিক্ষক কন-''জাহপানা, আমি বুঝিতে পারিনি হায়, 
কি কথা বলিতে আজিকে আমায় ডেকেছেন নিরালায়?'' 
বাদশাহ্ কহেন, ''সেদিন প্রভাতে দেখিলাম আমি দাঁড়ায়ে তফাতে 
নিজ হাতে যবে চরণ আপনি করেন প্রক্ষালন, 
পুত্র আমার জল ঢালি শুধু ভিজাইছে ও চরণ। 
নিজ হাতখানি আপনার পায়ে বুলাইয়া সযতনে 
ধুয়ে দিল না'ক কেন সে চরণ, স্মরি ব্যথা পাই মনে।'' 

উচ্ছ্বাস ভরে শিক্ষকে আজি দাঁড়ায়ে সগৌরবে 
কুর্ণিশ করি বাদশাহে তবে কহেন উচ্চরবে- 
''আজ হতে চির-উন্নত হল শিক্ষাগুরুর শির, 
সত্যই তুমি মহান উদার বাদশাহ্ আলমগীর।'' 


Please See this video:

Monday, January 21, 2019

খোকার সাধ - কাজী নজরুল ইসলাম

আমি হব সকাল বেলার পাখি
সবার আগে কুসুম-বাগে উঠব আমি ডাকি।

সূয্যিমামা জাগার আগে উঠব আমি জেগে,

'হয়নি সকাল, ঘুমো এখন'- মা বলবেন রেগে।
বলব আমি, 'আলসে মেয়ে ঘুমিয়ে তুমি থাক,
হয়নি সকাল তাই বলে কি সকাল হবে নাকো!
আমরা যদি না জাগি মা কেমনে সকাল হবে?
তোমার ছেলে উঠলে গো মা রাত পোহাবে তবে!'
ঊষা দিদির ওঠার আগে উঠব পাহাড় চূড়ে,
দেখব নিচে ঘুমায় শহর শীতের কাঁথা মুড়ে,
ঘুমায় সাগর বালুচরে নদীর মোহনায়,
বলব আমি 'ভোর হল যে, সাগর ছুটে আয়!
ঝর্ণা মাসি বলবে হাসি', 'খোকন এলি নাকি?'
বলব আমি নইকো খোকন, ঘুম-জাগানো পাখি!'
ফুলের বনে ফুল ফোটাব, অন্ধকারে আলো,
সূয্যিমামা বলবে উঠে, 'খোকন, ছিলে ভাল?'
বলব 'মামা, কথা কওয়ার নাইকো সময় আর,
তোমার আলোর রথ চালিয়ে ভাঙ ঘুমের দ্বার।'
রবির আগে চলব আমি ঘুম-ভাঙা গান গেয়ে,
জাগবে সাগর, পাহাড় নদী, ঘুমের ছেলেমেয়ে!

Please see this video:

Thursday, January 17, 2019

সবার আমি ছাত্র - সুনির্মল বসু

সবার আমি ছাত্র

- সুনির্মল বসু

আকাশ আমায় শিক্ষা দিল 
উদার হতে ভাই রে, 
কর্মী হবার মন্ত্র আমি 
বায়ুর কাছে পাই রে। 
পাহাড় শিখায় তাহার সমান- 
হই যেন ভাই মৌন-মহান, 
খোলা মাঠের উপদেশে- 
দিল-খোলা হই তাই রে। 
সূর্য আমায় মন্ত্রণা দেয় 
আপন তেজে জ্বলতে, 
চাঁদ শিখাল হাসতে মোরে, 
মধুর কথা বলতে। 
ইঙ্গিতে তার শিখায় সাগর- 
অন্তর হোক রত্ন-আকর; 
নদীর কাছে শিক্ষা পেলাম 
আপন বেগে চলতে। 
মাটির কাছে সহিষ্ণুতা 
পেলাম আমি শিক্ষা, 
আপন কাজে কঠোর হতে 
পাষান দিল দীক্ষা। 
ঝরনা তাহার সহজ গানে, 
গান জাগাল আমার প্রাণে; 
শ্যাম বনানী সরসতা 
আমায় দিল ভিক্ষা। 
বিশ্বজোড়া পাঠশালা মোর, 
সবার আমি ছাত্র, 
নানান ভাবে নতুন জিনিস 
শিখছি দিবারাত্র। 
এই পৃথিবীর বিরাট খাতায়, 
পাঠ্য যেসব পাতায় পাতায় 
শিখছি সে সব কৌতূহলে, 
নেই দ্বিধা লেশমাত্র। 

Saturday, January 12, 2019

আমার পণ - মদনমোহন তর্কালঙ্কার

আমার পণ

- মদনমোহন তর্কালঙ্কার


সকালে উঠিয়া আমি মনে মনে বলি,
সারাদিন আমি যেন ভাল হয়ে চলি।
আদেশ করেন যাহা মোর গুরুজনে,
আমি যেন সেই কাজ করি ভাল মনে।
ভাইবোন সকলেরে যেন ভালবাসি,
এক সাথে থাকি যেন সবে মিলেমিশি।
ভাল ছেলেদের সাথে মিশে করি খেলা,
পাঠের সময় যেন নাহি করি হেলা।
সুখী যেন নাহি হই আর কারো দুখে,
মিছে কথা কভু যেন নাহি আসে মুখে।
সাবধানে যেন লোভ সামলিয়ে থাকি,
কিছুতে কাহারে যেন নাহি দেই ফাঁকি।
ঝগড়া না করি যেন কভু কারো সনে
সকালে উঠিয়া এই বলি মনে মনে।

তুলনা - শেখ ফজলুল করিম

তুলনা

 -  শেখ ফজলুল করিম
সাত শত ক্রোশ করিয়া ভ্রমণ জ্ঞানীর অন্বেষণে, 
সহসা একদা পেল সে প্রবীণ কোনো এক মহাজনে। 
শুধাল, ''হে জ্ঞানী! আকাশের চেয়ে উচ্চতা বেশি কার?'' 
জ্ঞানী বলে, ''বাছা, সত্যের চেয়ে উঁচু নাহি কিছু আর।'' 
পুনঃ সে কহিল, ''পৃথিবীর চেয়ে ওজনে ভারী কি আছে?'' 
জ্ঞানী বলে, ''বাছা, নিষ্পাপ জনে দোষারোপ করা মিছে।'' 
জিজ্ঞাসে পুনঃ, ''পাথরের চেয়ে কি আছে অধিক শক্ত?'' 
জ্ঞানী বলে, ''বাছা, সেই যে হৃদয় জগদীশ-প্রেম-ভক্ত।'' 
কহিল আবার, ''অনলের চেয়ে উত্তাপ বেশি কার?'' 
জ্ঞানী বলে, ''বাছা, ঈর্ষার কাছে বহ্নিতাপও ছার।'' 
পুছিল পথিক, ''বরফের চেয়ে শীতল কি কিছু নাই?'' 
জ্ঞানী বলে, ''বাছা স্বজন-বিমুখ হৃদয় যে ঠিক তাই।'' 
শুধাল সে জন, ''সাগর হইতে কে বেশি ধনবান?'' 
জ্ঞানী বলে, ''বাছা, তুষ্ট হৃদয় তারো চেয়ে গরীয়ান।'' 

Tuesday, January 8, 2019

এক আল্লাহ জিন্দাবাদ - - কাজী নজরুল ইসলাম


এক আল্লাহ জিন্দাবাদ
 - কাজী নজরুল ইসলাম


উহারা প্রচার করুক হিংসা বিদ্বেষ আর নিন্দাবাদ; 
আমরা বলিব সাম্য শান্তি এক আল্লাহ জিন্দাবাদ। 
উহারা চাহুক সংকীর্ণতা, পায়রার খোপ, ডোবার ক্লেদ, 
আমরা চাহিব উদার আকাশ, নিত্য আলোক, প্রেম অভেদ। 

উহারা চাহুক দাসের জীবন, আমরা শহীদি দরজা চাই; 
নিত্য মৃত্যু-ভীত ওরা, মোরা মৃত্যু কোথায় খুঁজে বেড়াই! 
ওরা মরিবেনা, যুদ্ব বাধিঁলে ওরা লুকাইবে কচুবনে, 
দন্তনখরহীন ওরা তবু কোলাহল করে অঙ্গনে। 

ওরা নির্জীব; জিব নাড়ে তবু শুধূ স্বার্থ ও লোভবশে, 
ওরা জিন, প্রেত, যজ্ঞ, উহারা লালসার পাঁকে মুখ ঘষে। 
মোরা বাংলার নব যৌবন,মৃত্যুর সাথে সন্তরী, 
উহাদের ভাবি মাছি পিপীলিকা, মারি না ক তাই দয়া করি। 

মানুষের অনাগত কল্যাণে উহারা চির অবিশ্বাসী, 
অবিশ্বাসীরাই শয়তানী-চেলা ভ্রান্ত-দ্রষ্টা ভুল-ভাষী। 
ওরা বলে, হবে নাস্তিক সব মানুষ, করিবে হানাহানি। 
মোরা বলি, হবে আস্তিক, হবে আল্লাহ মানুষে জানাজানি। 

উহারা চাহুক অশান্তি; মোরা চাহিব ক্ষমাও প্রেম তাহার, 
ভূতেরা চাহুক গোর ও শ্মশান, আমরা চাহিব গুলবাহার! 
আজি পশ্চিম পৃথিবীতে তাঁর ভীষণ শাস্তি হেরি মানব 
ফিরিবে ভোগের পথ ভয়ে, চাহিবে শান্তি কাম্য সব। 

হুতুম প্যাচারা কহিছে কোটরে, হইবেনা আর সূর্যোদয়, 
কাকে আর তাকে ঠোকরাইবেনা, হোক তার নখ চষ্ণু ক্ষয়। 
বিশ্বাসী কভু বলেনা এ কথা, তারা আলো চায়, চাহে জ্যোতি; 
তারা চাহে না ক এই উৎপীড়ন এই অশান্তি দূর্গতি। 

তারা বলে, যদি প্রার্থনা মোরা করি তাঁর কাছে এক সাথে, 
নিত্য ঈদের আনন্দ তিনি দিবেন ধুলির দুনিয়াতে। 
সাত আসমান হতে তারা সাত-রঙা রামধনু আনিতে চায়, 
আল্লা নিত্য মহাদানী প্রভূ, যে যাহা চায়, সে তাহা পায়। 

যারা অশান্তি দুর্গতি চাহে, তারা তাই পাবে, দেখো রে ভাই, 
উহারা চলুক উহাদের পথে, আমাদের পথে আমরা যাই। 
ওরা চাহে রাক্ষসের রাজ্য, মেরা আল্লার রাজ্য চাই, 
দ্বন্দ্ব-বিহীন আনন্দ-লীলা এই পৃথিবীতে হবে সদাই। 

মোদের অভাব রবে না কিছুই, নিত্যপূর্ণ প্রভূ মোদের, 
শকুন শিবার মত কাড়াকাড়ি করে শবে লয়ে-- শখ ওদের! 
আল্লা রক্ষা করুন মোদেরে, ও পথে যেন না যাই কভূ, 
নিত্য পরম-সুন্দর এক আল্লাহ্ আমাদের প্রভূ। 

পৃথিবীতে যত মন্দ আছে তা ভালো হোক, ভালো হোক ভালো, 
এই বিদ্বেষ-আঁধার দুনিয়া তাঁর প্রেমে আলো হোক, আলো। 
সব মালিন্য দূর হয়ে যাক সব মানুষের মন হতে, 
তাঁহার আলোক প্রতিভাত হোক এই ঘরে ঘরে পথে পথে। 

দাঙ্গা বাঁধায়ে লুট করে যারা, তার লোভী, তারা গুন্ডাদল 
তারা দেখিবেনা আল্লাহর পথ চিরনির্ভয় সুনির্মল। 
ওরা নিশিদিন মন্দ চায়, ওরা নিশিদিন দ্বন্দ চায়, 
ভূতেরা শ্রীহীন ছন্দ চায়, গলিত শবের গন্ধ চায়! 

তাড়াবে এদের দেশ হতে মেরে আল্লার অনাগত সেনা, 
এরাই বৈশ্য, ফসল শৈস্য লুটে খায়, এরা চির চেনা। 
ওরা মাকড়সা, ওদের ঘরের ঘেরোয়াতে কভু যেয়ো না কেউ, 
পর ঘরে থাকে জাল পেতে, ওরা দেখেনি প্রাণের সাগর ঢেউ। 

বিশ্বাস করো এক আল্লাতে প্রতি নিঃশ্বাসে দিনে রাতে, 
হবে দুলদুল - আসওয়ার পাবে আল্লার তলোয়ার হাতে। 
আলস্য আর জড়তায় যারা ঘুমাইতে চাহে রাত্রিদিন, 
তাহারা চাহে না চাঁদ ও সূর্য্য, তারা জড় জীব গ্লানি-মলিন। 

নিত্য সজীব যৌবন যার, এস এস সেই নৌ-জোয়ান 
সর্ব-ক্লৈব্য করিয়াছে দূর তোমাদেরই চির আত্বদান! 
ওরা কাদা ছুড়ে বাঁধা দেবে ভাবে - ওদের অস্ত্র নিন্দাবাদ, 
মোরা ফুল ছড়ে মারিব ওদের, বলিব - "এক আল্লাহ জিন্দাবাদ"।