Showing posts with label কবিতা বিষয়ক প্রবন্ধ. Show all posts
Showing posts with label কবিতা বিষয়ক প্রবন্ধ. Show all posts

Tuesday, March 26, 2019

নীতি-কবিতা : বাংলা কবিতার হারিয়ে যাওয়া সম্পদ

- মু হা ম্মা দ হা বী বু ল্লা হ 


            এক সমাজব্যবস্থা থেকে অন্যতর ও উন্নততর সমাজব্যবস্থার দিকে অভিযাত্রা এবং কালো সভ্যতা থেকে ভালো সভ্যতা অভিমুখে যাত্রার জন্যই নানা কালপর্বে নৈতিক বাণী, লোকধর্ম, ধর্ম, দর্শন, দর্শনজাত রাজনৈতিক আদর্শ ও মতাদর্শের সৃষ্টি। যুগ-যুগান্তরে নীতির জন্ম হয় মানবসমাজ ও সমাজজীবনের অভিজ্ঞতার পরিণতি থেকে, পরিণতি থেকে অর্জিত শিক্ষার পথ ধরে। ব্যক্তির জন্ম হয় নীতির ওপর, কিছুটা বেড়েও ওঠে সে নীতির ওপর। কিন্তু পরে বিকশিত হওয়ার পথে, বিশেষ করে দ্বান্দ্বরক্তিম আধুনিক জীবনে নীতিকে বিশাল বাধা মনে করে। প্রতিটি মানুষের ভেতরে কোনো না কোনোভাবে, জীবনের কোনো না কোনো কালপর্বে, নীতিবোধ, নীতিভাবনা, নীতিগ্রহণ ও নীতিপ্রচারের তাড়না এবং প্রেরণা থাকে। নীতিবোধ ও নীতিভাবনা প্রত্যেক মানুষের ভেতর, বোধহয়, জীবিত ও জাগ্রত থাকে আজীবন। কিন্তু নীতিগ্রহণ ও নীতিপ্রচারের প্রবণতা থাকে না বেশিদিন। প্রত্যেক ব্যক্তির নীতিবোধ ও নীতিভাবনা শক্তিতে-স্বচ্ছতায় এক ও সমগোত্রীয় নয়। মানুষের মনের গভীর প্রকোষ্ঠে নীতিবোধ ও আধ্যাত্মিকতাবোধ পথসঙ্গী হয়ে চলাচল করে। একটি সূক্ষ্ম-সুগভীর অধ্যাত্মবোধ ছাড়া শিল্পচর্চা হয়ে ওঠে না। বিশেষ করে ললিতকলার উপাসনা হয় না। কারণ, সূক্ষ্ম রসানুভূতির পথ ধরেই মানুষের মধ্যে শিল্পসৃষ্টির প্রয়াস ও প্রেরণা জেগেছিল একদিন; এখনও জাগে; জাগবেও চিরদিন। ফলে শিল্পসাধককে—নিজের সঠিক পথটিতে চলার জন্য অধ্যাত্মসাধক হতেই হয়। আধ্যাত্মিকতার আদর্শ যে গ্রহণ করে না এবং অধ্যাত্মবোধ (ব্যাপকার্থে; কোনো বিশেষ ইজমের দৃষ্টিকোণ থেকে নয়) যার ভেতর জাগ্রত হয়নি, তার জন্য ললিতকলা চর্চা করতে যাওয়া এক ধরনের কষ্টকল্পনা ও বিড়ম্বনা। কারণ জীবনকে বা পুরো জগতকে অধ্যাত্মভাব ও বোধ নিয়ে দেখলেই সবকিছুর মধ্যে একটা সূক্ষ্ম রসঘন সত্তা অনুভব করা যায়। আর এ সত্তাকে যিনি যত বেশি উপলব্ধি করতে পারেন, তিনি কথাস্রষ্টা হিসেবে তত বেশি সার্থক। এই নীতিবোধের কারণেই সমইজমের মানুষরাও একসময় পরস্পর পৃথক হয়ে যায়, ভিন্ন পথে ও মতে পা বাড়ায়। প্রত্যেকে চলে যে যার পথে। শুরু হয় তর্ক। নীতি-নৈতিকতাহীন জীবনের চেয়ে জড় হওয়াকে ভালো মনে করেছেন অনেকে। তাই বাহাদুর শাহ্ জাফরের কবিতায় অভিমান অভিনীত হয় এভাবে : ‘মানুষ হইয়া হ’ল না যখন মানুষের মত মন/ভাল হ’ত যদি হয়ে জড়মতি রহিতাম আমরণ’ (অনুবাদ : সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত)। 

          কাব্যসাহিত্য বিষয়ে ও আঙ্গিকে বহুশাখায়িত। তার শাখাসমূহের অন্যতম হলো নীতি-কবিতা। আধুনিকতার দুর্দম দাপটে মানুষের জীবন ও জীবনের সবকিছু এখন সংজ্ঞাহীন-প্রজ্ঞাহীন। মানুষ আজ সংজ্ঞার ছকে ফেলে কোনো কিছুকে বুঝতে চেষ্টা করে না এবং বোঝানোর চেষ্টা করা হলে সে বিরক্ত হয়। তথাকথিত অচলায়তন বা বৃত্ত ভাঙার যুদ্ধে এখন সবাই মত্ত। সুতরাং নীতি-কবিতার তাত্ত্বিক, ঐতিহাসিক ও একাডেমিক সংজ্ঞার পথ ধরে না এগিয়েও আমরা বলতে পারি—গল্প, কাহিনী, কাহিনী-খণ্ড বা নিছক কলাশিল্পের মাধ্যমে কবি জ্ঞানগর্ভ নীতিকথা বা তত্ত্বকথা প্রচার করে থাকেন। এজাতীয় কবিতাকে নীতি-কবিতা বলা যায়। তবে জ্ঞানের কথা, নীতির কথা বা তত্ত্বকথা কাব্য-সুষমায় মণ্ডিত হতে হবে। তা না হলে এ ধরনের কবিতা ব্যর্থ হতে বাধ্য। নীতি-কবিতায় কখনও প্রত্যক্ষভাবে, কখনও পরোক্ষভাবে কিংবা রূপক-প্রতীকের আশ্রয়ে মানবসমাজের কল্যাণার্থে আদেশ-উপদেশ বা নীতিকথা প্রকাশিত হয়। তবে মনে রাখতে হবে, উপদেশকথা ও নীতিকথার বিবরণ মানেই কবিতা নয়। অসাধারণ বাণীবদ্ধ কথামালাও সবসময় কবিতা হয়ে উঠতে পারে না। দেহসৌষ্ঠবের লাবণ্যের অন্তরালে প্রাণৈশ্বর্যপূর্ণ একটি আত্মাও থাকতে হয় কবিতায়। আত্মার প্রাণপ্রাচুর্যের মধ্যেই মূর্ত হয়ে ওঠে কবিতার রমণীয়তা, রসময়তা ও রহস্যময়তার সৌন্দর্য। ব্যক্তি এবং সেই সূত্রে পুরো সমাজ নিজের ত্রুটি-বিচ্যুতি ও নৈতিক কদাচারের সংশোধনের লক্ষ্যে অনুশাসনতুল্য পথনির্দেশক বাণী বা উপদেশকে বুকে নিয়ে এ জাতীয় কবিতার জন্ম। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ধর্ম, ধর্মগ্রন্থ ও ধর্মগ্রন্থে মূল মর্ম আলোচনা করলে দেখা যাবে, বিশ্বের মানুষকে শুদ্ধ মানুষ হিসেবে, সর্বোপরি সুনাগরিক ও সভ্যরূপে গড়ে তোলার জন্য নবী-রাসুল, শ্রেষ্ঠ মনীষী ও মহাপুরুষদের বাণী, বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থ, শিক্ষণীয় কাহিনীর আদর্শ, সেই সঙ্গে সাধারণ নীতিগ্রন্থ ও প্রবাদ-প্রবচন প্রবল শক্তি ও মন্ত্র হিসেবে কাজ করেছে। সেই সূত্র ধরে পরবর্তী যুগে নীতি-কবিতা বা উপদেশমূলক কবিতার উদ্ভব ও বিকাশ। ফলে কাব্যসাহিত্যের এই শাখাটির শক্তি উল্লখযোগ্যভাবে কার্যকর। তা না হলে প্রাচীন যুগ থেকে অদ্যাবধি বিশ্বের সকল দেশে ও সাহিত্যের তার গৌরবদীপ্ত প্রচলন এবং ভূমিকা থাকত না। আজকে যে আমরা বাউল ও মরমী দানের প্রতি শিক্ষিত সমাজের কৌতূহল দেখতে পাই, তারও মূলে রয়েছে নীতি-কবিতা প্রচলনের ভূমিকা। 

           শিল্পের সংস্থিতি উপেক্ষা করলে মানুষের কাছে পৌঁছুতে পারে না কোনো কবিতা। আর মানুষের কাছে পৌঁছুতে না পারলে কবিতা রচনা ব্যর্থ। পাঠকের মনে যদি কবিতা কিছু সঞ্চার না করে, তা হলে সে করবেটা কী? বলা হয়ে থাকে, পৌঁছানোর জিনিসটা কেবলই রূপনির্ভর। কিন্তু ভুললে চলবে না, রূপেরও তো একটা ঈপ্সিত ছাপ বা ভাব থাকে, যা কবি এঁকে দিতে চান পাঠককুলের হৃদয়-গভীরে। সেটি কি একরকম বোঝানোর কাজ নয়? ভাবা বা ছাপ যা কবি এঁকে দিতে চান, সেটা অবশ্যি একান্ত কবিরই; পাঠক যদি ঠিক তা ধরতে না পারেন, তাতে কিছু যায়-আসে না। কিন্তু পাঠকরা যদি আকৃষ্ট ও প্রাণিত না হন, তাদের বোধের তলদেশ যদি দুলে না ওঠে চেনা-অচেনা কোনো বোধের তরঙ্গে, তা হলে ওই কবিতা কি ব্যর্থ নয়? এই যে কিছু সঞ্চার করা এবং বোধের তরঙ্গে তলদেশ দুলে ওঠা—এটা সবচেয়ে বেশি হয় নীতি-কবিতায়। হয় কেন? এজাতীয় কবিতায় প্রত্যেক ব্যক্তির হৃদয়ের ব্যাখ্যা ও অনুবাদ হয় বলে, ভাষা ও বর্ণনা ঝরঝরে নির্ভার হয় বলে এবং ছন্দের সুরেলা ঝঙ্কার পাঠকের হৃদয়কে নাচিয়ে তুলে বলে। কবিতার একদল সমালোচক সেই আদিকাল থেকেই বলে আসছেন, কবিতাকে আনন্দ দিতে হবে, আবার উপদেশও দিতে হবে। কবিতা থেকে কোনো একরকম নৈতিক সহায়তা পাওয়া আকাঙ্ক্ষাটা একসময় মানুষের মজ্জাগত ছিল। কিন্তু পরে অন্যায়ভাবে তাকে আপন নিবাস থেকে গলা ধাক্কা দিয়ে বের করে দেয়া হয়েছে। বলা হয়ে থাকে, ‘কবিতার কাজ হচ্ছে খুলে দেখানো, শেখানো নয়’। কিন্তু কেন? তার কাজ তো একই সঙ্গে খুলে দেখানো এবং শেখানোও। ব্যক্তি মানুষের হৃদয়ানুভূতি যেমন নিজে উপভোগ করার মতো, তেমনি তা অপরের ভেতর সঞ্চার ও শেয়ার করার মতোও। শুধু সৃষ্টি করলে কী হবে? সরবরাহও তো করতে হবে। কবিমাত্র মানবের মাঝে শাশ্বত জীবনবোধ নিয়ে বেঁচে থাকতে চান। তাঁর বোধ ও ভাবনার রাজ্যে দিবারাত যে সংক্রমণ, তা তিনি চালিয়ে দিতে চান সবার মাঝে। তাই তার ব্যক্তিক অনুভূতি হয়ে ওঠে সবার অনুভূতি। কবিতা কোনোমতেই ধর্ম নয়; আবার ধর্মকথাদীপ্ত কবিতাও অকবিতা নয়। কবিতা যা দিতে পারে, তার কাছে তার চেয়ে বেশি চাওয়াটা ঠিক নয়, আবার যা দিতে পারে, তা ফিরিয়ে দেয়াও যৌক্তিক নয়। কবিতা শুধু মলমের কাজ না, মহৌষধের কাজও করে। কবিতাকে প্রচার করতে হয় না ধর্মতত্ত্ব ও নীতিকথা। কিন্তু এগুলো প্রচার করলেও মহাভারত অশুদ্ধ হয় না। কবিতা মানুষকে সচেতন করে, সজীব করে—এমনকি তাদের আমূল পরিবর্তনও করতে পারে। যেমন পারে ধর্ম ও নীতি। 


            গবেষকরা বলেছেন, বাংলাসাহিত্যে নীতি-কবিতার জন্ম হয় মধ্যযুগে। ওই সময় ভারতজুড়ে নানা পরিবর্তন, আন্দোলন, দ্বন্দ্ব-সংঘাত ও যুদ্ধবিগ্রহ। মানুষের মূল্যবোধ তখন সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত। চারিত্রিক শুদ্ধচারিতা বলতে গেলে শূন্যের কোঠায়। ঠিক ওই সময় নানা নৈতিক উপদেশ ও নীতিকথা কাব্যের আদলে অভিব্যক্ত হয়। তবে তখন নীতি-কবিতার আঙ্গিকরীতি নিয়ে তেমন কোনো পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়নি, তাতে তেমন আধুনিকতার ছোঁয়া লাগেনি। ঊনবিংশ শতাব্দী থেকেই মূলত আধুনিক আঙ্গিকে বাংলাসাহিত্যে নীতি-কবিতার ব্যাপক-বিচিত্র প্রকাশ ও প্রসার ঘটেছে। বাংলা নীতি-কবিতা যাদের চর্চায়-পরিচর্যায় ও সচেতন প্রয়াসে সমৃদ্ধ হয়েছে, তাদের মধ্যে ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত (১৮১২-১৮৫৯), কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদার (১৮৩৭-১৯০৭), রবীন্দ্রনাথ (১৮৬১-১৯৪১), কামিনী রায় (১৮৬৪-১৯৩৩), রজনীকান্ত সেন (১৮৬৫-১৯১০), সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত (১৮৮২-১৯২২), শেখ ফজলুল করীম (১৮৮২-১৯৩৬), ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ (১৮৮৫-১৯৬৯), সুকুমার রায় (১৮৮৭-১৯২৩), ডা. লুতফর রহমান (১৮৮৯-১৯৩৬), শেখ হবিবর রহমান (১৮৯১-১৯৬২), গোলাম মোস্তফা (১৮৯৭-১৯৬৪), আবদুল কাদির (১৯০৬-১৯৮৪), বন্দে আলী মিয়া (১৯০৬-১৯৭৯), কাজী কাদের নেওয়াজ (১৯০৯-১৯৮৩), ফররুখ আহমদ (১৯১৮-১৯৭৪) প্রমুখ উল্লেখযোগ্য। কবিদের মধ্যে কেউ কেউ নীতি-কবিতা-রচনার প্রতি এত বেশি ঝুঁকেছিলেন যে, তাদের একাধিক স্বতন্ত্র গ্রন্থ আছে নীতি-কবিতা নিয়ে। যেমন—রজনীকান্ত সেন। তার দু’টি স্বতন্ত্র কাব্যগ্রন্থ রয়েছে শুধু নীতি-কবিতা নিয়ে। তাঁর তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘অমৃত’ আটচল্লিশটি কবিতা নিয়ে প্রকাশিত হয় ১৯১০ সালে এবং ১৯১৩ সালে প্রকাশিত হয় ‘সদ্ভাব কুসুম’। কিন্তু দুঃখের বিষয়, বাংলাকাব্যের এই ঐতিহ্যধন্য ধারাটি ক্রমনিম্নগামী হয়ে এক সময় হারিয়ে গেছে। খোদাবন্দনা ও রাসুলপ্রশস্তির ধারাটি, যদিও নিভু নিভু অবস্থায় কোনোরকম টিকে আছে। কিন্তু নীতি-কবিতার ধারাটি একেবারে হারিয়ে গেছে বললেও চলে। বিংশ শতাব্দীর ষাটের দশকের পর থেকে নীতি-কবিতা-রচনার প্রয়াস তেমন লক্ষ্য করা যায়নি। এখন নীতি-কবিতার নিরাপদ আশ্রয় বলতে শুধু কয়েকখানা পাঠ্যবইয়ের পৃষ্ঠা। সেখানেও আবার কর্তন-বিয়োগের আজব খেলা। সেই শৈশবে যে পড়েছিলাম ‘এই করিনু পণ মোরা/এই করিনু পণ ফুলের মত গড়ব মোরা মোদের এই জীবন’ কিংবা ‘সকালে উঠিয়া আমি মনে মনে বলি/সারাদিন আমি যেন ভালো হয়ে চলি’—এগুলো এখন আর দেখা যায় না। অথচ একথা সবাই মানবেন যে, সার্বিক নীতিভ্রষ্ট ও নীতিশূন্যতার এ কালিমাচ্ছন্ন সময়ে নীতি-কবিতারই প্রবল প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। যাতে ব্যক্তিতে, সমাজে, বিশেষ করে আমাদের সমাজের তরুণ ও কিশোরদের মাঝে নৈতিকতার নতুন জাগরণ সূচিত হয়। আশার কথা হলো, বিদ্বত্সমাজ এই কবিতাসত্তাকে একেবারে ভুলে যাননি। অন্তত ক্ষুদ্রকায় কিছু সঙ্কলন বের করে হলেও তাকে স্মরণ রেখেছেন। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রকে ধন্যবাদ দিতে হয়। এই প্রতিষ্ঠানটি ‘বাংলাসাহিত্যের সেরা উপদেশমূলক কবিতা’ নামে একটি সঙ্কলন বের করে ১৯৯০ সালে। সেটির দ্বিতীয় সংস্করণও বের হয় ২০০০ সালে। কিন্তু বাংলাসাহিত্যের নীতি-কবিতার সমাদরপূর্ণ সংখ্যাধিক্যের তুলনায় সঙ্কলনটি খুবই ক্ষুদ্র ও ক্ষীণকায়। মাত্র পঞ্চান্ন পৃষ্ঠার বইটিতে আটত্রিশজন কবির মোট একশ’ চারটি কবিতা স্থান পেয়েছে। সেই সঙ্গে ‘বাঙালি-স্বভাব’ সুলভ অযত্ন ও অনুসন্ধিত্সার অভাবও সৃস্পষ্ট। নীতি-কবিতা বা উপদেশমূলক কবিতার সঙ্কলন থেকে গোলাম মোস্তফা (১৮৯৭১৯৬৪), আবদুল কাদির (১৯০৬-১৯৮৪), বন্দে আলী মিয়া (১৯০৬-১৯৭৯) ও কাজী কাদের নেওয়াজ (১৯০৯-১৯৮৩) কেন বাদ পড়েছেন, সেটা বিস্ময়ের ব্যাপার। অথচ এখনও গোলাম মোস্তফার ‘কিশোর’, আবদুল কাদিরের ‘মানুষের সেবা’ ও মৈত্রী’, বন্দে আলী মিয়ার ‘আমাদের গ্রাম’, কাজী কাদের নেওয়াজের ‘শিক্ষকের মর্যাদা’ ও ‘মা’ পাঠ্যবইয়ের অন্তর্ভুক্ত। এছাড়াও এঁদের আরও একাধিক নীতি-কবিতা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে তাঁদের কাব্যসম্ভরে। নীতি-কবিতার নানাকৌণিক রূপ-গুণ ও অবদানের ফলে কিছু কিছু কবিতা প্রবাদ-প্রবচন ও কিংবদন্তিতে পরিণত হয়েছে। সেগুলো এখনও মানুষের জিহ্বায় নেচে ওঠে, দুলিয়ে দেয় হৃদয়ের রুমাল। যেমন ধরা যাক— আপনাকে বড় বলে বড় সেই নয়/লোকে যারে বড় বলে বড় সেই হয়। চিরসুখী জন/ভ্রমে কি কখন/ব্যথিত বেদন বুঝিতে পারে? কী যাতনা বিষে/বুঝিবে সে কিসে/কভু আশী বিষে দংশেনি যারে। যে জন দিবসে/মনের হরষে/জ্বালায় মোমের বাতি/আশু গৃহে তার/দেখিবে না আর/নিশিতে প্রদীপ ভাতি। (কৃষ্ণকুমার মজুমদার) পারিব না এ কথাটি বলিও না আর/কেন পারিবে না তাহা ভাবো একবার। (কালীপ্রসন্ন ঘোষ) আপনারে লয়ে বিব্রত রহিতে/আসে নাই কেহ অবনী ‘পরে/ সকলের তরে সকলে আমরা/প্রত্যেকে মোরা পরের তরে। (কামিনী রায়) বাবুই হাসিয়া কহে, ‘সন্দেহ কি তায়?/কষ্ট পাই, তবু থাকি নিজের বাসায়,/পাকা হোক, তবু ভাই, পরের ও বাসা/নিজের হাতে গড়া মোর কাঁচাঘর খাসা। (রজনীকান্ত সেন) আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে/কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হবে/মুখে হাসি বুকে বল তেজে ভরা মন/মানুষ হইতে হবে এই তার পণ/বিপদ আসিলে কাছে হয় আগুয়ান/নাহি কি শরীরে তার রক্ত মাংস প্রাণ? (কুসুমকুমারী দাশ) ‘দাঁত আছে বলে কুকুরের গায়ে দংশি কেমন করে/কুকুরের কাজ কুকুর করেছে কামড় দিয়ে পায়,/তা’ বলে কুকুরে কামড়ানো কি রে মানুষের শোভা পায়?’ (সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত অনূদিত, মূল শেখ সাদী) গোলাপে ছিঁড়িয়া কেহ কি পেরেছে হাসি তার কেড়ে নিতে?/ধুলায় পড়েও হাসি ফোটে তার পাপড়িতে পাপড়িতে! (সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত অনূদিত, মূল, জালালুদ্দীন রুমী)।  Source: Daily Amardesh


Friday, March 22, 2019

জসীম উদ্দীন — আধুনিক কবি



- তি তা স চৌ ধু রী

    কবি জসীম উদ্দীনের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে কবিতার একটি ধারার পরিসমাপ্তি ঘটে। জসীম উদ্দীনই ছিলেন সেই ধারার শেষ প্রতিনিধি। ১৪ মার্চ, ১৯৭৬ খ্রিস্টাব্দে জসীম উদ্দীন এই রৌদ্রছায়াময় পৃথিবী থেকে প্রস্থান করেন। জসীম উদ্দীন সেদিন শেষ রাতেই পরলোকে যাত্রা করেছিলেন। সে জন্য তাঁর মহাপ্রয়াণ সংবাদ আমি আমার এক ছাত্র মারফত সকালে জানতে পারি। পরে রেডিওতে শুনি। কবির মৃত্যু সংবাদে সেদিন অত্যন্ত কষ্ট পেয়েছিলাম। কারণ মৃত্যুর কয়েক দিন আগেই তিনি কুমিল্লায় এসেছিলেন অলক্তের আমন্ত্রণে। তিনি প্রায় ষাট ঘণ্টার মতো কুমিল্লায় ছিলেন। এই সময়ে আমার বাসাটি তীর্থক্ষেত্রে পরিণত হয়েছিল।
    সারা দিনরাত শুধু মানুষ আর মানুষ। কবিকে এক নজর দেখতে এসেছিলেন। কাউকে তো ‘না’ করা যায় না—পেছনে কবি আবার অসন্তুষ্ট হন। জসীম উদ্দীন যে কতটা জনপ্রিয় ছিলেন, আমি সেদিনই তা টের পাই। শুধু শিক্ষিত নন, অশিক্ষিত-অর্ধশিক্ষিত—এমন বহু মানুষ কবিকে দেখতে এসেছিলেন। বোধ করি এই শিক্ষিত-অশিক্ষিত সব মানুষই কবিকে একদিন ‘পল্লীকবি’ খেতাবে ভূষিত করেছিলেন এবং কবিও তা সাদরে গ্রহণ করেছিলেন। জীবনের শেষদিকে কবি তাঁর নামের শেষে ‘পল্লীকবি’ শিরোপাটি জুড়ে দিতেন। কারণ ওই সময়, কবি কথায় কিছু লেখকের উদয় হয়েছিল, যাঁরা জসীম উদ্দীন নামে পত্র-পত্রিকায় লিখতে শুরু করেছিলেন। কবির জসীম উদ্দীন তাই দেখেই গ্রামবাংলার জনগণের দেয়া খেতাব তিনি নামের শেষে জুড়ে দিয়েছিলেন। তাতে জসীম উদ্দীন থেকে অন্যরা অনায়াসেই পৃথক হয়ে গিয়েছিলেন। ‘পল্লীকবি’ জসীম উদ্দীন মানে এই নয় যে, তিনি পল্লীকবি ছিলেন।
    জসীম উদ্দীন ছিলেন বাংলার লোকায়ত সংস্কৃতির নির্ভরযোগ্য ও বিশ্বস্ত প্রতিনিধি। কেননা তিনিই একদিন দুঃসাহসিক অঙ্গীকার নিয়ে বলতে পেরেছিলেন—‘তোমার গেঁয়ো মাঠটি আমার মক্কা হেন স্থান।’ পল্লীদরদী না হলে এমত উচ্চারণ কারও পক্ষেই সম্ভব নয়। যে কথা বলছিলাম, জসীম উদ্দীন কি পল্লীকবি? বাস্তবে এর উত্তর হচ্ছে ‘না’। আমরা লক্ষ্য করেছি, এক শ্রেণীর গেঁয়ো কবি পল্লীর সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, আনন্দ-বিষাদ, প্রেম-বিরহ-যাতনা, লাঞ্ছনা ও গঞ্জনার চিত্র তুলে ধরেন অত্যন্ত অমার্জিত ভাষায় ও ছন্দে। কোনো কাহিনীর উদ্ভট রূপায়ণে কিংবা কোনো বিরহ উপাখ্যান নির্মাণে গেঁয়ো কবিরা জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন অতি সহজেই। এতে একদিকে যেমন থাকে শিল্প চেতনার অভাব—তেমনি অন্যদিকে রুচি, মননশীলতা ও রসোপযোগিতার দৈন্য। এ সত্ত্বেও, লোক জীবনে এগুলোর আদর ও কদর অল্প নয়। এগুলো অমার্জিত ও অশ্লীল হলেও এসব ‘কথাকাব্য’ সর্বত্র সমাদর লাভ করে। যেমন মধ্যযুগের চণ্ডীমঙ্গল কাব্য, কালিকা মঙ্গল কাব্য, পূর্ববঙ্গ গীতিকা, মৈমনসিংহ গীতিকা ইত্যাদি একই জাতের কাব্য পদবাচ্য। অবশ্য পূর্ববঙ্গ গীতিকা ও মৈমনসিংহ গীতিকা ‘কথাকাব্য’ হিসেবে প্রচুর সমাদর লাভ করেছে, সন্দেহ নেই।
    মোটকথা, এ ধরনের গীতিকা কিংবা কাব্যের রচয়িতাকে সাধারণত পল্লীকবি বা গেঁয়ো কবি হিসেবে অভিহিত করা হয়। তাহলে জসীম উদ্দীন কি এই অর্থে পল্লীকবি? জসীম উদ্দীন এ সংকীর্ণ অর্থে পল্লীকবি নন। কেননা জসীম উদ্দীনের নক্শী কাঁথার মাঠ, সোজন বাদিয়ার ঘাট, সকিনা কিংবা বেদের মেয়ে ইত্যাদির উপাদান-উপকরণ পল্লীতে পাওয়া গেলেও কোনো গৃহস্থ ঘরে এসব প্রাপ্তি রীতিমত দুঃসাধ্য। এছাড়া শিল্পসম্মত কাহিনী বুনন, কবিতার শব্দচয়ন, উপমা-উেপ্রক্ষা, চিত্রকল্প, প্রতীক ও রূপক নির্মাণে এ সত্য প্রমাণ করে না। রাখালী, কবর কিংবা পল্লীজননী যে কোনো একটি কবিতা নিয়ে ঘনিষ্ঠভাবে পরীক্ষা করলে দেখা যাবে—জসীম উদ্দীনের কবিতায় কিংবা কব্যোপন্যাসে আঞ্চলিক শব্দের ব্যবহার বড় একটা দেখা যায় না। যে দু’চারটি প্রয়োগ দৃষ্টিগোচর হয় তাও মার্জিত এবং কুশলী হস্তে ব্যবহৃত। সুতরাং জসীম উদ্দীনে একজন পল্লীকবির চরিত্র ও চারিত্র্য মোটেও ধরা পড়ে না। যদিও বলা হয়ে থাকে, তাঁর মতো এমন ষোলআনা পল্লী দরদী কবি কোথাও খুঁজে পাওয়া যায় না। এর অর্থ এই নয় যে তিনি পল্লীকবি। বড়জোর ‘লোককবি’ বলা যায়। কারণ গ্রামজীবন ও পরিবেশ তাঁর কাব্যে উপাদান জুগিয়েছে এবং তাঁর কবিতা-কলাকুশলের মধ্যেও গ্রাম্য আবহকে আমরা মূর্ত হতে দেখি। কিন্তু তাই বলে তিনি গ্রাম্য কবি নন। তাঁর চারণ-উপমা-রূপক প্রয়োগে তিনি যথেষ্ট মুন্শীয়ানার পরিচয় দিয়েছেন।
    জসীম উদ্দীন আসলে আধুনিক কবি। কারণ তিনি যেসব উপমা ব্যবহার করেছেন সেগুলোর উপাদান গ্রাম থেকে সংগৃহীত হলেও এর ব্যাখ্যাসূত্র প্রধানত নাগরিক। আবু সয়ীদ আইয়ুব আধুনিক শব্দটির ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে বলেন, ‘এক হিসাবে যারাই আধুনিককালে কবিরূপে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছেন প্রতিভা ও সাধনার, যুগ্ম অধিকারে, তাঁরাই আধুনিক কবি যুগলক্ষণ অধিকৃত না হলেও। সুতরাং এ অর্থেও জসীম উদ্দীন আধুনিক কবি। অন্য পক্ষে ‘আধুনিক’ বাংলা কবিতার ভাব প্রকাশ ও আঙ্গিকে যাঁরা পরিবর্তন এনেছিলেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম কবি তিনি। শুধু গ্রামীণ কবি ছিলেন না। কাহিনী কাব্য, ছন্দ ও গীতিময়তায় তিনি বাংলা কাব্যের নয়াদিগন্ত উন্মোচন করেন। তাঁকে বাদ দিয়ে আধুনিক কবিতার কথা চিন্তা করা যায় না।
    তবে প্রশ্ন ওঠে, তিরিশ কিংবা তিরিশোত্তর কবিরা যে অর্থে আধুনিক, ছিলেন, জসীম উদ্দীন কি সে অর্থে আধুনিক? এর উত্তর হচ্ছে ‘না’। কেননা বুদ্ধদেব বসু ও আহসান হাবীব যে অর্থে আধুনিক, বিষ্ণু দে ও শামসুর রাহমান সে অর্থে আধুনিক নন। আবার জীবনানন্দ দাশ ও অমিয় চক্রবর্তী যে অর্থে আধুনিক, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত কিংবা প্রেমেন্দ্র মিত্র কিংবা সমর সেন সে অর্থে আধুনিক নন। বস্তুত আধুনিক শব্দটি জবষধঃরাব বা আপেক্ষিক। আধুনিকতা সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের উক্তি—‘আধুনিকতা সময় নিয়ে নয়, মর্জি নিয়ে।’ আবার জীবনানন্দ দাশ মনে করেন, ‘বাংলা কাব্যে কিংবা কোনো দেশের বিশিষ্ট কাব্যে আধুনিকতা শুধু আজকের কবিতায় আছে—অন্যত্র নয়, একথা ঠিক নয়।’ আবার কেউ বলেন, ‘কালের দিক থেকে মহাযুদ্ধ-পরবর্তী এবং ভাবের দিক থেকে রবীন্দ্র-প্রভাবমুক্ত অন্তত মুক্তিপিয়াসী কাব্যকেই আমরা আধুনিক কাব্য বলে গণ্য করেছি।’ সুতরাং এসব অভিধায়ও জসীম উদ্দীন আধুনিক কবি।
    তাঁর প্রকৃত পরিচয়—তিনি পল্লীবোধ ও পল্লী ইমেজের কবি। এর কারণও এই যে, প্রকৃতি উত্সারিত স্বাভাবিক ও মৌলিক লোকজ ধারাটি তাঁর আগে আর কেউ তেমন সহজভাবে আধুনিক কাব্যধারার সঙ্গে এক করতে সক্ষম হননি। এটি জসীম উদ্দীনের পক্ষে সম্ভব হয়েছিল এজন্য যে, তিনি ছিলেন গ্রাম ও গ্রামবাংলার এক স্বাভাবিক অংশ। আর সেজন্যই তাঁর কবিতায় পল্লী প্রকৃতি, লোক জীবন ও লোক ঐতিহ্য অপূর্ব রূপলাভ করেছে।
    জসীম উদ্দীনের কাব্যে পল্লী প্রকৃতি যেভাবে উপমা-উেপ্রক্ষা, রূপক ও চিত্রকল্প তথা আধুনিক কবিতার লক্ষণযোগে ধরা দিয়েছে—সমগ্র বাংলা কাব্যে এর দৃষ্টান্ত খুব বেশি নেই। দু’তিনটি নজির এখানে খাড়া করি।
যেমন :
এই গাঁয়ের এক রাখাল ছেলে লম্বা মাথার চুল
কালো মুখেই কালো ভ্রমর, কিসের রঙিন ফুল!
কাঁচাধানের পাতার মতো কচি মুখের মায়া
তার সাথে কে মাখিয়ে দেছে নবীন তৃণের ছায়া।
জালি লাউয়ের ডগার মত বাহু দু’খান সরু
গা-খানি তার শাওন মাসের যেমন তমালতরু।
[নকশী কাঁথার মাঠ]
কিংবা
দূর্বাচলে রাখলে তারে দূর্বাতে যায় মিশে,
মেঘের খাটে শুইয়ে দিলে খুঁজে না পাই দিশে।
বনের মাঝে বনের লতা পাতায় পাতায় ফুল
সেও জানেনা-নমু মেয়ের শ্যামল শোভার তুল।
[সোজন বাদিয়ার ঘাট]
এবং এভাবেই রূপকে-প্রতীকে-চিত্রকল্পে এবং উপমা-উেপ্রক্ষায় সমস্ত পল্লী প্রকৃতির ভেতরে ছড়ানো আছে জসীম উদ্দীনের কবিতার সাম্রাজ্য। মূলত সব দিক বিবেচনায় সহজেই বলা যায়, তিনি আধুনিক যুগের কবি।

কবি আবুল হোসেন: নববসন্ত থেকে কালের খাতায়


হা সা ন শা ন্ত নু

   বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে প্রথম আধুনিক কবি আবুল হোসেন। বাঙালি মুসলমানের আধুনিক সাহিত্যের ‘সপ্তরথী’র প্রথম পুরুষ তিনি। আবুল হোসেন, গোলাম কুদ্দুস, ফররুখ আহমদ, আহসান হাবীব, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ, শওকত ওসমান, আবু রুশদ—এ সাতজনকে ‘সপ্তরথী’ বলা হয়। বাঙালি মুসলমানদের জন্য আলাদা সংস্কৃতি, শিল্প আবুল হোসেনের একান্ত কাম্য ছিল। তবে চূড়ান্ত ও মৌলিক অর্থে তিনি সমাজ শিল্পের সামগ্রিক উত্তরণ কামনা করেছেন, বাঙালি মুসলমান সমাজের অবরুদ্ধ জীবন-চেতনার উত্তরণ কামনায় নিয়োজিত থেকেছেন। তাঁর সমকালের কবিদের মধ্যে কেউ কেউ নতুনকে বরণ করে নেয়ার বদলে অতীত আঁকড়ে থাকার স্বপ্নে বিভোর ছিলেন। আর তিনি বলেছেন জাগরণ, সমুন্নয়নের কথা। তাঁর দৃঢ়তম উচ্চারণ—‘হে কূর্ম তোমার অন্ধকার, বর্মের গোপন গুহা থেকে, বের হয়ে এসো আজ নির্ভয়ে, এখনও ছিন্ন করো শতাব্দীর কুয়াশায় ঘন, ভ্রান্তির তিমির…।’ নতুন চেতনা, সময় দরকার বাঙালি মুসলমানের শিল্প ও জীবনে—এসব দিক চল্লিশের দশকে মাত্র কয়েক কবি অনুধাবন করেন। সে জন্যই মুসলমান কবিদের আধুনিক কবিতা বিষয় ও রীতি নিয়ে নিরন্তর পরীক্ষার অব্যাহত একটি প্রতিষ্ঠান হয়ে দাঁড়ায়। ওই কবিদের মধ্যে আবুল হোসেন নিঃসন্দেহে অন্যতম। ‘নবযুগ’ কবিতায় তিনি বলেছেন, মুসলমানদের দিনবদল হচ্ছে। এ কবিতা বুদ্ধদেব বসুর ‘কবিতা’ পত্রিকায় ত্রিশের দশকের মাঝামাঝিতে প্রথম প্রকাশিত হয়।
    আবুল হোসেন ছিলেন বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতির কার্যকরী পরিষদের সদস্য। ওই সাহিত্য সমিতির মাসিক সভায় একাধিকবার তিনি প্রবন্ধ পাঠ করেন। ১৯৩৯ সালে কলকাতায় আয়োজিত এক সাহিত্য সভায় তিনি ‘বাঙালি মুসলমানের সাহিত্য সাধনা’ শিরোনামের এক প্রবন্ধ পড়েন। তাঁর এ প্রবন্ধ মুসলমান কবি-লেখকদের তখন নতুনভাবে ভাবিয়ে তোলে। বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতির একটি সাহিত্য সম্মেলন আয়োজিত হয় কলকাতার মুসলিম ইনস্টিটিউটে। প্রখাত সাহিত্যিক কাজী মোতাহার হোসেন ছিলেন ওই মননশীল সভার সভাপতি। সভায় আবুল হোসেন ‘আমাদের মননশীল সাহিত্য’ শিরোনামে প্রবন্ধ পড়েন। ওই প্রবন্ধও বাঙালি মুসলমান কবি-লেখকদের আলোড়িত, ভাবিত করে। প্রবন্ধটি কাজী মোতাহার হোসেন এত পছন্দ করেন যে, পড়া শেষ করতেই তিনি আবুল হোসেনকে জড়িয়ে ধরেন।
আবুল হোসেনকে বলা হয় ‘প্রথম আধুনিক-চেতনা, অবচেতনা, সফিসটিকেশনের কবি’। বাংলা কবিতার ধারা যদি এরকম হয়—বৈষ্ণব কবিতার যুগ, রবীন্দ্র-নজরুলের যুগ, মাইকেল মধুসূদনের যুগ ও আধুনিক বাংলা কবিতা; তাহলে বলতে হবে আধুনিক বাংলা কবিতার ধারাটা শুরু হয়েছে আবুল হোসেনের সময় থেকে। চল্লিশের দশকে তিনি বাংলা কবিতায় যে আধুনিকতার সূত্রপাত করেন; চল্লিশ, পঞ্চাশ, ষাট, সত্তর, আশি, নব্বই, একুশ শতাব্দীর শূন্য দশক ধরে সেই আধুনিকতারই নানামুখী চর্চা চলেছে এ দেশের কবিদের হাতে। কবি বিষ্ণু দে’র ‘এক সূত্রে’ কবিতা সঙ্কলনে মুসলমান আধুনিক কবিদের মধ্যে কেবল আবুল হোসেন আর গোলাম কুদ্দুসের কবিতাই ঠাঁই পেয়েছে।
  সে জন্য তাঁকে কেবল ‘বাঙালি মুসলমানদের প্রথম আধুনিক কবি’ বলাটা এক ধরনের সাম্প্রদায়িকতা চর্চার মতো। কেননা, তিনি দুই বাংলার চল্লিশের দশকের কবিদের মধ্যে আধুনিক কবি, অন্যতম প্রধান কবি। ত্রিশের দশকের কবিদের অকারণ ‘রবীন্দ্র বিরোধিতা’, ইউরোপের সাহিত্যের অন্ধ অনুকরণ আধুনিক কবিতা হিসেবে কালের বিচারে চিহ্নিত হয় না। তাদের কবিতায় সূক্ষ্মতার চেয়ে স্থূলতা অনেক বেশি। এসব বিবেচনায় চল্লিশের দশকেই আধুনিক কবিতার সূত্রপাত। জীবনের ধাপে ধাপে কবিতার বিষয় থেকে বিষয়ে গেছেন আবুল হোসেন অননুকরণীয়ভাবে। নিজের স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখেছেন সব সময়। তাঁর কবিতার বড় বৈশিষ্ট্য, আর্শ্চয রকমের সরলতা। বলার ভঙ্গিটা এত চেনা যে, মনে হয় কবি পাঠকের সঙ্গে কথার বুনন নির্মাণ করে চলেছেন। অথচ ছন্দমিলের বৈচিত্র্যে প্রতিটি কবিতাই ঋদ্ধ। সরল বর্ণনাতেও ছড়িয়ে থাকে বুদ্ধির দীপ্তি, ব্যঙ্গের সূক্ষ্ম আঁচড়, প্রতীক ও চিত্রকল্পের স্বতঃস্ফূর্ত প্রয়োগ। তিনিই বাংলা কবিতার একমাত্র ব্যক্তিত্ব, যিনি বাংলা কবিতার তিন প্রধানতম পুরুষ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম ও জীবনানন্দ দাশের সংস্পর্শে এসেছেন। তবে এখনও তিনি প্রতি মুহূর্তে তরুণ। প্রতি মুহূর্তে নবায়ন করেন নিজেকে তরুণতম, সবচেয়ে আধুনিক রাখতে।
    এটাও সত্য, ‘সাম্প্রদায়িকতা’ বাংলা সাহিত্যের অনিবার্য এক সত্য। এ উপমহাদেশ কিংবা পৃথিবীর কোনো দেশের প্রধান ভাষায় লেখা সাহিত্যে এরকম সাম্প্রদায়িকতা আছে কি না, সেটা একটা বড় প্রশ্ন। রবীন্দ্রনাথ ‘বিশ্বকবি’, তিনি তাঁর ধর্মীয় সম্প্রদায়ের বাইরে তাকিয়েছেন খুব সামান্যই। মুসলমানদের নিয়ে তাঁর লেখার তালিকা টানতে গেলে রবীন্দ্রপ্রেমীদের ‘অসাম্প্রদায়িকতার গর্ববোধ’ ম্লান হয়ে যায়। আবার রবীন্দ্র সমসাময়িকের মুসলমান কবি-লেখক ইসমাইল হোসেন সিরাজী, মীর মশাররফ হোসেন, মোহাম্মদ নজিবর রহমান, মোজাম্মেল হক, কাজী ইমদাদুল হকরাও নিজ ধর্মের বাইরে তাকাননি। সম্প্রদায়গত চিন্তা-চেতনা থেকে ধর্মীয় সম্প্রদায়ের বাইরে কবি-লেখকদের মূল্যায়ন না করার মানসিকতা তখন ছিল ভয়াবহ রকমে প্রবল। হিন্দু ধর্মের অনুসারী কবি-লেখকদের এরকম মানসিকতা ছিল ভয়ানক রকমে। মুসলমানদের মধ্য থেকে যারা অসাধারণ লিখতেন, তাদের মুসলমান কবি-লেখক বলে একটা গণ্ডির মধ্যে আবদ্ধ করে রাখার কৌশল অবলম্বন করতেন। আশ্চর্যজনক হলেও সত্য, কৌশলটার চর্চা আজও চলছে। তাতে এখন সেক্যুলার কয়েক মুসলমান কবিও যুক্ত আছেন। যারা আবুল হোসেনকে ‘গণ্ডির’ মধ্যে আটকে রাখতে চান, তাদের মধ্যে অনেকে কবিতা ও সাহিত্যের বিচারে আবুল হোসেনের পেছনের সারিতে দাঁড়ানোর যোগ্যতাও রাখেন না।
    আবুল হোসেনের জন্ম ১৯২২ সালের ১৫ আগস্ট, বাগেরহাট জেলায়। ছেলেবেলা কেটেছে কুষ্টিয়ায়। প্রথম যৌবন কলকাতায়। সাতচল্লিশে দেশভাগের মাধ্যমে পাকিস্তান জন্মের দিন ১৪ আগস্ট চলে আসেন ঢাকায়। তাঁর প্রথম কবিতার বই ‘নববসন্ত’ বের হয় ১৯৪০ সালে, কলকাতার বুলবুল পাবলিশিং হাউস থেকে। দ্বিতীয় বই ‘বিরস সংলাপ’ ঢাকা থেকে বের হয় ১৯৬৯ সালে। এরপর একে একে বের হয়—হাওয়া তোমার কি দুঃসাহস, দুঃস্বপ্ন থেকে দুঃস্বপ্নে, এখনো সময় আছে, রাজরাজড়া, কালের খাতায়, আমার এই ছোট ভুবন, আর এক ভুবন, দুঃস্বপ্নের কাল, স্বপ্নভঙ্গের পালা ইত্যাদি।
    ‘নববসন্ত’ বইটি কবি উত্সর্গ করেছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে। তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ডামাডোলে বইটির কোনো কপি রবীন্দ্রনাথের কাছে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। এ নিয়ে আবুল হোসেনের মনে দুঃখবোধ জমে আছে। তাঁর মতে, ‘ওটা যতোদিন বেঁচে থাকি, ততোদিনই থাকবে।’ কুষ্টিয়া হাইস্কুলে নবম শ্রেণীতে পড়াকালে তিনি রবীন্দ্রনাথকে ‘হে ধরণীর কবি’ নামে একটি কবিতা পাঠান। ওই কবিতা অক্ষরবৃত্তে ২৬ মাত্রায় লেখা ছিল। কবিতাটি পেয়ে লম্বা খামে ছোট্ট একটা চিরকুট পাঠান রবীন্দ্রনাথ। তাতে লেখা ছিল ‘শ্রীরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর’।
    রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে আবুল হোসেনের সাহিত্যগত বিতর্কও হয়েছে। ১৯৩৭ সালে আবুল হোসেনের প্রকাশিত প্রথম প্রবন্ধ নিয়ে এ বিতর্ক হয়। ওই বছর কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ ম্যাগাজিনে তাঁর লেখা প্রবন্ধ ‘গদ্য কবিতা ও রবীন্দ্রনাথ’ প্রকাশিত হয়। এ প্রবন্ধই পরের বছর শোধিত-বর্ধিত হয়ে ‘গদ্য কবিতা ও তার ছন্দ’ শিরোনামে প্রকাশিত হয় মাসিক মোহাম্মদী পত্রিকায়। তিনি প্রবন্ধটিতে গদ্য কবিতার বিরুদ্ধে বলেছিলেন। তাঁর বক্তব্য ছিল এরকম—‘ছন্দ একেবারেই অপরিহার্য।’ রবীন্দ্রনাথ ১৯৩৯ সালে শান্তিনিকেতনের এক অভিভাষণে আবুল হোসেনের বক্তব্যের প্রতিবাদ করেছিলেন। অবশ্য প্রবন্ধটি লেখার অল্পকাল পরে আবুল হোসেন নিজেও গদ্য কবিতা লেখা শুরু করেন, যা এখনও অব্যাহত আছে।
    রবীন্দ্রনাথও ফিরে গেছেন গদ্য কবিতা থেকে ছন্দোবদ্ধ কবিতায়। দুই কবির এ বিতর্ক চিহ্নিত করতে বাংলা সাহিত্যের আরেক কবি-গবেষক আবদুল মান্নান সৈয়দ বলেছিলেন, ‘এসব হচ্ছে শিল্পীর শিল্প বিবেচনা থেকে শিল্প সৃজনের মজাদার বৈপরীত্য।’ বিতর্কের পরও রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে আবুল হোসেনের দেখা ও কথাবার্তা হয়। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন ‘রবীন্দ্র পরিষদ’-এর সম্পাদক হন তিনি ১৯৪৩ সালে।
    নববসন্ত প্রকাশিত হওয়ার পর সেই সময়ের অগ্রজ কবি, সাহিত্য সমালোচক, বোদ্ধা মহলে আলোচিত ও প্রশংসিত হয়। বইটির আলোচনা বেরোয় শওকত ওসমানের ‘চতুরঙ্গ’, গোলাম কুদ্দুসের ‘সওগাত’, আবুল মনসুর আহমদের ‘কৃষক’, সুবোধ সেন গুপ্তের ‘রূপায়ণ’, নীহার রঞ্জন রায়ের ‘কবিতা’সহ ওই সময়ের আরও অনেক পত্রিকায়। আবুল হোসেনের শিক্ষক ছিলেন অধ্যাপক বিনয় কুমার সরকার। তিনিও ‘নববসন্ত’র কবিতা নিয়ে কামাক্ষীপ্রাসাদ চট্টোপাধ্যায়, সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে আলোচনা করতেন, যা তাঁর ‘বিনয় সরকারের বৈঠকে’ নামে জীবনী বইয়ে লিখে গেছেন।
    বিংশ শতাব্দীর চল্লিশের দশক থেকে একুশ শতাব্দীর প্রথম দশকের শেষে এসে পৌঁছেছেন আবুল হোসেন। বাংলা ভাষার কবিদের মধ্যে এমন নির্লোভ-নির্দলীয় কবি আর দ্বিতীয়জন নেই বলা যায়। দীর্ঘ সত্তর বছর ধরে নিরবচ্ছিন্ন সাহিত্যচর্চা করছেন। এ সময়ের মধ্যে দেখেছেন অসহযোগ আন্দোলন, সন্ত্রাসবাদ, কুইট ইন্ডিয়া আন্দোলন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, পঞ্চাশের মন্বন্তর, বিয়াল্লিশের দুর্ভিক্ষ, কলকাতায় জাপানি বোমার আক্রমণ, হিন্দু-মুসলমানের সম্পর্কে টানাপড়েন, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, ভারতবর্ষ ভাগ, বায়ান্নের ভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ। এরপর অর্থনৈতিক বিপর্যয়, নৈরাশ্য, সেনা বিদ্রোহ, সামরিক শাসন কিংবা নব্বইয়ের দশকের শুরুতে স্বৈরাচার সরকারের পতনের মধ্য দিয়ে সংসদীয় গণতন্ত্রের যাত্রা। জীবন পরিক্রমায় দেখা প্রায় সব কিছুই উঠে এসেছে তাঁর কবিতা, প্রবন্ধ ও আত্মজীবনীতে। পঞ্চাশের মন্বন্তর নিয়ে লিখেছেন ‘সন্দিহান’ কবিতা। গোপাল ভৌমিকের সম্পাদনায় ‘পঞ্চাশে’ নামে ওই মন্বন্তর নিয়ে কবিতা সঙ্কলন বের হয়। তাতে ছিল আবুল হোসেনের ‘মেহেদির জন্য’ কবিতাটি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুদ্ধবিরোধী কবিতা লেখার ধুম পড়ে। সমসাময়িক কবি আহসান হাবীব ‘হে অসি বাঁশরি হও’, সৈয়দ আলী আহসান লিখলেন—‘হে বাঁশি অসি হও’। আবুল হোসেন অসি, বাঁশি নিয়ে লেখেননি। তিনি লিখলেন ‘সৈনিক’ কবিতাটি। এ কবিতার ভাষা, ভাবনা তাঁকে চিহ্নিত করে তোলে সত্যিকার আধুনিক কবি হিসেবে। সেটি ১৯৩৯ সালে আনন্দবাজার পত্রিকার শারদীয় সংখ্যায় ছাপা হয়। পরে একাধিক পত্রিকা, লিটল ম্যাগাজিনে পুনর্মুদ্রিত হয়। কবি নিজে পরে কবিতাটির নাম বদলে করেছিলেন ‘ঘোড়সওয়ার’। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পটভূমিতে লেখা ‘ঘোড়সওয়ার’ যুদ্ধবিরোধী কবিতা। তাঁর বিখ্যাত কবিতার মধ্যে আরও আছে ‘বাংলার মেয়ে’, ‘ডি.এইচ. রেলওয়ে’, ‘ডাইনামো ট্রেন’ ইত্যাদি। বুদ্ধদেব বসুর ‘কবিতা’য় ‘ডি.এইচ. রেলওয়ে’ প্রথম প্রকাশিত হয়। কবিতাটি পাহাড়ি ট্রেন পথের বর্ণনা। দার্জিলিং হিমালয়ান রেলওয়ের এক যাত্রা কবি এ কবিতায় সানন্দে ছন্দ, শব্দ, ধ্বনিতে বর্ণনা দেন। এরকম কবিতা বাংলা সাহিত্যে গবেষক-সমালোচকরা দ্বিতীয়টি এখনও খুঁজে পাননি।
    অল্প বয়সেই লেখক হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছিলেন আবুল হোসেন। কুষ্টিয়া হাই স্কুলে এইটে পড়ার সময় স্কুলের বার্ষিক ম্যাগাজিনে ‘আকবরের প্রতি রানা প্রতাপ’ নামে তাঁর কবিতা প্রকাশিত হয়। ১৪ মাত্রার অক্ষরবৃত্তে মাইকেল মধুসূদনের অনুসরণে লেখা ছিল সেটি। ১৯৩৭ সালে ওই স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করে সে বছর কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তির পর কলেজের ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয় প্রবন্ধ। এরপর চতুরঙ্গ, কবিতা, পূর্বাশা, সওগাত, মোহাম্মদী, বুলবুল, দেশ, আনন্দবাজার পত্রিকা, যুগান্তর, অরণি, নিরুক্ত, নবশক্তি, মাসপয়লা, পাঠশালা, শিশু সওগাত, নবযুগ, ত্রিকাল, রবিবার পত্রিকায় কবিতা, প্রবন্ধ, সাহিত্য-শিল্প, সংস্কৃতি সম্পর্কিত আলোচনা, ভ্রমণ বৃত্তান্ত প্রচুর লিখেছেন। এখন বাংলা দেশের বিভিন্ন পত্রিকায় কবিতা লিখছেন।
সাহিত্য পত্রিকাও সম্পাদনা করেছেন। ষাটের দশকে সৈয়দ সাজ্জাদ হোসায়েনের সঙ্গে ‘সংলাপ’ পত্রিকা বের করেন। ত্রৈমাসিক এ পত্রিকার আটটি সংখ্যা বের হয় তিন বছরে। তখন ঢাকা থেকে খুব বেশি সাহিত্য পত্রিকা বেরুত না। দেশের বাইরের পত্রিকার জন্য বুদ্ধিদীপ্ত পাঠকদের অপেক্ষায় থাকতে হতো। তাদের তৃষ্ণা মেটানো, দলমতের বাইরে লেখকদের, বিশেষ করে নবীনদের একটা ফোরাম করে দেয়ার উদ্দেশ্যেই সেটি বের করেন। তাতে আহসান হাবীব, ফররুখ আহমদ, শামসুর রাহমান, শহীদ কাদরী, সৈয়দ শামসুল হক, ফজল শাহাবুদ্দীন, আবু রুশদ, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ, রশীদ করীম, শওকত ওসমান, মুনীর চৌধুরীর মতো কবি-লেখকরা লিখতেন।
    তিনি অন্যের কবিতা অনুবাদও করেছেন। রবার্ট ফ্রস্টের কবিতা এ দেশে তিনিই প্রথম অনুবাদ করেন। এছাড়া এইচ জি ওয়েলসের ‘ঈড়ঁহঃত্ু ড়ভ ঃযব ইষরহফ’ ‘অন্ধের দেশ’ নামে, মার্ক টোয়েনের ‘গরষষরড়হ চড়ঁহফ ঘড়ঃব’ ‘দশ লাখ পাউন্ড’ নামে, ইসমত চুঘতাইয়ের ‘ছোট মা’ গল্প (ইংরেজি থেকে), আন্তন চেখভের গল্প, পাকিস্তানের কবি ইকবালের কবিতাও অনুবাদ করেছেন। তাঁর অনুবাদ প্রকাশিত হয়েছে মাসিক মোহাম্মদী, নবযুগ ও সংলাপ পত্রিকায়। রুশ কবি রসুল গামজাতফ, আকবর উদ্দীন, দাগেস্তানের কবিতাও অনুবাদ করেছেন, যা বই আকারে বেরিয়েছে। ষাটের দশকে পাকিস্তানের ইকবাল একাডেমির আমন্ত্রণে করাচিতে একাধিকবার ইকবালের জন্মদিনের অনুষ্ঠানে অতিথি বক্তা হিসেবে অংশ নেন তিনি।
    তিনি সাহিত্যচর্চা করেছেন, পাশাপাশি সরকারি চাকরি, সমাজ উন্নয়নে চিন্তা-ভাবনা করেছেন। পড়াশোনা করেছেন অর্থনীতি নিয়ে। এ বিষয়ে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স নিয়ে এমএ পাস করেন। দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের কথাও ভেবেছেন। ছোট এ দেশে জনসংখ্যা তখন বাড়ছিল জ্যামিতিক হারে। যা অর্থনৈতিক উন্নয়নে বড় বাধা। একটি পরিবার বলতে তখন বোঝাত আট/দশজনের সংসারকে। জন্মনিয়ন্ত্রণের নানা পদ্ধতি জনগণের মধ্যে ছড়িয়ে দেয়ার পরিকল্পনা নিল সরকার। জন্মনিয়ন্ত্রণে উদ্বুদ্ধ করতে ও পরিবার ছোট রাখতে সরকারের স্লোগান তৈরি হলো—‘ছেলে হোক মেয়ে হোক দুটি সন্তানই যথেষ্ট’। এ স্লোগান আবুল হোসেনের দেয়া, যা এখনও জনপ্রিয়তার শীর্ষে। বাংলাদেশ সরকারের জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ বিভাগের যুগ্ম সচিব ছিলেন তিনি। ১৯৮১ সালে ইন্দোনেশিয়ায় বাংলাদেশের পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা দলের নেতৃত্ব দেন। এছাড়া জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ সম্পর্কে বিশেষজ্ঞ হিসেবে ফিলিপিন্স, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, হংকং, দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানে আয়োজিত সম্মেলনে যোগ দেন।লেখক হিসেবে ১৯৬০ সালে বেলজিয়ামে ‘বাইঅ্যানিয়েল ইন্টারন্যাশনাল অব পোয়েট্রি’তে পাকিস্তানের প্রতিনিধিত্ব করেন। ১৯৬১ সালে পাক-ভারত সাংস্কৃতিক সম্মেলনে পাকিস্তান দলের সদস্য, ১৯৭৩-এ সোভিয়েতের আলমা আতায় আফ্রো-এশীয় লেখক সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রতিনিধি ছিলেন। ১৯৮৩ সালে যুগোস্লাভিয়ার স্ট্রুগা কবিতা উত্সবে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন। ১৯৬০ সালে তত্কালীন রাষ্ট্রপতির আমন্ত্রণে অতিথি-লেখক হিসেবে পাকিস্তানের বিভিন্ন প্রদেশ ও শহর ভ্রমণ করেন।
    সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে ১৯৭৪ সালে সিঙ্গাপুরে কলম্বো প্ল্যান কনসালটেটিভ কনফারেন্সে বাংলাদেশ দলের সদস্য ছিলেন। ১৯৭১ সালে কলম্বোতে আইপিপিএফের আঞ্চলিক সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন।
   লেখক জীবনের শুরুতেই আবু সয়ীদ আইয়ুব, হুমায়ূন কবির, সৈয়দ মুজতবা আলী, বুদ্ধদেব বসু, সঞ্জয় ভট্টাচার্য প্রমুখ মনীষীর ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে আসতে পেরেছিলেন। পরিচয় হয়েছিল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে। শিক্ষক হিসেবে আরো পেয়েছিলেন প্রবাদপ্রতিম ড. সুবোধচন্দ্র সেনগুপ্ত, গৌরীনাথ শাস্ত্রী প্রমুখ শিক্ষাব্রতীকে। তাঁর সাহিত্য রুচি ও মানস গঠনে এদের অবদান অপরিসীম।
    আজীবন সাহিত্যচর্চায় নিয়োজিত থাকলেও সরকারি চাকরি ছিল প্রধান পেশা। ৩৬ বছরের কর্মজীবনে দেশে ও বিদেশে, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থায় তথ্য, রেডিও, টেলিভিশন ও জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ বিভাগে বিভিন্ন উচ্চপদে আসীন ছিলেন। যেমন জনসংযোগ ও গবেষণা এবং তথ্য সংরক্ষণ বিভাগের পরিচালক, চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশনের ম্যানেজিং ডিরেক্টর, বাংলাদেশ সরকারের যুগ্ম সচিব পদে কাজ করে ১৯৮২ সালে অবসর গ্রহণ করেন।
    লেখক হিসেবে এবং সরকারি কাজে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, বেলজিয়াম, ডেনমার্ক, সোভিয়েত রাশিয়া, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, হংকং, সিঙ্গাপুর, ভারত, পাকিস্তান, যুগোস্লাভিয়া, ফিলিপিন্স্, শ্রীলঙ্কা, হল্যান্ড, পশ্চিম জার্মানি, লাওস ও গ্রিস ভ্রমণ করেন।
    লেখার জন্য দেশ এবং সমাজের কাছ থেকে স্বীকৃতিও পেয়েছেন বিভিন্ন সময়ে। সম্মানিত হয়েছেন বাংলা একাডেমী পুরস্কারে, জনবার্তা স্বর্ণ পদকে, নাসির উদ্দীন স্বর্ণ পদকে, একুশে পদকে। আরো পেয়েছেন পদাবলী পুরস্কার, জাতীয় কবিতা পুরস্কার, আবুল হাসনাত সাহিত্য পুরস্কার, বাংলা সাহিত্য পরিষদ পুরস্কার এবং কাজী মাহবুব উল্লাহ স্বর্ণ পদক ও পুরস্কার।
     তাঁকে নিয়ে লিটল ম্যাগাজিন পথিক (সম্পাদক—তারেক মাহমুদ) দুটি বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করে। অসাধারণ ওই দুই সংখ্যায় তার কবি, সাহিত্যের আলোচনা, মূল্যায়ন করেন দেশের খ্যাতিমান কবি, লেখক, প্রাবন্ধিকরা। পথিক-এর দুটির মধ্যে একটি প্রকাশিত হয় ২০০০ সালের ডিসেম্বরে, অন্যটি ২০০৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে।
     আবুল হোসেনের ঘরোয়া জীবন হলো—১৯৫৮ সালে বিখ্যাত লেখক আকবর উদ্দীনের বড় মেয়ে সাহানা হোসেনকে বিয়ে করেন। সাহানা হোসেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় এমএ পাস করেন। তিনি কয়েকটি অনুবাদ গ্রন্থের রচয়িতা। ১৯৯৪ সালের ৮ মে আকস্মিকভাবে তিনি পরলোক গমন করেন। আবুল হোসেনের দুই ছেলে ও দুই মেয়ে।
আবুল হোসেন দীর্ঘদিন থেকে ঢাকার ধানমণ্ডিতে নিজস্ব বাসভবনে বসবাস করছেন।

আবুল হোসেন: একজন প্রকৃত আধুনিক কবির প্রোফাইল

      
- শা ম সু র রা হ মা ন 
       আবুল হোসেন চল্লিশের দশকের একজন উজ্জ্বল কবি। মুসলিম সমাজে যখন আধুনিক কবিতার মুখ লক্ষ্য করা যায় নি, তখন আবির্ভাব ঘটে কাজী নজরুল ইসলামের। তাঁর কাব্য প্রতিভায় উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে বাংলা কবিতা। আমি মনে করি, কাজী নজরুল ইসলামের কাব্য সাধনা মুসলিম কবিদের আধুনিক কবিতার দিকে আগ্রহী করে তোলে। প্রথম যে ক’জন তরুণ মুসলিম কবি আধুনিক কবিতা লেখার ব্যাপারে আগ্রহী হলেন, তাঁরা—আহসান হাবীব, ফররুখ আহমদ, গোলাম কুদ্দুস এবং আবুল হোসেন। এদের পরে এলেন সৈয়দ আলী আহসান, সানাউল হক এবং অন্যান্য কবি। আমি আবুল হোসেনের কবিতা কলকাতা থেকে প্রকাশিত বিভিন্ন নামজাদা পত্রিকায় পড়ি। তখন থেকেই আমি তাঁর একজন অনুরক্ত পাঠক। 
       আবুল হোসেনকে আমি প্রথম দেখি রেডিও পাকিস্তানের ঢাকা স্টেশনে। তিনি সেখানে কাজ করতেন। সালের কথা আমার ঠিক মনে নেই, তবে সম্ভবত ১৯৫০ সাল হবে। আমি রেডিও পাকিস্তানে কবিতা পাঠের একটি আমন্ত্রণ পাই। আমার নতুন কবিতা কাব্য সংকলনে প্রকাশিত একটি কি দুটি কবিতা আমি রেডিও অফিসে জমা দিই। তখন সাহিত্য বিভাগের দায়িত্বে ছিলেন আবুল হোসেন। তিনি কবিতা দুটো পড়ে বললেন, এই কবিতা পড়া যেতে পারে কিন্তু নতুন কবিতা দিলে ভালো হয়। কবিতা দুটিতে জীবনানন্দের প্রভাব ছিল খুবই লক্ষণীয়। 
      আমি কবিতা দু’টি নিয়ে বাসায় চলে এলাম। তার দুই-একদিন পর আমার লেখা হয়ে গেলে একটি নতুন কবিতা, ‘ওয়াগনে কয়েকটি দিন’ কবিতাটি আমি কবি আবুল হোসেনের কাছে জমা দিই। এই কবিতাটি তিনি গ্রহণ করলেন। এটিই আমার প্রথম কবিতা, যা রেডিওতে পড়ি। কবিতাটিতে জীবনানন্দের প্রভাব ছিল না বললেই হয়। আমার বলতে দ্বিধা নেই, আবুল হোসেন পরোক্ষে আমার একটি উপকারই করলেন। আমি লেখার ব্যাপারে আরও সচেতন হয়ে উঠলাম। 
     আমার কথা থাক। এখন আবুল হোসেন সম্পর্কে আমি কিছু বলতে চাই। আবুল হোসেন কোনো কালেই খুব বেশি লেখেননি। কিন্তু কবিতা বিষয়ে ভেবেছেন অনেক বেশি। তিনি তাঁর কবিতাকে কখনও মেদবহুল কিংবা অনর্থক দীর্ঘ করতে চাননি। তাঁর কবিতা এবং সংযম আমাদের কাব্যসাহিত্যে খুব বেশি লক্ষ্য করা যায় না। তিনি বেশি লেখেননি। তাঁর বয়সের তুলনায় কাব্য গ্রন্থের সংখ্যা খুব কম; কিন্তু যখনই লিখেছেন তাঁর রচনা বিশিষ্ট হয়ে উঠেছে এবং সচেতন পাঠকদের মন কেড়েছে। তাঁর বিষয়ে একটি বৈশিষ্ট্যের কথা না বললেই নয়। তিনি বরাবরই কবিতাকে মুখের কথার খুব কাছাকাছি নিয়ে যেতে চেয়েছেন। এ কাজটি সহজ নয়। এই কঠিন কাজটি তিনি করেছেন সম্পূর্ণভাবে। এই প্রয়াসের ফলে তাঁর কবিতা পাখির পালকের মতোই নির্ভার হয়ে উঠতে পেরেছে। নির্ভার বলে এই কবিতাকে হালকা বলা যাবে না। অনেক গভীর কথাই তিনি বলেছেন সহজ-সরল ভাষায়, যা সংবেদনশীল পাঠকের মনে কাব্যানুভূতি জাগায়। 
      আমি বরাবরই কবি আবুল হোসেনের একজন মনোযোগী পাঠক। তাঁর সবক’টি বই আমি আদ্যোপান্ত পড়েছি। তাঁর কবিতা পড়ার পর যে কথা আমার মনে হয়েছে, তিনি আরও বেশি লিখলে আমাদের কাব্যসাহিত্য সমৃদ্ধতর হতো এবং তাঁর নিজস্ব কাব্যভাণ্ডার তো অধিকতর সমৃদ্ধ হতোই। তবে এ নিয়ে খেদ করার কিছু নেই। সাহিত্যের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে অনেক কবিই এমন বিরলপ্রজ। তিনি কবিতা লেখার সঙ্গে সঙ্গে বিখ্যাত বিদেশি কবিদের বেশকিছু কবিতার রসোত্তীর্ণ অনুবাদ করেছেন। এ ধরনের অনুবাদ যে ভাষায় করা হয়, সে ভাষার কবিতার জন্যও উপকারী। 
       তাঁর সবগুলো গ্রন্থই উল্লেখযোগ্য। তাঁর গ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে—‘নববসন্ত’ (১৯৪০), ‘বিরস সংলাপ’ (১৯৬৯), ‘হাওয়া, তোমার কী দুঃসাহস’ (১৯৮২), ‘দুঃস্বপ্ন থেকে দুঃস্বপ্নে’ (১৯৮৫), ‘এখনো সময় আছে’ (১৯৯৬) ইত্যাদি। তাঁর কবিতা এক জায়গায় থেমে থাকেনি, তিনি নিজেকে ক্রমাগত বদলে নেয়ার চেষ্টা করেছেন। এই পরিবর্তনের স্বাক্ষর তাঁর রচনাসমগ্রে খুঁজে পাওয়া দুষ্কর নয়। সুখের বিষয়, এখনও এই ৭৯ বছর বয়সেও তিনি তাঁর লেখনীকে সচল রেখেছেন। তাঁর এই লেখনী আরও কিছুকাল সচল থাকবে। 
(‘পথিক’ আবুল হোসেন সংখ্যা, ডিসেম্বর ২০০০ (তারেক মাহমুদ সম্পাদিত) থেকে)

Wednesday, March 6, 2019

শায়ের, শায়েরি ও মাহফিলে মুশায়েরা


- রফিকুল ইসলাম রফিক           নানা আঙ্গিকের শিল্প-সাংস্কৃতিক চর্চার পাশাপাশি ভারতীয় উপমহাদেশের বিভিন্ন শহরের মতো ঢাকারও ছিল মুশায়েরা আয়োজনের ঐতিহ্য। মুশায়েরা হলো উর্দু শেরশায়েরি পাঠের আসর। এ মাধ্যম উর্দু কাব্য-আন্দোলনে বেশ গুরুত্বপূর্ণ এক ভূমিকা পালন করে। ঢাকা একসময় উর্দু ও ফারসি সাহিত্যের চর্চার জন্য ছিল বিশেষভাবে খ্যাত। যখন কোনো সাহিত্য পত্রিকা ছিল না, তখন এই মুশায়েরা পাঠের আয়োজনের মাধ্যমে সাধারণ মানুষ কাব্যচর্চার সংস্পর্শে আসার সুযোগ পেত। মজার বিষয়, অক্ষরজ্ঞানহীন শায়েররাও এ কাব্য সভায় উপস্থিত হয়ে অনর্গল উর্দু শের উপস্থাপন করতেন। এ কাব্যসভায় উপস্থিত থাকতেন কয়েকজন বিচারক। সভার সভাপতিকে মির মুশায়েরার বলা হতো। কবিতা বা শেরশায়েরি পাঠকের সামনে শামাদানে রাখা হতো মোমের প্রদীপ। মুশায়েরা অনুষ্ঠানে যেসব শেরশায়েরি জনপ্রিয় হতো, সেগুলো পরে পত্রিকায় প্রকাশ করে বিনা মূল্যে বিতরণ করা হতো। এ ছাড়া মুখে মুখে কাব্যের প্রসারে মুশায়েরা অনুষ্ঠান অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করে। এর সঙ্গে সম্পর্কিত আদব-কায়দা ছিল অত্যন্ত মার্জিত ও সুশৃঙ্খল। এবার ঢাকার সে সময়ের জনপ্রিয় একটি শায়েরির কয়টি পঙ্ক্তি উদ্ধৃত করা যাক : ‘বেতাবি কাহ রাহি হায়/ চালো কুয়ে ইয়ার মে/ সিমার কি তারাক হয়ে/দেলে (দিল) বেকারার মে।’ অর্থাৎ অস্থির হৃদয় বলছে চল প্রিয়ার কোঠায়। পারদের প্রদাহ আছে আমার অস্থির মনে।         সমকালীন শহুরে পরিবেশে মুশায়েরা বুদ্ধিবৃত্তিক চিত্তবিনোদনের সর্বাপেক্ষা মার্জিত অনুষ্ঠান বলে পরিচিতি লাভ করে। গজল রচনার সঙ্গেও মুশায়েরা অনুষ্ঠানটি ছিল সম্পর্কিত। ঢাকায় ঘরে ঘরে একসময় উর্দু পাহেলি বলার প্রচলন ছিল। পাহেলি বলতে বোঝানো হতো ধাঁধাকে। ঢাকাইয়া মানুষের মুখে মুখে একসময় পাহেলি বলার চল ছিল, বসত এর আসরও। ঢাকায় প্রচলিত দুটি পাহেলি ছিল : ১. কালি মুরগি কালাম তারাস/ আণ্ডা দেবে শ ও পচাশ। অর্থাৎ মাখনা। এবং ২. ওস পার সে আয়ি গৌরী/ ওসপে হ্যায় রেশম কি ডোরি/ খোদ দৌড়তি, লোগকো দৌওরাতি। অর্থাৎ ঘুড়ি।
            মুশায়েরা আয়োজন মোগল আমলেই উৎকর্ষ লাভ করে, পায় ব্যাপক প্রসার। ঢাকায় একসময় কবি মির্জা গালিবের ছিল অসংখ্য গুণগ্রাহী। উর্দু ভাষার জনাকয়েক কবি তাঁর সঙ্গে পত্র-যোগাযোগ করতেন। অনেকে তাঁর সানি্নধ্যেও এসেছিলেন। নওয়াব শামসুদদৌলাহ ছিলেন উর্দু সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষক। তিনি মুশায়েরার আয়োজন করতেন। তাঁর আয়োজিত বৈঠকের একটি শের মানুষের মুখে মুখে ফিরত : ‘মোহাব্বত মে এক এয়সা বক্ত ভি আতা ইনসাঁ পর/ সিতারো কি চমক সে চোট লাগতি হ্যায় রগেঁজা পর।
         আহসান মঞ্জিলের নবাব পরিবারও মুশায়েরার জন্য খ্যাত। নবাব আহসান উল্লাহ কাব্যপ্রেমিক এবং তিনি নিজে উর্দু ও ফারসি কবিতা রচনা করতেন। করতেন মুশায়েরার আয়োজন। নবাব আবদুল গনি ছিলেন সংগীতপ্রেমী মানুষ। তাঁর দরবারে গজল এবং নাতের আসর বসত। নবাব গনি মহররম মাসে শহীদে কারবালার স্মরণে মর্সিয়া, সালাম, কাশিদা, নাত, নওহা ইত্যাদি পাঠের জন্য কবিদের উৎসাহিত করতেন। নানা উৎসব উপলক্ষেও আহসান মঞ্জিলে জাঁকজমকের সঙ্গে মুশায়েরা অনুষ্ঠিত হতো।
        আশরাফউজ্জামান তাঁর ছেলেবেলার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে যে তথ্য দিয়েছেন, তা এ রকম : ‘ঢাকার রইস সম্প্রদায়ের ভাষাও ছিল উর্দু। কাজেই উর্দু ভাষা নিয়ে ঈদের দিনে কবিতার আসর জমে উঠত আহসান মঞ্জিলে। কবিরা এক এক লাইন করে কবিতা আওড়াতেন। আর শায়েরা বাহ, বাহ, মারহাবা, মারহাবা_মাশাআল্লাহ ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে উঠতেন। বেগম সাহেবরা অন্দরমহল থেকে আসরে পাঠাতেন জাফরানি শবরত এবং ইরাকি খেজুর। দুধযোগে কাশ্মীরি চা-ও আসত সঙ্গে।’ নবাব খাজা আহসান উল্লাহ শাহীনের একটি শায়েরির কয়েকটি পঙ্ক্তি এমন : ‘দেল খোশহো কে ফাসলে গুল, গুলিস্তাঁমে ফের আয়ি হায়/ নাওয়েদে আয়েশ ও ইসরাত ফের সাবা গুলশান মে লায়ি হায়।/ খিলে হায় ফুল বো কালমুমে নহরে হার তরপ জারি/ মায় ইসরাত পেলাসাকি, ঘটাভি শার পেছায়ি হায়।
         সৈয়দ মোহাম্মদ বাকের, তাবতা বাই ও আগা জানই রানি ফারসি ভাষার উঁচু স্তরের কবি ছিলেন। প্রতি মাসে তাঁদের বাসভবনে ফারসি মুশায়েরার আসর বসত। কয়েকটি ঢাকাইয়া পরিবারে নিয়মিত মুশায়েরার আসর বসত। হাকিম হাবিবুর রহমানের বাসভবনে প্রতি মাসে একবার মুশায়েরার আসর বসত। ১৯৩০ থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত প্রতি মাসে মুশায়েরার আয়োজন করা হতো। মুশায়েরার পঠিত শেরশায়েরির মধ্য থেকে বাছাই করা শের ‘গুলদাস্তা’ নামের কাব্য পত্রিকায় প্রকাশ করে বিনা মূল্যে বিতরণ করা হতো। কবি কাজী নজরুল ইসলাম কোনো এক মাঘী পূর্ণিমায় হাকিম সাহেবের বাড়ির ছাদে এক মজলিসে উপস্থিত ছিলেন। নজরুলের গজল ও ইসলামী গান শোনার জন্য শহরের গণ্যমান্য ও সংগীতজ্ঞ বহু লোক এ সভায় এসেছিলেন। হাকিম সাহেবের মুশায়েরায় নবাববাড়ির কবিরাও অংশ নিতেন।
    ঢাকার বকশিবাজারের হজরত হাফেজ জহুরুল হক মোবারকির বাসভবনে নিয়মিত মুশায়েরার আসর বসত। এখানে ড. আন্দালিব শাদানীসহ উপমহাদেশের অনেক কবি মুশায়েরায় অংশগ্রহণ করতেন। পাকিস্তান আমলে ঢাকার নিমতলীর রেডিও পাকিস্তান (বর্তমানে বাংলাদেশ বেতার) থেকে প্রচারিত মুশায়েরা অনুষ্ঠানে সমাজের বিশিষ্ট কবি এবং সহিত্যিকরা উপস্থিত থাকতেন।
       ‘গুলিস্তানে-এ শরফ’ গ্রন্থের লেখক সৈয়দ শরফউদ্দীন শরফ আল হুসাইনী তাঁর বেগমবাজারের বাসভবনে মুশায়েরার আসর জমাতেন। উর্দু কবি নওশাদপুরী তাঁর বাসভবনে মুশায়েরার আয়োজন করতেন। এখানে উর্দু ভাষাভাষি লোকজন ছাড়াও বাঙালি কবি-সাহিত্যিকরাও স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করেছেন। সাবেক ওয়ার্ড কমিশনার, উর্দু সাহিত্যপ্রেমিক মরহুম আলহাজ মোহাম্মদ সাখী মিয়াও প্রায়ই মুশায়েরার আয়োজন করতেন।

Tuesday, February 12, 2019

গদ্য কবিতার ছন্দ - শেখ জলিল



   বাংলা কবিতার ইতিহাস অনেক প্রাচীন। যুগে যুগে এর বিষয় আঙ্গিক,ছন্দেও এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন। সেই যে চর্যাপদ থেকে যার যাত্রা শুরু তা এখন ঠেকেছে অতি আধুনিকতায়। আর এ আধুনিক কবিতার মূল বিবর্তন এসে স্থিত হয়েছে গদ্যছন্দে। তাইতো গদ্যছন্দেই লিখতে স্বাচ্ছন্দবোধ করেন আধুনিক কবিরা।


   আসলে গদ্য কবিতাই বা কী গদ্যছন্দই বা কীএককালে আমরা ছন্দোবদ্ধ অন্তমিলযুক্ত বর্ণনাকে পদ্য বলে জেনেছি। কিন্তু বর্তমানে কবিতার বিশালতায় এর ছন্দঅন্তমিলউপমাচিত্রকল্প কিংবা শারীরিক গঠনে লেগেছে আধুনিকতার ছোঁয়া। স্বরবৃত্ত্মাত্রাবৃত্ত বা অক্ষরবৃত্ত ছন্দ নিয়ে কতো বিচিত্রপ্রয়োগই না করছেন আধুনিক কবিরা। অক্ষরবৃত্তের পয়ার থেকে চতুর্দশপদীঅমিত্রাক্ষরমুক্তক ছন্দের যে বিবর্তনসে বিবর্তনের ধারায়ই এসেছে গদ্যছন্দ।

   গদ্যকবিতা বা গদ্যছন্দের শুরু হয় রবীন্দ্র যুগেই। রবীন্দ্র বলয় থেকে বেরিয়ে এসে যে ক'জন সমাজতন্ত্রী কবি গদ্যছন্দের প্রবর্তন করেন তাদের মধ্যে সুধীন্দ্রনাথ দত্ত-ই সবচেয়ে সফল। অবশ্য এর মধ্যেই বিষ্ণু দে প্রবর্তিত এক ধরনের গদ্যরীতি প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। মূলত ত্রিশের দশকের কবিদের হাতেই ঘটে গদ্যছন্দের ব্যবহার।

   রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কাজী নজরুল ইসলাম এবং জীবনানন্দ দাশ প্রথম প্রথম এর বিপক্ষে ছিলেন। প্রতিবাদস্বরূপ রবীন্দ্রনাথ তাঁর সম্পাদিত একটি পত্রিকায় গদ্যছন্দের কবিতা প্রকাশ বন্ধ রাখেন। কাজী নজরুল ইসলামতো ব্যঙ্গ করে একটি কবিতাই লিখে ফেলেন। অথচ জীবদ্দশাতেই রবীন্দ্রনাথ একে অনুমোদন দিয়ে গেছেন। কাজী নজরুল ইসলামের হাতেও ঘটেছে কবিতায় গদ্যরীতির সাধুবাদ। রবীন্দ্রনাথের 'রূপনারানের কূলে জাগিয়া উঠিলাম', নজরুলের 'লাথি মারভাঙরে তালাকিংবা জীবনানন্দের 'যারা অন্ধ সবচেয়ে বেশি চোখে দেখে তারাবাংলা কবিতায় গদ্যরীতির সফল প্রয়োগ। বিশ্বকবির 'হঠা দেখাবা বিদ্রোহী কবির 'আমার কৈফিয়তকৃষ্ট সুন্দর গদ্যকবিতা।

   যা বলছিলাম ত্রিশের কবিদের কথা- বিষ্ণু দে সুধীন্দ্রনাথ দত্তবুদ্ধদেব বসু সবাই ছিলেন গদ্যকবিতার অগ্রযাত্রী। এর মধ্যে সুধীন্দ্রনাথের গদ্যরীতিইকবিতায় সফলতা এনেছে। পঞ্চাশের দশকে বাংলাদেশের দু'জন কবি হাসান হাফিজুর রহমান এবং শহীদ কাদরী কবিতায় গদ্যরীতির প্রবর্তন করেন। এর মধ্যে শহীদ কাদরীর গদ্যরীতি সবচেয়ে সফলআটসাঁট এবং উল্লেখযোগ্য।

   গদ্যকবিতার ছন্দ বা গদ্যছন্দ আসলে কী নতুন কবিরা যখন আধুনিক কবিতা পড়েন তখন এর অন্তর্নিহিত ছন্দ খুঁজতে গিয়ে হিমশিম খান। অনেকে গদ্যকবিতাকে ছন্দহীন কবিতা ভাবতে থাকেন। কিন্তু গদ্যকবিতার ইতিহাস অনেক বিশাল। শুরুতেই বলেছিলাম পয়ার থেকে এর যাত্রা শুরু। অক্ষরবৃত্তের মুক্তক ছন্দে এসে এর নতুন বিবর্তন হয়েছে গদ্যছন্দে। তাই গদ্যছন্দের মূল স্বাদ আস্বাদনে সব কবিকেই চষতে হয় অক্ষরবৃত্ত ছন্দের বিশাল জমিন।

   গদ্যকবিতার রীতি একেক কবির কাছে একেক রকম। আধুনিক যে কবিরা গদ্যছন্দে সফলতা পেয়েছেন তারা সবাই প্রথম অক্ষরবৃত্তে লিখে হাত পাকিয়েছিলেন। আর তার ফলশ্রুতিতে তারা পেয়েছেন কবিতায় তাদের নিজস্ব গদ্যরীতি। হাসান হাফিজুর রহমানশহীদ কাদরী ছাড়াও শামসুর রাহমানআল মাহমুদসৈয়দ শামসুল হকআবু জাফর ওবায়দুল্লাহসাইয়িদ আতিকুল্লাহ প্রমুখ কবি গদ্যকবিতার অন্যতম পথিকৃত। ষাট ও সত্তর দশকের আবুল হাসানরুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ এবং আবিদ আজাদ ছিলেন বেশ সফল।

   কেউ বলেন উপমাই কবিতা। কেউ বলেন চিত্রকল্পকেউ বলেন অতীন্দ্রিক ভাবনাআবার কেউ বলেন বাস্তবের সাথে কল্পনার সংমিশ্রণ। আবার নতুন করে কাউকে কাউকে বলতে শুনি- যা গদ্য নয় তাই কবিতা। এ কথার সাথে অবশ্য ছড়াপদ্য বা লিরিকের একটা দ্বন্দ চলে আসে তখন। আসলে কবিতা অনেক বিমূর্তঅনেক ভাবনাবহুল। গদ্যকবিতার বা গদ্যছন্দের কথা বলতে গিয়ে কবিগবেষক আবদুল মান্নান সৈয়দ বলেছিলেন নাচের আসরের নর্তকীর দেহের অস্থি-মজ্জার কথা। আমি বলবো প্রতিটি মানুষের শারীরিক গঠনের কথা। প্রত্যেক মানুষই হাঁটে তার নিজস্ব ভঙ্গিতে। এ হাঁটা তার একান্তই নিজের। এ চলায়ও আছে তার নিজস্ব স্টেপ বা পদক্ষেপ এবংচলার নির্দিষ্ট দূরত্ব বা তাল। এ তাল- চলনই হলো একজন কবিতা লেখায় তার গদ্যরীতি। সুন্দর হাঁটা যেমন ব্যক্তিত্বকে ফুটিয়ে তোলেসুন্দর গদ্যরীতিও তাই। আর চলতে চলতে যদি ক্লান্তি আসে হঠা-ই থেমে পড়তে হয়- তবে চলারও যেমন ছন্দপতন হয়কবিতায়ও তেমনি। আসলে পাঠককে ধরে রাখাই গদ্যকবিতার মূল বৈশিষ্ট্য। পড়তে পড়তে পাঠক যাতে ক্লান্ত না হয় সেদিকে খেয়াল করলেই কবিতার গদ্যছন্দে আসবে কবির স্বার্থকতা।

১৩.০৬.২০০৬ 

Monday, February 4, 2019

কবিতা ও বিজ্ঞান - জগদীশচন্দ্র বসু

            কবি এই বিশ্বজগতে তাঁহার হৃদয়ের দৃষ্টি দিয়া একটি অরূপকে দেখিতে পান, তাহাকেই তিনি রূপের মধ্যে প্রকাশ করিতে চেষ্টা করেন। অন্যের দেখা যেখানে ফুরাইয়া যায় সেখানেও তাঁহার ভাবের দৃষ্টি অবরুদ্ধ হয় না। সেই অপরূপ দেশের বার্তা তাঁহার কাব্যের ছন্দে ছন্দে নানা আভাসে বাজিয়া উঠিতে থাকে। বৈজ্ঞানিকের পন্থা স্বতন্ত্র হইতে পারে, কিন্তু কবিত্ব-সাধনার সহিত তাঁহার সাধনার ঐক্য আছে। দৃষ্টির আলোক যেখানে শেষ হইয়া যায় সেখানেও তিনি আলোকের অনুসরণ করিতে থাকেন, শ্রুতির শক্তি যেখানে সুরের শেষ সীমায় পৌঁছায় সেখান হইতেও তিনি কম্পমান বাণী আহরণ করিয়া আনেন। প্রকাশের অতীত যে রহস্য প্রকাশের আড়ালে বসিয়া দিনরাত্রি কাজ করিতেছে, বৈজ্ঞানিক তাহাকেই প্রশ্ন করিয়া দুর্বোধ উত্তর বাহির করিতেছেন এবং সেই উত্তরকেই মানব-ভাষায় যথাযথ করিয়া ব্যক্ত করিতে নিযুক্ত আছেন।
           এই যে প্রকৃতির রহস্য-নিকেতন, ইহার নানা মহল, ইহার দ্বার অসংখ্য। প্রকৃতি বিজ্ঞানবিৎ, রাসায়নিক, জীবতত্ত্ববিৎ ভিন্ন ভিন্ন দ্বার দিয়া এক-এক মহলে প্রবেশ করিয়াছেন; মনে করিয়াছেন সেই সেই মহলই বুঝি তাঁহার বিশেষ স্থান, অন্য মহলে বুঝি তাঁহার গতিবিধি নাই। তাই জড়কে, উদ্ভিদ্‌কে, সচেতনকে তাঁহারা অলঙ্ঘ্যভাবে বিভক্ত করিয়াছেন। কিন্তু এই বিভাগকে দেখাই যে বৈজ্ঞানিক দেখা, এ কথা আমি স্বীকার করি না। কক্ষে কক্ষে সুবিধার জন্য যত দেয়াল তোলাই যাক্ না, সকল মহলেরই এক অধিষ্ঠাতা। সকল বিজ্ঞানই পরিশেষে এই সত্যকে আবিষ্কার করিবে বলিয়া ভিন্ন ভিন্ন পথ দিয়া যাত্রা করিয়াছে। সকল পথই যেখানে একত্র মিলিয়াছে সেইখানেই পূর্ণ সত্য। সত্য খণ্ড খণ্ড হইয়া আপনার মধ্যে অসংখ্য বিরোধ ঘটাইয়া অবস্থিত নহে। সেইজন্য প্রতি দিনই দেখিতে পাই জীবতত্ত্ব, রসায়নতত্ত্ব, প্রকৃতিতত্ত্ব, আপন আপন সীমা হারাইয়া ফেলিতেছে।

               বৈজ্ঞানিক ও কবি, উভয়েরই অনুভূতি অনির্বচনীয় একের সন্ধানে বাহির হইয়াছে। প্রভেদ এই, কবি পথের কথা ভাবেন না, বৈজ্ঞানিক পথটাকে উপেক্ষা করেন না। কবিকে সর্বদা আত্মহারা হইতে হয়, আত্মসংবরণ করা তাঁহার পক্ষে অসাধ্য। কিন্তু কবির কবিত্ব নিজের আবেগের মধ্য হইতে তো প্রমাণ বাহির করিতে পারে না! অজন্য তাঁহাকে উপমার ভাষা ব্যবহার করিতে হয়। সকল কথায় তাঁহাকে ‘যেন’ যোগ করিয়া দিতে হয়।
                   বৈজ্ঞানিককে যে পথ অনুসরণ করিতে হয় তাহা একান্ত বন্ধুর এবং পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষণের কঠোর পথে তাঁহাকে সর্বদা আত্মসংবরণ করিয়া চলিতে হয়। সর্বদা আত্মসংবরণ করিয়া চলিতে হয়। সর্বদা তাঁহার ভাবনা, পাছে নিজের মন নিজকে ফাঁকি দেয়। এজন্য পদে পদে মনের কথাটা বাহিরের সঙ্গে মিলাইয়া চলিতে হয়। দুই দিক হইতে যেখানে না মিলে সেখানে তিনি এক দিকের কথা কোনোমতেই গ্রহণ করিতে পারেন না। ইহার পুরস্কার এই যে, তিনি যেটুকু পান তাহার চেয়ে কিছুমাত্র বেশি দাবি করিতে পারেন না বটে, কিন্তু সেটুকু তিনি নিশ্চিতরূপেই পান এবং ভারি পাওয়ার সম্ভাবনাকে তিনি কখনও কোনো অংশে দুর্বল করিয়া রাখেন না।

               কিন্তু এমন যে কঠিন নিশ্চিতের পথ, এই পথ দিয়াও বৈজ্ঞানিক সেই অপরিসীম রহস্যের অভিমুখেই চলিয়াছেন। এমন বিস্ময়ের রাজ্যের মধ্যে গিয়া উত্তীর্ণ হইতেছেন যেখানে অদৃশ্য আলোকরশ্মির পথের সম্মুখে স্থুল পদার্থের বাধা একেবারেই শূন্য হইয়া যাইতেছে এবং যেখানে বস্তু ও শক্তি এক হইয়া দাঁড়াইতেছে। এইরূপ হঠাৎ চক্ষুর আবরণ অপসারিত হইয়া এক অচিন্তনীয় রাজ্যের দৃশ্য যখন বৈজ্ঞানিককে অভিভূত করে তখন মুহূর্তের জন্য তিনিও আপনার স্বাভাবিক আত্মসংবরণ করিতে বিস্মৃত হন এবং বলিয়া উঠেন “যেন” নহে – এই ‘সেই’।

Sunday, February 3, 2019

টানা গদ্য কবিতা : সতত ডানায় এক জন্মান্ধজনের রসাতল যাত্রা - রাশেদুজ্জামান


টানা গদ্য কবিতা : সতত ডানায় এক জন্মান্ধজনের রসাতল যাত্রা

                            - রাশেদুজ্জামান



  এক.নাট্যকার মলিয়ের মজা করে বলেছিলেন, All that is not prose is verse; and all that is not verse is prose. মলিয়েরের যুগ হতে কয়েকশো বছর দূরে সরে এসে আজ দেখি, কবিতারই রয়েছে  সুনির্দিষ্ট পরিচয়-সংকট। কবিতা যে কী, কিংবা কোনটা যে কবিতা নয় তা বোঝা আরও দুরূহ হয়ে উঠেছে এতদিনে। কবিতার ধ্বনিসজ্জা ছন্দিত, ভাব-পরিবেশ ছোঁয়া-যায়-কি-যায়-না এমন, আর ভাষা নিত্যদিনকার নয়,উপমা-রূপক-প্রতীক-চিত্রকল্প দিয়ে সুরতি। 



   কোনো শক্তিশালী আবেগের স্বতঃস্ফূর্ত উসারণ হচ্ছে কবিতাএমন কথাও শোনা গিয়েছিলো। কিন্তু শ্রুতিমধুর এ উক্তি যে কবিতাকে চেনায় নাতা বলা চলে। হ্যামলেটের সংলাপে যত কাব্যিক মধুরতা থাকুকওটি তো কবিতা নয়নাটকই। আর হেরমান হেসের সিদ্ধার্থও একটি উপন্যাস বা বাইবেলের ইংরেজি অনুবাদে যতই ক্যারিশমা থাকুকসেটিও কবিতা নয়,ধর্মগ্রন্থ। তাহলে টানা গদ্য কবিতা বলে যে লেখাগুলোকে দাবি করা হচ্ছে,তা যে কবিতাইকী প্রকারে নির্ধারিত হবে আসলে সুস্থির মানদণ্ডে বিচার অসম্ভবকেননা মানদণ্ডের নিজেরই মান ত্রুটিপূর্ণ। এ সমস্ত প্রসঙ্গের অবতারণা এই কারণে যেটানা গদ্য কবিতা আবির্ভূত হওয়ার দেড়শো বছরের বেশি পার হবার পর এই বঙ্গ ভূখণ্ডে দেখতে পাচ্ছি টানা গদ্য কবিতা রচনার হিড়িক পড়ে গেছে। বিষয়টি তরুণদের ক্ষেত্রে ত্রইএবংব্যাপক মাত্রায়। এর কারণ কি এই যেকবিতায় ছন্দের প্রয়োজন অবান্তর হয়ে গেছে বলে তারা ভাবছেন কিংবা যে কবিতাগুলো তাদের হাত থেকে বেরুচ্ছেতার জন্য টানা গদ্যই অপরিহার্য ফর্মবাএভাবে কবিখ্যাতি আয়ত্ত করা বেশ স্বস্তিকর? ? বিষয়টি নিয়ে ভাবা এখন আমাদের খুব গুরুত্ববহ বলে মনে হচ্ছে। বাংলা কবিতার ভবিষ্য যাদের হাতেসেই তরুণরা কি ছন্দহীনতার নতুন ঐতিহ্যবরণ করতে যাচ্ছেন সে তারা যা-ই করুনকবিকে টিকতে কিন্তু হবে কবিতার জোরেআর কবিতাকে শিল্পের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতেই হবে।

দুই.
   আমরা যাকে বর্তমানে টানা গদ্য কবিতা বলছি
 ইংরেজিতে তা Prose Poem নামে পারচিত। Prose Poem বলতে বোঝানো হয়ে থাকে এমন কবিতাকে যা বহন করে কবিতার সমস্ত গুণাবলীযদিও দেখতে গদ্যের মতো। গদ্যাকারে সাজানো হলেও এর ভাষা কবিতার মতো সুললিতঅন্তর্লীন ছন্দপ্রবাহে গতিশীলআবেগ সংক্রামককল্পনার জগতেরউপমা-চিত্রকল্পে আবৃত এবং এর অভিঘাত কবিতারই। আসলে টানা গদ্যের মাধ্যমে কবিতা তার প্রথাগত চেহারা থেকে সরে এসেছে। আধারের বিভিন্নতা ত্যাগ করে হয়ে উঠেছে আধেয়-নির্ভর।
   প্রশ্ন জাগতে পারে গদ্য তো টেনেই লেখা হয়তাহলে এই ফর্মটিকে টানা গদ্য কবিতা বলার কারণ কী আসলে ইংরেজিতে যাকে free verse বলে,বাংলায় তার নাম দেওয়া হয়েছে গদ্য কবিতা এবং এটি কিন্তু কবিতার প্রথাগত চেহারাতেই রচিত হয়েছে (free verse কে গদ্য কবিতা বলা সঙ্গত কিনা তা ভেবে দেখা উচিত। গদ্য শব্দটি উচ্চারিত হলেই আমাদের মনে গদ্যের আকৃতিটিও ভেসে ওঠেএবং প্রকৃতিওসেখানে কবিতার প্রচলিত ছন্দের কোনো জায়গা নেই। free verse কে গদ্য ছন্দ না বলে একে মুক্ত ছন্দ [মুক্তক নয়] বলা যেতে পারেকেননা ছন্দের নিয়মিত পর্বভেদ এতে নেই কিন্তু তা সত্ত্বেও সূক্ষ্মভাবে ছন্দশাসন থাকে। দেখা যায় একটি ছন্দ-পর্ব আরেকটির মধ্যে এমনভাবে ঢুকে পড়ে যে সবসময় তাকে আলাদা করা যায় নাএবং তা সত্ত্বেও তার উপস্থিতি থাকে) । এর জন্য রবীন্দ্রনাথ কিংবা সমর সেনের  বা অন্য কোনো কবির গদ্য কবিতা স্মরণ করতে পারি। এই গদ্য কবিতাকে টেনে গদ্যের মতো সাজালে যে চেহারা পাওয়া যাবেতা-ই টানা গদ্য কবিতা। এটা প্রচলিত মত। কিন্তু ছন্দে কবিতা লিখে যদি তা গদ্যের মতো করে সাজানো যায়তাহলেও কি তা টানা গদ্য কবিতা নামে চিহ্নিত হবে হাল আমলে অনেককেই আমরাদেখছি গদ্যের মতো লিখলেও ভেতরে প্রথানুগ ছন্দ ব্যবহার করছেন। আমরা অবশ্য এখানে প্রচলিত পরিভাষাই ব্যবহার করবো।

তিন.
   Writing free verse is like playing tennis with the net down,বলেছিলেন রবার্ট ফ্রস্ট। এই উক্তিটিকে ব্যজস্তুতি হিসেবে নিলে দাঁড়ায় : গদ্য কবিতা অত্যন্ত কঠিন একটি কাজ কেননা ছন্দ নেই কিন্তু তার অদৃশ্য উপস্থিতিকে (ছন্দতো খানিকটা চোখে দেখার ব্যপারও) অক্ষন্ন রাখতে হয়। এটি দক্ষ শিল্পীর কাজই বটে। পুনশ্চ কাব্যের ভূমিকাতে রবীন্দ্রনাথকে বলতে শুনি :

   গদ্যকাব্যে অতি নিরূপিত ছন্দের বন্ধনকে ভাঙাই যথেষ্ট নয়পদ্যকাব্যে ভাষার প্রকাশরীতিতে যে সলজ্জ অবগুণ্ঠনপ্রথা আছে তাও দূর করলে তবেই গদ্যের স্বাধীন ক্ষেত্রে তার সঞ্চরণ স্বাভাবিক হতে পারে। অসংকুচিত গদ্যরীতিতে কাব্যের অধিকারকে অনেকদূর বাড়িয়ে দেওয়া সম্ভব এই আমার বিশ্বাস
   বাংলায় গদ্য কবিতা রবীন্দ্রনাথ যখন লিখতে শুরু করেন তখন যে সমস্যাগুলো অতিক্রম করতে হবে ভেবেছিলেনতা এখানে বলতে চেয়েছেন। রবীন্দ্রনাথের হাতে পুনশ্চ কাব্যে গদ্যছন্দে যে কবিতা আমরা পেয়েছিতা বাংলা টানা গদ্য কবিতার পথিকৃ অনেকটাই। অবশ্য লিপিকার ভূমিকাকেও ছোট করে দেখলে চলবে না।  আমাদের ধারণা : ছন্দমুক্তির একটি চূড়ান্ত রূপ হচ্ছে এই টানা গদ্য কবিতা। মধুসূদনের হাতে যখন অমিত্রার ছন্দের আবির্ভাব হলো তখন সবচেয়ে বড় পদপেটি আসলে রচিত হয়ে গেল। এরই ধারাবাহিকতায় মুক্তকের আবির্ভাব বলা যেতে পারে। সেখান থেকে গদ্য ছন্দে যাত্রা একটি বড়সর লম্ফ বটে। কিন্তু মনে রাখতে চাই গীতাঞ্জলির যে গানগুলি বিশ্বের শ্রদ্ধা-সম্ভ্রম আকর্ষণ করতে পেরেছিলোসেসব আসলে ইংরেজি গদ্যে অনূদিত হয়েও পেরেছিলো। এটি রচয়িতাকে তো বটেই অন্যদেরও সাহস জুগিয়েছিলো বলতে হবে। বাংলা ভাষার প্রথম গদ্যছন্দে রচিত কবিতার কবি হচ্ছেন প্রেমেন্দ্র মিত্র। রবীন্দ্রনাথসমর সেন বা অন্য কারোর পদ্যঢঙে লেখা কবিতাকে (প্রথাগত কবিতার পঙক্তির মতো সাজানো কবিতাকে) যদি গদ্যের মতো সাজিয়ে দেইতাহলে কি তা ব্যর্থ হয়ে যাবে আমাদের বিশ্বাস সব ক্ষেত্রে তা সফল হবে না। প্রথমে প্রেমেন্দ্র মিত্রের এই পঙ্ক্তি কটি  পাঠ করা যাক ওপরে তার টানা গদ্যের রূপটিও
১.(ক) সেইসব হারানো পথ আমাকে টানে
         কেরমানের নোনা মরুর ওপর দিয়ে,
         খোরাশান থেকে বাদক্শান,
         পামিরের তুষার-পৃষ্ঠ ডিঙিয়েইয়াকন্দ থেকে খোটান
         শ্রান্ত উটের পায়ে পায়ে যেখানে উড়েছে মরুর বালি,
         চমরীর ক্ষুরে লেগেছে বরফ-গলা কাদা 
         বাদকশানের চুনি আর খোটানের নীলার নিষ্ঠুর ঝিলিক-দেওয়া,   
         ভেঙে-পড়া ক্যারাভানের কঙ্কালে আকীর্ণ
         লুব্ধ বণিক আর দুরন্ত দুঃসাহসীর পথ
         লাদাকের কস্তুরীর গন্ধ যেখানে আজো লেগে আছে পুরানো স্মৃতির মতো
                                                                                         (পথ,সম্রাট)

১.(খ)   সেইসব হারানো পথ আমাকে টানে; —কেরমানের নোনা মরুর ওপর দিয়েখোরাশান থেকে বাদক্শানপামিরের তুষার-পৃষ্ঠ ডিঙিয়ে,ইয়াকন্দ থেকে খোটান। শ্রান্ত উটের পায়ে পায়ে যেখানে উড়েছে মরুর বালিচমরীর ক্ষুরে লেগেছে বরফ-গলা কাদা। বাদকশানের চুনি আর খোটানের নীলার নিষ্ঠুর ঝিলিক-দেওয়াভেঙে-পড়া ক্যারাভানের কঙ্কালে আকীর্ণলুব্ধ বণিক আর দুরন্ত দুঃসাহসীর পথজ্জলাদাকের কস্তুরীর গন্ধ যেখানে আজো লেগে আছে পুরানো স্মৃতির মতো।
   আমাদের ধারণা এখানে ১.ক-তে যে উদাত্ততা আছে তা পরের অংশে অর্থা ১.খ-তে নেই। একইভাবে সমর সেনের কবিতাগুলিকে যদি গদ্যের মতো সাজানো যায়তার ফলও নেতিবাচক হবে। টানা গদ্যে গতি চারিয়ে দেওয়া যায়যেমন মান্নান সৈয়দ দিয়েছেন। যেখানে কবিতাটি আখ্যানকে সঙ্গী করেছে সেখানেও এটি সফল হতে পারে। জীবনানন্দের শিকার কবিতাটি নিয়ে এই নিরীক্ষা চালানো যেতে পারে। কিন্তু অন্ধকার কবিতাটির বেলায় এই প্রয়াস ব্যর্থ হতে বাধ্য। আবারআখ্যান থাকলেওতা যদি উদাত্ত স্বভাবের হয়যেমনরবীন্দ্রনাথেরই শিশুতীর্থতা সফল হবে না সম্ভবত। গদ্যের মধ্যে যে গড়িয়ে গড়িয়ে চলার প্রবণতা আছে,আছে পরের বাক্যটিকে স্পর্শ করার স্বভাবসেটি তো পদ্যঢঙে নেই। পদ্যঢঙে যেটি আছেসেটি আবার তার নিজস্বপঙক্তিগুলো দাঁড়িয়ে থাকে একাকীবিচ্ছিন্ন ও শূন্যতার প্রতিস্পর্ধী হয়ে যেন। প্রচল চেহারার কবিতা হচ্ছে অনেকটা গাছের মতোযে মৃত্তিকায় জন্মালেও সোজা উঠে গিয়ে আলিঙ্গন করতে চায় মেঘলোককে আর অন্যদিকে টানা গদ্য কবিতার ধরন যেন লতা স্বভাবেরযার প্রকৃতি কোনো কিছুকে আকড়ে অগ্রসর হওয়া সে ছুঁতে চায় দিগন্তকে।


   ১৮০০ খ্রিস্টাব্দে জর্মন কবি নোভালিস প্রেমিকার মৃত্যুজনিত বিষাদকে রূপ দিলেন
 Hymnen an die Nacht (1800; Hymns to the Nightগ্রন্থে। টানা গদ্যে লেখা এই ছয়টি কবিতার মধ্যে প্রবিষ্ট হয়েছে ছন্দিত পঙক্তিও। কবি হোল্ডার্লিনও লিখেছিলেন কিছু এমন কবিতা। এদেরই দিতে পারি প্রবর্তকের শিরোপা। ফরাসিদের মধ্যে প্রথম এ ধরনের কবিতা  লেখেন বার্ট্রান্ড লুইস। তার এধংঢ়ধফ ফব ষধ হঁরঃ Gaspard de la nuit (1842; “Gaspard of the Night”) নামের বইটির মাধ্যমে টানা গদ্য কবিতার সূত্রপাত হলো,যদিও এটি তার জীবদ্দশায় তেমন গুরুত্ব পায়নি (তিনি অবশ্য স্মরণীয় হয়ে ওঠেন প্রতীকবাদী আন্দোলনের আদি-গুরু হিসেবে)। কিন্তু তার মৃত্যুর পর শার্ল বোদলেয়ারযিনি আধুনিকতাবাদী কবিতার জনয়িতা ও দণ্ডিত শহিদকবিতার ছন্দ-প্রশাসন ভাঙা এই নতুন ফর্মটিকে অমরতা দিলেন।Petite poèmes en prose নামের বইটি প্রকাশিত হলো তার মৃত্যুর পরে ১৮৬৯ সালে এবং পরে রচয়িতার ইচ্ছা অনুযায়ীএর নাম দেওয়া হলো :Le Spleen de Paris (Abyev‡` The Parisian Prowler, 2nd ed., 1997).. এভাবে পাঠকের সামনে এলো এমন লেখা যেটি প্রচারিত কবিতা হিসেবেকিন্তু তাতে নাই ছন্দের বালাইউপরন্তু দেখতে গদ্যের মতো। ভাষার জায়গাতে এটিকে যে গদ্যের সাথে মেলানো যায় নাতা সবাই দেখতে পেলেন। বোদলেয়ারের টানা গদ্য কবিতা Be Drunk থেকে:
And if sometimes, on the steps of a place or the green grass of a ditch, in the mournful solitude of your room, you wake again, drunkenness already diminishing or gone, ask the wind, the wave, the star, the bird, the clock, everything that is flying, everything that is groaning,  everything that is rolling, everything that is singing, everything that is speaking…ask what time it is and wind, wave, star, bird, clock will answer you : “It is time to be drunk! So as not to be the martyred slaves of time, be drunk, be continually drunk! On wine, on poetry or on virtue as you wish.” 

   এরপর মালার্মের হাত থেকেও বেরিয়ে এসেছে বেশ কিছু টানা গদ্য কবিতা। ফরাসিদের এই ধরনের কবিতার ঐতিহ্য ভালোই আছে। কিন্তু ইংরেজিতে টানা গদ্য সম্ভব নয়এমন ধারণাই চালু ছিলো দীর্ঘদিন ম্যথু আর্নল্ড এর প্রয়াস সত্ত্বেও। ষাট-সত্তরের দশকে এই ধারণা পাল্টে যায় আমেরিকানদের হাতেরবার্ট ব্লাইএ্যালেন গিন্সবার্গচার্লস সিমিকজেমস রাইটরাসেল এডসন প্রমুখ কবির প্রয়াসে। আর আশির দশকে এটি গুরুত্ব পেতে শুরু করে বিভিন্ন সংকলনে ঠাঁই দেয়া হতে থাকে টানা গদ্য কবিতাকে। একক সংকলনও প্রকাশিত হতে থাকে। সারা বিশ্বেই এই ফর্মটি ছড়িয়েছেগৃহীত ও অভ্যর্থিত হয়েছে। ¯প্যানিশ ভাষায় অক্টাবিও পাজও উল্লেখযোগ্য কাজ করেছেন তার Eagle or Sun?? গ্রন্থে। একই ভাষার অপর দুই কবি এঞ্জেল ক্রেসপো ও গিয়ান্নিনা ব্রাশি করেছেন সবচেয়েউল্লেখযোগ্য কাজ। দ্বিতীয়জন পাঠকের সামনে উপস্থিত করতে পেরেছেন টানা গদ্য কবিতার একটি ট্রিলজি, El imperio de los suenos (1988, Empire of Dreams)


   সুধীন্দ্রনাথ দত্তের সময়ে গদ্য কবিতা রচনার হিড়িক পড়ে গিয়েছিলো
 আর তা দেখে যুগপ হতাশ ও বিরক্ত হয়েতিনি ওগুলোর নাম দিয়েছিলেন, ‘বাক-সর্বস্ব ভূতের বাসা’ ! কারণ তার বিবেচনায় কবি-প্রতিভার একমাত্র অভিজ্ঞানপত্র ছন্দ-স্বাচ্ছন্দ্য। অবশ্য কেবল রবীন্দ্রনাথের গদ্য কবিতাগুলোকে তিনি গ্রহণ করেছিলেন এই যুক্তিতে যেরবীন্দ্রনাথের দীর্ঘজীবনব্যাপী সাধনার প্রেক্ষিতে বিষয়টি স্বাভাবিক। বর্তমান বাংলাদেশে যেভাবে দুহাতে টানা গদ্য কবিতা লেখা হচ্ছেতা দেখলে কেমন বোধ করতেন তিনি ?মনে হয় অত্যন্ত বিমর্ষ বোধ করতেন। তিনি নিজে ভেবেছিলেনএকসময় গদ্য ও পদ্যের কৃত্রিম ব্যবধান উঠে যাবেআর তা অনিবার্য শিল্প পরিণতিএমন বিবেচনা থেকেই। বিখ্যাত প্রায় সব কবিই গদ্য ছন্দে লিখেছেন,হয়তো জাড্য কাটাতেও। টানা গদ্যে কবিতা লিখবার যে ঝোঁক তা এলো মূলত ষাটের দশকে। আর অত্যুতসাহ দেখা যাচ্ছে এই দশকে।  কিন্তু আমরা বাংলায় প্রথম টানা গদ্য কবিতা রচয়িতার মুকুট দেবো কাকে ?আমাদের বিশ্বাস এক্ষেত্রেও রবীন্দ্রনাথই এর কৃতিত্বভাগী। তার লিপিকার বেশ কিছু লেখা কোনো সন্দেহ ছাড়াই যে কবিতাতা বলা যায়। আমরা এ বিষয়েও সুধীন্দ্রনাথ দত্তের মত গ্রহণ করতে পারি। তিনিও এগুলোকে বলেছিলেন গদ্যবেশী কাব্য। পায়ে চলার পথপ্রভাত ও রাত্রি ইত্যাদি লেখাগুলোবলেছিলেন সুধীন্দ্রনাথ, ‘যে-মুহূর্তে চেচিয়ে পড়া যায়তখনই এদের কাব্যরূপ ফুটে ওঠে।’ ওই রচনাগুলোতে তিনি ল করেছিলেন উপমার স্বপ্নময়তাচিত্রময়তা। মালার্মের একনিষ্ঠ অনুসারী হলেওতার মনে হয়তো মালার্মে রচিত টানা গদ্য বিষয়ে দ্বিধা ছিলো বা এই ফর্মটাকে তার ক্ল্যাসিক-মন পুরো গ্রহণ করে নিতাই তিনি লিপিকার ওই লেখাগুলোকেঅকুণ্ঠ ভাষায় কাব্য বলেন নি। ওগুলো যে কবিতা এ নিয়ে রবীন্দ্রনাথের মনের দ্বিধা পরে কেটে গিয়েছিলো । আমরা দেখি বুদ্ধদেব তার আধুনিক কবিতার সংকলনেও লিপিকার থেকে কবিতা অন্তর্ভুক্ত করছেন। পুনশ্চের ভূমিকা থেকে আবার উদ্ধৃত করিরবীন্দ্রনাথ বলছেন :
ছাপবার সময় বাক্যগুলিকে পদ্যের মতো খণ্ডিত করা হয় নিবোধ করি ভীরুতাই তার কারণ 
 আজকের বিবেচনা থেকে বুঝিওগুলো আসলে টানা গদ্য কাবতারবীন্দ্রনাথ টানা গদ্য কবিতার সচেতন স্রষ্টা ননকিন্তু প্রথম স্রষ্টা এবং প্রতিভার অনন্যতা এখানেও অবারিত :
 এখানে নামল সন্ধ্যা সূর্যদেবকোন্ দেশেকোন্ সমুদ্রপারেতোমার প্রভাত হল
 অন্ধকারে এখানে কেঁপে উঠছে রজনীগন্ধাবাসরঘরের দ্বারের কাছে অবগুণ্ঠিতা নববধূর মতো ; কোন্খানে ফুটল ভোরবেলাকার কনকচাঁপা
 জাগল কে নিবিয়ে দিল সন্ধ্যায়-জ্বালানো দীপফেলে দিল রাত্রে গাঁথা সেঁউতি ফুলের মালা
 এখানে একে একে দরজায় আগল পড়লসেখানে জানালা গেল খুলে এখানে নৌকো ঘাটে বাঁধামাঝি ঘুমিয়ে ; সেখানে পালে লেগেছে হাওয়া
ওরা পান্থশালা থেকে বেরিয়ে পড়েছে
পূবের দিকে মুখ করে চলেছেওদের কপালে লেগেছে সকালের আলোওদের পারানির কড়ি এখনো ফুরোয় নি;ওদের জন্য পথের ধারের জানালায় জানালায় কালো চোখের করুণ কামনা অনিমেষ চেয়ে আছেরাস্তা ওদের সামনে নিমন্ত্রণের রাঙা চিঠি খুলে ধরলে,বললে, “তোমাদের জন্যে সব প্রস্তুত” 
 ওদের হৃদপিণ্ডের রক্তের তালে তালে জয়ভেরী বেজে উঠল           
                                                                                                                                          (সন্ধ্যা ও প্রভাতলিপিকা)

   পরবর্তীকালের টানা গদ্য কবিতার মুখ্য বৈশিষ্ট্য এই কবিতাটির উদ্ধৃত অংশে আছে এবং চমকারিত্বও। কবির জিজ্ঞাসাঅনুযোগ কি বিস্ময়কে তিনি আড়াল করেছেন দাড়ি ব্যবহার করে। অন্যদিকে এর ভাষায় আছে গতিশীলতা। আবার ধ্বনির দিক যাচাই করলে দেখবোএই লেখাতে সূভাবে অরবৃত্তের এবং কখনো মাত্রাবৃত্তের একটি অন্তঃসলিলা প্রবাহ বিদ্যমান। গদ্য কবিতাতেও একটি সুর থাকা চাইযেটি লেখাটির ভাষাকে গদ্য থেকে পৃথক করবে। রবীন্দ্রনাথ এটি পেরেছেন।


   ফরাসি কবিতার অনুরাগী ও রেবোর অনুবাদক কবি অরুণ মিত্র টানা গদ্যে আদ্যন্ত
 একটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ করলেনসের দিকে (১৯৫৪খ্রি.)। বাংলায় এটি টানা গদ্য কবিতার প্রথম একক বই। ফরাসি প্রতীকবাদের দ্বারা স্পৃষ্ট এর গদ্য-বিন্যাস।
   ষাটের দশকের শেষের দিকে আবদুল মান্নান সৈয়দ যখন আদ্যন্ত-প্রায় টানাগদ্যে লেখা জন্মান্ধ কবিতাগুচ্ছ প্রকাশ করলেনতখন দারুণ হৈচৈ পড়েগিয়েছিলোজমে উঠেছিলো বিতর্ক। একে তো পরাবাস্তববাদের অভিনবত্বের চাপ (জীবনানন্দের কিছু উদাহরণ বাদ দিলে)অন্য দিকে ছন্দ অস্বীকার করেকবিতার চেনা অবয়ব পাল্টেগদ্যের মতো সাজিয়ে পাঠককে ভ্যাবাচ্যাকা খাইয়ে দিলেন। এই বইয়ের আগেও টানা গদ্য বাংলাভাষী পাঠক লক্ষ করেছে শক্তি চট্টোপাধ্যায় (জরাসন্ধ) কি শঙ্খ ঘোষের (দিনগুলি রাতগুলি) দু-একটি রচনায় ও অরুণ মিত্রের সের দিকে গ্রন্থে। কিন্তু এই বইয়ের মাধ্যমে বাংলাভাষায় টানা গদ্যের একটি বড় পদক্ষেপ আমরা দেখতে পেলাম। আবদুল মান্নান সৈয়দ তখন তরুণ এবং ওটি তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ। এই বইয়ের টানা গদ্যের বিশিষ্টতা ছিলো :
   ১. জ্যোস্না ভূতের মতো দাঁড়িয়ে আছে দরোজায়সব দরোজায়আমার চারিদিকে যতোগুলি দরোজা আছে সময়ের নীলিমার পাতালের ; জ্বলছে গাছসকল সবুজ মশালবাস একটি নক্ষত্রপুলিশ একটি নক্ষত্রদোকান একটি নক্ষত্র : আর সমস্তের উপর বরফ পড়ছেএরকম দৃশ্যে আমি অহত হয়ে শুয়ে আছি পথের উপরআমার পাপের দুচোখ চাঁদ ও সূর্যের মতো অন্ধ হয়ে গেলআর যে-আমার জন্ম হলো তোমাদের করতলে মনোজ সে অশোক সে : জ্যোস্না তার কাছে ভূত কিন্তু একটি গানের উপরদরোজা তার কাছে পুলিশ কিন্তু একটি জন্মের উপরমৃত্যু তার কাছে দোজখ কিন্তু একটি ফুলের উপর 
(
 অশোককাননজন্মান্ধ কবিতাগুচ্ছ)
 
   ২. এই রাত্রিরা বেথেলহাম-কে ব্রথেলে পরিণত করে
করুণ কবাটের মতো ঝোলানো বাড়ির দেয়াল থেকে লুটিয়ে থাকে যেন বর্ম কিংবা বিরুদ্ধ পদ্ধতি হাওয়াররূপালি চাবির অভাবে এই রাত্রিরা সেই লাল আলোর ভালো যা তোমাকে প্রশস্ত স্ট্রীট থেকে নিয়ে যাবে কঙ্কালের সরু-সরু পথে,অনাব্য স্ত্রীর মতো কেবলি অন্যদিকে;—যখন জানালায় ছিন্নপত্র ঝরে অবিচ্ছিন্নলোকালোক পুড়ে যায় বরফে এই রাত্রিরা জিরাফের গলা বেয়ে লতিয়ে উঠতে দেয় আগুনযেটা আমাদের আকাক্সাঅবশ্য যদি তার মাংস হতে রাজি হই তুমি আর আমি ; ঈশ্বর নামক গৃহপালিত মিস্তিরি ভুল সিঁড়ি বানাচ্ছে আমাদের উঠোনে বসেআগুনেরযে-অসম্ভবের সিঁড়িতে উঠতে-উঠতে আমরা সবাই পাতালে নেমে যাবো হঠা
 সিংহের খাঁচায় বসে আমি গল্প লিখছি মনে-মনে 
                                                        (পাগল এই রাত্রিরাজন্মান্ধ কবিতাগুচ্ছ)

   চিন্তার অভিনবত্বের সাথে ভাষায় যে ঘোর তৈরি করেছেন এখানে কবিতা পঠককে লেখাটি পুনর্পঠনে প্ররোচিত করে। পরাবাস্তবতার অচেনা মহলে প্রবেশ করিয়ে দ্রুত এক প্রসঙ্গ থেকে অন্য প্রসঙ্গে যেতে যেতে কবি অর্থ-উদ্ধারের আকাক্সাকে যেন ভুলিয়ে দেন। কবিতাগুলোপ্রচলিত ব্যাকরণকে পাশ কাটিয়ে অনাব্য স্ত্রীর মতো কেবলি অন্যদিকে যেতে প্ররোচিত করে,  যেহেতু লোকালোক পুড়ে যেতে থাকে বরফে। সিংহের খাঁচায় বসে লেখা এইসব গল্পের ভাষা বেশ দ্রুতগতির। তার টানা গদ্যের কবিতার বৈশিষ্ট্য মূলত এরকমই । অবশ্য বেশ প্রসন্ন ও মন্থর ভঙ্গির লেখাও তার আছে। পাঠকের মনে পড়বেএকই কাব্যগ্রন্থের পরস্পর কবিতাটি। টানাগদ্যে আখ্যান বা কাহিনি ব্যবহার করার চেষ্টা তার পরের দিকের দুএকটিকবিতায় ল করি। অবশ্য কবিতাগুলিকে সফল বলা যাবে না।
   এর পরে ষাটের দশকের আরেক তরুণ সিকদার আমিনুল হক সত্তুরের দশকে বের করলেন তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ দূরের কার্নিশযার অর্ধেক জুড়ে আছে এই টানা গদ্য। বাংলাভাষায় টানা গদ্যের তিনিই সম্ভবত সবচেয়ে একনিষ্ঠ ও শ্রেষ্ঠতম শিল্পী। আবদুল মান্নান সৈয়দের প্রথম বইয়ের পর দ্বিতীয় বইতে (জ্যোস্না ও রৌদ্রের চিকিসা) কিছু টানা গদ্যের কবিতা লক্ষ করিএবং পরে কবি এ থেকে আরও সরে আসেন। অন্যদিকে সিকদার আমিনুল হক প্রথম বইয়ের পর টানা গদ্য কবিতা লেখেন নি দীর্ঘকাল। নয়ের দশকে এসে পরিণত মনন নিয়ে প্রকাশ করলেন আদ্যন্ত টানা গদ্যকবিতার বই সতত ডানার মানুষ। সম্ভবত এটিই বাংলাভাষার প্রথম টানা গদ্য কবিতার বই (জন্মান্ধ কবিতাগুচ্ছ-এ ছন্দে লেখা দুটো কবিতা রয়েছে।)। এর আরও পরে এলো তার একই ধারার আরও একটি কাব্যগ্রন্থ বাতাসের সঙ্গে আলাপ। আমরা জানি আকস্মিক মৃত্যু কবিকে ছিনিয়ে না নিলে তিনি টানা গদ্য কবিতার একটি ট্রিলজি পুরো করতেনযা শেষ হতো আদ্যন্ত টানা গদ্যের তৃতীয় কাব্যগ্রন্থে। তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ দূরের কার্নিশ থেকে এবার পাঠ করা যাক :
   আমাকে শিখতে হয়েছে সব একা
নবজাতকের মতো ঘ্রাণের মধ্যে আমি ঝড়ো হাওয়ার চিহ্ন পাই অশ্রুত পথের পাশে দাড়িয়ে মৌমাছির মতো বলতে পারি সোজাসুজি ফুলেদের নাম তবু সে বালক কোনো সম্মান পায় নি!
    এখন বিষয়বস্তুর মধ্যে তাই জল বার বার ফিরে আসে সমুদ্র থেকে ফিরে এলে নাবিকের স্বপ্নের ভিতরে যেমন ফিরে আসে হাঙরের ঝাঁঝালো জিহ্বা,অথবা হৃতবস্ত্র নারীর জঙ্ঘার উপরে বারবার ফিরে আসে যেমন ধর্ষণের বাতাস!….
 অহঙ্কারের শেষ হয়েছে আমি তাই জলের মধ্যে বার বার ফিরে আসি এই ভাবে জন্ম নেয় সমুদ্র আর্দ্র নির্লজ্জ নারীর হাতে সমুদ্রের আক্রমণ যা প্রতি প্রত্যূষে আমার রক্তকে রঞ্জিত করে
 আমাদের জন্ম-জন্মান্তর জলের মধ্যে সেই বিশাল পদচিহ্নের ইতিহাসআমাদের ওষ্ঠদেশ সেই লবণচিহ্ন থেকে এখনো পরিত্রাণ পায়নি…..
  (বৃত্তান্তদূরের কার্নিশ )

   গতির দ্রুততা ও চিত্রের উল্লম্ফন সিকদার আমিনুল হকের বৈশিষ্ট্য নয়। এক প্রসন্ন বিহ্বলতা যেন তাকে বলতে প্ররোচিত করে। কবিতায় তার ভাষা মৃদুশান্তঅচঞ্চলসাবলীলও পরিকল্পিত। এক অনুচ্চ অন্তর্লীন ও দূরাভিসারী সঙ্গীতের প্রবাহ একে ঘিরে আছে। বিষয়কে প্রতীকায়িত করে এক প্রলুব্ধকর অস্পষ্টতা তৈরির প্রবণতা এই বইয়ের কবিতায় আমরা পাবো। কিন্তু সিকদারের আত্মমুদ্রাও এখানে অঙ্কিত হয়ে গেছে। শিল্প-তীর্থের উদ্দেশে এক আভিযাত্রা বা সেই অভিযাত্রার বয়ান এই কাব্যযা অঙ্গীভূত করে নিয়েছে জীবন কিংবা নারীর শিল্প-সারার্থ উন্মোচনের দায়অস্পষ্ট করে হলেও— মানুষের প্রতি অঙ্গীকার। এবার পাঠ করতে পারি এই অংশটি :
মানুষকে কোনো কথাই বলা হয়নিতবু সে জেনে নিয়েছে পাথরের ভাষাওজন করতে শিখেছে ব্রোঞ্জ আর নিরাবরণ নারীর বিশালতাঝাঁঝালো রূপসীর পশ্চাদেশের বিশালতা কোনো সমুদ্রও নয়তবুও সেখানে নোঙরের জন্য চঞ্চল ইচ্ছাই শব্দগুচ্ছের মর্যাদা পায়না হয় নারীতোমাকেই,শেষবার অভিবাদন জানাবো
(
 পদদলিত শিরস্ত্রাণদূরের কার্ণিশ)
   পরবর্তী সকল কাব্যেবিশেষত টানা গদ্যের কাব্য দুটিতে নারীর প্রতিঅভিবাদন রচিত হয়েছে অকুণ্ঠ ভাষায়। নারী নামক বন্দরে নোঙরের আর্তিই এর অন্যতম মুখ্য প্রবণতা। দূরের কার্নিশে প্রতীকায়িত জলও পরবর্তীকালে ফিরে এসেছে বার বার কিন্তু অন্যরূপে। তার মৃত্যুর পরে আজ আমি আমরণ সমুদ্রের দিকে যাবো’ এই প্রত্যয়ী উচ্চারণের গভীরতা আমরা অনুভব করতে পারি। সিকদার আমিনুল হকের টানা গদ্যের বিশিষ্টতা ও বৈশিষ্ট্য অনুধাবন করতে গেলে আমাদের তার পরবর্তী কাব্য দুটিসতত ডানার মানুষ ও বাতাসের সঙ্গে আলাপ পাঠ করতে হবে অভিনিবেশের সাথেযেখানে কবি হয়ে উঠেছেন আরও অভিজ্ঞপ্রাজ্ঞ ওল্যভেদী। কবি হয়ে উঠেছেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী। এটি আসলে তার কাব্যের একটিস্বতন্ত্র পর্ব। সতত ডানার মানুষ  থেকে উদ্ধৃত করা যাক :
১.    ….আজ আমি প্রসঙ্গত নারীর কথাই বলবোআমার অনেক অভিজ্ঞতা হয়েছেএখন আমি মানুষের লালসা নিয়েও ঠাট্টা করতে পারিবয়স হলো সেই উটবালুর অন্ধকার ঝড়ের মধ্যেও যে তার মালিকের পাগড়ির রঙ ঠিকঠিক চিনতে পারেঅথচ উটকে দেখতে পায় না কেউ
 
২.    
মৃত্যু সেই পরিচিত তরবারিযা আমাদের হাত থেকে স্বজনেরা নেয়ার মুহূর্তেও আমরা যার ধারালো যন্ত্রণার কথা বিস্মৃত হয়ে আকাশ কিংবা জরির মতো কাজ করা মেঘের দিকে তাকিয়ে থাকিএবং তার ছায়া ও ভীতি অপসৃত হওয়ার আগেই রূপসী নারীর সঙ্গম স্পৃহার দিকে শরীরে জন্তুর গন্ধ নিয়ে এগিয়ে যাই
 
৩.    
শেষ কথা স্বৈরশাসক আর দুর্ধর্ষ বর্বর বিজয়ী সম্রাটের মুখেই মানায়;যাঁদের দম্ভ আর শক্তির একটি করুণ ডানা মৃত পতঙ্গের মতো সমুদ্রের বালির ওপর অতি নির্বাসনে পড়ে থাকে
   ওপরের তিনটি উদ্ধৃতিতেই একটি বিশেষ কৌশলযা তার বৈশিষ্ট্যচোখে পড়ে আমাদের। সেটি হচ্ছেকবি যখন উপমার প্রয়োগ করেন তখন সেটিকে প্রসঙ্গ ছাড়িয়ে আরও দূর পর্যন্ত প্রসারিত করে দিতে চান। উপমার জন্য তিনি নিতে পছন্দ করেন সাধারণত কোনো বস্তু  বা বিষয় নয়বস্তু বা বিষয়ের ধারণা ও তার পরিপার্শ্ব। আবার বস্তুকে গ্রহণ করলেও দেখা যাবে নিচ্ছেন ওই বস্তুটির কোনো বিশেষ পরিস্থিতিতে প্রাপ্ত অবস্থা। ফলে সেটি হয় একটি পুরো বাক্য। উপমা-চিত্রকল্প কি বর্ণনার ক্ষেত্রে পাঠকের অভ্যস্ততা যেখানে থামতে চায়তিনি সেখানে শ্বাস ফেলেন মাত্রকিন্তু চলে যান আরও দূরেপাঠকের ভাবনা কে ছাড়িয়েপ্রসঙ্গকে বিশদ করে তোলেন। প্রথম উদ্ধৃতিতে বয়সকে তিনি তুলনা করলেন উটের সাথেযে উট মরু ঝড়েও মালিককে চিনতে ভুল করে না। এখানেই পাঠকের প্রত্যাশা সমাপ্ত। কিন্তু তিনি এখানে না থেমে এগিয়ে গেলেন আরও। ফলে উপমাটি বক্তব্যকে জোরালো করেই সমাপ্ত হয় নিবক্তব্য-বিষয়ের অংশ হয়ে গেছে। তার বাগভঙ্গি এখানে খুবই উন্মেচন-প্রিয়। তার এই কবিতাগুলো আসলে নারীকে সামনে রেখে নিজেরই উন্মোচন যেন যা-কিছুরই উন্মোচন তিনি করুন না কেন। ফলে তার উচ্চারণগুলো অনিবার্য সত্যের মহত্ত্ব পেয়ে যায়। কোথাও কোথাও রচনা করে ফেলেন আপ্তবাক্য। কিংবা দেখতে পাই কখনো স্থির ও নিশ্চয়াত্মক ধর্মগ্রন্থীয় বাকপ্রতিমার অনুকরণযেন সমস্ত কিছুর ঊর্ধ্বে থেকে এক দেবপ্রতিম কবিসত্তা অমোঘ উচ্চারণের প্রয়সকরছে। অনিশ্চয়তার কম্পন যা সহজে সংক্রামকতা তাকে আলোড়িত করে কম। বিস্ময়ের অধ্যায় যেন অবসিত। জীবন সম্পর্কিত প্রশান্ত দার্শনিকতা এই গদ্যের অঙ্গীভূত ; এবং এই সেই শক্তিযার ফলে চেনা হলেও তার ভাষাকে এতো আলাদা স্বাদের মনে হয়। টানা গদ্য কবিতার চাল এমন হওয়া উচিত বলে কি তিনি মনে করতেনএবং এ জন্যই তরুণদের টানা গদ্য না লিখবার পরামর্শ দিয়েছিলেন?
    পরবর্তী কাব্যগ্রন্থ বাতাসের সঙ্গে আলাপে দেখতে পাচ্ছি টানা গদ্যে আরওকিছু কৃ-কৌশল তিনি ব্যবহার করছেন। কোথাও কোথাও টুকরো আখ্যান তিনি ব্যবহার করছেন আগের টানা গদ্যে যা-ছিলো আরও ফ্র্যাগমেন্টেডতবে কবিতার ভেতরে বিশেষভাবে আখ্যান বা গল্প ব্যবহার তার অভিপ্রেত নয়অনেকগুলো কৌশলের এটি একটি মাত্র। যেহেতু অনেকটা কনফেশনাল ধরনে তিনি কথা বলেনবিশেষত এই কবিতাগুলোতে সেহেতু আত্মজীবনীর নানান বিচূর্ণ অংশ বিভিন্ন মুখোশে প্রবেশ করেছে। নিচের টানা গদ্য কবিতাটি পড়া যাক :
একটা ঘোড়ার গাড়ি যাচ্ছিলো শাদা তুষারে ঢাকা পিটার্সবুর্গের রাস্তাঘাটের ব্যবহার তখন কম রাত্রি ছিলো আলোকিত ক টেবিলে জ্বলে যাচ্ছে মোমের বাতি
 এই স্বপ্নটা আমি একদিন নয়দু-দিন নয়তিনদিন দেখলাম
 গাড়ি যাচ্ছে ঘণ্টা বাজছে গাড়িওয়ালার হাতে ভেতরে জিভাগো ছিলেন না। (উপন্যাস কার প্রতিবিম্ব?) ছিলেন পাস্তেরনাক নিজে কবি লেখক মৃত্যু ভয়ে চিন্তিত প্রেমিক এবং যাঁর পশমের ওভার কোটের ভেতরে লুকানো থাকতো বাচ্চাদের কান্না !
 চতুর্থ দিন আবিষ্কার করলামস্বপ্নটা আর কিছুই নয় একটা ক্রোধ সেই ক্রোধটা হলো আমি আরও একবার এক মৌলিক দীর্ঘাঙ্গীর প্রেমে পড়েছি
                                                              (নতুন প্রেমবাতাসের সঙ্গে আলাপ)
 
   আমরা লক্ষ করলে পাবো
 এখানে কবি একটি আখ্যান ব্যবহার করছেন। এবং অন্যদিকে এর বাক্যগুলো বেশ হ্রস্ব। পাঠকের দ্রুত মনে পড়বে তার ছন্দে লেখা কবিতাগুলোযেখানে হ্রস্ব বাক্যে এগোনোর কৌশল তার। আসলে এটা ঠিক আখ্যান বর্ণনা নয়সিকদার তা চানও না। তিনি আখ্যানের প্রসঙ্গ থেকে পৌঁছুতে চান অন্য কোনো ডাইমেনশনে। যেমন,উদ্ধৃত কবিতাটির শেষে যে অভিনবত্বের চমক আমরা পাইতা মহ শিল্পের অন্তর্গত। ডাক্তার জিভাগো উপন্যাসের আবহকে স্বপ্নের অনুসঙ্গ হিসেবে ব্যবহার করে তিনি ঔপন্যাসিক ও তার সৃষ্ট চরিত্রকে এক সমান্তরালে এনেযে চমকারিত্ব ও ছক তৈরি করলেন এতণপরমুহূর্তে তাকে নিয়ে গেলেন অভাবনীয় এক উচ্চতায়। এমনিভাবে আমাদের মনে পড়তে পারেগালিব স্ট্রিটে কবিতাটিযেখানে কলকাতার গালিব স্ট্রিটে টানা-রিকশার আরোহী এক এংলো-ইন্ডিয়ান মেয়ের ঘরে ফেরার ঘটনাই হয়ে উঠেছে রহস্যায়িত। পেছনের পট তৈরি করে দিয়েছে জ্যোস্নাআকাশে এক গোলাকার বোকা চাঁদ ভাসিয়ে দিচ্ছে সব। আমরা দেখি তখনমেয়েটির আত্মীয়স্বজনেরা ক্রমেই দূর-দূরান্তের দ্বীপপুঞ্জে ছড়িয়ে যায়আর বর্তমানকালে অতীতের অধিক্রমণ শুরু হয়ে যায়
 
এই হ্রস্ব কালো স্কার্ট
এই বিষন্নতাএই পূর্ণচাঁদ আর ধূমপানের কান্তি গালিব স্ট্রিটটাকে সোজা তুলে নিয়ে গেলো হারুনুর রশীদের বাগদাদে!
এভাবে ঘোর ও রাহসিকতা তৈরি করা তার একটি কৌশল বটে। সবক্ষেত্রে যে তিনি এটি করেন এমন নয়। সে যাকতাকে নিয়ে একটি অভিযোগ চালু আছে। তিনি কবিতায় বিদেশী আবহ আনেন। আসলে সিকদার আমিনুল হকের কবিতায় তার পঠন-অভিজ্ঞতার ছাপ আছে। আমার মনে হয় তা ইতিবাচক অর্থেই। তিনি তার প্রিয় সব কবি কি লেখককে নিয়েকবিতা লিখেছেন। তাদের যাতনা-যাপিত জীবন কি দর্শনকে কবিতায় তাদের প্রতি স থেকে নানানভাবে এনেছেন। সম্ভবত তিনিই বিভিন্ন লেখক-শিল্পীকে নিয়ে সর্বাধিক কবিতা লিখেছেন। অন্যদিকেযে শ্রেণীর জীবন তার লেখার প্রধান উপজীব্যতার সঙ্গে  বিদেশী আবহের বিষয়টি মানিয়ে যায়। অবশ্য অনুসঙ্গ ধরে ধরে দেখলেও বিদেশী আবহের সত্যতা মিলবে। কিন্তু এ-ও আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন যেসিকদার আমিনুল হক যে কৌশলে তার বাক্যগুলো নির্মাণ করেন ও বিন্যস্ত করেনওইধারণার পেছনে তারও হাত কম নয়। তার বাক্যগুলো সাধারণত ইংরেজি কমপ্লেক্স বাক্যের আদলে নির্মিত। এতে থাকে যেযারযাযেই-সেই ইত্যাদি সর্বনামের সুপ্রচুর ব্যবহার। কখনো দেখি তিনি এসব বাক্যের অধীন উপবাক্যটিকে আলাদা একটি বাক্যের মর্যাদা দিয়ে শুরু করছেনযা শুরুই হচ্ছে ওই সর্বনামগুলো দিয়ে। কিংবা দেখা গেল একটা বাক্য শুরু হচ্ছে এবং-জাতীয় কোনো অব্যয় দিয়ে। কবিতার অপরিহার্য অঙ্গ উপমা-চিত্রকল্প-প্রতীক ব্যবহারের বিশেষত্বের কথা তো আগেই উল্লেখ করেছি। এছাড়া বিশেষণ ব্যবহারের কৌশলে তার অভিনবত্ব বা মৌলিকতা আমাদের যে বিস্ময়ের মধ্যে ফ্যালে তাতে আমরা অভ্যস্ত নই। এই বিশেষত্ব সম্বন্ধপদ ব্যবহার পর্যন্ত প্রসারিত। রবীন্দ্রনাথ যখন তার একটি গানে (সখি ভাবনা কাহারে বলে) লিখলেনবিশদ জোছনাকুসুম কোমল তখনপুরো গান বাকবিতাটিতেই জ্যোস্না প্লাবিত হলোকুসুম যেন আরও কোমল হয়ে উঠলো প্রথাগত বিশেষণ ব্যবহার সত্ত্বেও এবং বাংলাভাষায় বিশেষণ প্রয়োগের এক নতুন অধ্যায় সূচিত হলো। শব্দের প্রতি তার সজাগদৃষ্টি পাঠক তাকে পাঠ করা মাত্রই পাবেন। কবির অহঙ্কারী বচন উদ্ধৃত করি এবার (অবশ্য তিনি কখনোই বিনীত বা নম্র ননবরং দৃপ্ত ও সজাগ) :
সব শব্দের জয় , গন্ধ আর মতার চিত্র আমি জানি ভ্রমণের হাল্কা চোখ নিয়ে আমি আসিনি আমার চোখ প্রাচ্য দেশের এর ঠাণ্ডা গভীরতা সেই রুমালের মতো ; বাক্স খুললেই যার গুমোট গন্ধ আর পরিণত ভাঁজ ঝুর ঝুর করে ঝরে পড়বে
                                                (যে-সব শব্দ আমি জানিবাতাসের সঙ্গে আলাপ) 

সিকদার আমিনুল হকের দুটি ইন্দ্রিয়ের তীব্রতা পাঠকের অনুভবকে এড়াবে না। তা হচ্ছেদৃষ্টি ও শ্রুতি।
টানা গদ্য কবিতার আরেকটি চমকার বইয়ের খোঁজ পাঠকের মনোযোগের সামনে নিবেদিত হয়েছে এর পরে এটি গৌতম বসুর রসাতল। সান্দ্র মন্থরতার ভেতরে ভেতরে এক অনির্দেশ্য উদ্বেগ ও আর্তি অনুপ্রবেশ করে তার কবিতায়দেখা দেয় চঞ্চলতা। উদ্ধৃতি দেওয়া যেতে পারে :
হারিয়ে যাওয়ার কথাপৃষ্ঠাগুলি হারিয়েনষ্ট হয়ে যাওয়ারই কথা ; যেভাবে পাহাড়ের কোল থেকে বিশল্যকরণী চিরতরে হারিয়ে গেছে অশ্রুময়ী নামটি প্রখর তাপে শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে যেইভাবে তার কাছে গিয়ে বসতে তাই আর মন সরে না ; দূর থেকে দেখিদালান থেকে রোদ ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছেআমাদের বেঞ্চির উপরে একটা জলের কেটলিহাতপাখা একটা,আর ফিরে-ফিরে আসছে বাস্পের চেয়েও সূক্ষ্ম ভগ্ন সেই পঙ্ক্তিমালাসেই প্রজ্জ্বলিত উক্তির অবশেষ
 দিব্যোন্মাদ বাক্যসকলজাগো বলোআমরা হেঁটে এসেছি ধ্বংসের দিকে বেঁকে যাওয়া তমসাবৃত পথটিতেফিরে এসেছিনির্মল ও সর্বশান্ত হয়ে ফিরে এসেছি 
(
 রক্ষারসাতল)
    সময় ও অনুভূতির শূন্য পরিসরের দিকে তাকিয়ে এই উচ্চারণ। এর গদ্যের মধ্যে
 আমরা একইসঙ্গে রবীন্দ্রনাথের লিপিকা ও বিচিত্র প্রবন্ধের দূরাগত সুর টের পাইমনে জাগতে চায় শিশুতীর্থের বাগভঙ্গিও। কিন্তু যেহেতু মোহিত হতে সমস্যা হয় নাবোঝা যায় কবির নিজস্বতা মুদ্রিত আছে দৃষ্টিভঙ্গিতে ও গদ্যের নির্মিতিতে।


   এ ছাড়া সমসময়ের অনেক কবিই টানা গদ্য কবিতায় আত্মস্বার মুদ্রিত করতে
 পেরেছেনহয়তো একক কোনো গ্রন্থ লেখেন নি। এ ক্ষেত্রে  উপল কুমার বসুর নাম আসবে টানা গদ্যের কাঠামোতে ছন্দের চাল ভরে দেবার জন্য। দেখা যাবে একটি বাক্য ঢুকে যাচ্ছে পরবর্তী বাক্যেপরের বাক্যটির কাঠামো চুরমার করে সেটি থামছে। একটি বড়সর কবিতা একটিমাত্র দাড়িতে শেষ হচ্ছে। কবিতায় ম্যাডনেস ঢুকিয়ে দেবার প্রয়াস যেন।
এর সাথে সাথে কবি রণজি
  দাশের কথা বলা প্রয়োজন। তার টানা গদ্য কবিতাতে নিজস্বতা মুদ্রিত হতে পেরেছে যখন তিনি আখ্যানকে ব্যবহার করেন। একটা সামান্য প্রসঙ্গেও অসীমের ব্যঞ্জনা ও ব্যাপ্তি আনাই তার ধরন। অনেক সময় দেখি কবিতা নেহা প্রবন্ধের ভঙ্গিতে শুরু হচ্ছেকিংবা একটি আখ্যানকে বুদ্ধিবৃত্তিক জায়গা থেকে অনুসরণ করতে করতে এগুচ্ছে,কিন্তু হঠা পাঠককে চমকে দিয়ে বুদ্ধিকে পার হয়ে এটি এমন জায়গাতে উপনীত হয় যেখানে ছোঁয়া লাগে অসামান্যের।
    সাম্প্রতিক কালে টানা গদ্য কবিতা বিশ্ব জুড়েই একটি জনপ্রিয় মাধ্যম
 ,বাংলাদেশেও। নবীন-প্রবীণ নির্বিশেষে এখন বেদম লেখা হচ্ছে। এক্ষেত্রে নবীনদের সাবধান হওয়া ভালো। কেননা যে ছন্দ-দতা বাঞ্ছনীয়তার অভাবে তাদের টানা গদ্যের অভিযান ব্যর্থ হবে মেরুর দেখা পাবার বহু আগেই মরু-ঝড়ে নাহলে তুষার পাতে নিহত হবে কবিতা। শিল্প-সফল কবিতার কৃ-কৌশল আয়ত্ত করার আগেছন্দে পারঙ্গমতা আসার আগে এর চেষ্টা না-করা ভালো। রবার্ট ফ্রস্টকে আবার স্মরণ করিনেট ছাড়া টেনিস তো কোনো টেনিসই নয়কিন্তু যে টেনিসে মাস্টার সে-ই নেট ছাড়া টেনিস খেলবার সাহস দেখাতে পারে। সিকদার আমিনুল হক সম্ভবতএজন্যই বয়স চল্লিশের আগে টানা গদ্য কবিতা লিখতে নিষেধ করেছেন।